মেহেদী হাসান মিরাজের সংবাদ সম্মেলন তখন শেষ দিকে। তাঁর সামনে বসে থাকা সাংবাদিকদের কেউ কেউ বের হওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। হুট করেই তখন সংবাদ সম্মেলন কক্ষে এলেন তানজিদ হাসান। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম সেঞ্চুরি পেয়েছেন, নাহিদ রানার সঙ্গে যৌথভাবে হয়েছেন সিরিজ সেরাও। তাঁর কথা শোনার কৌতূহলে তাই আরও কিছুক্ষণ লম্বা হলো প্রশ্ন-উত্তরপর্ব।
সেখানে তানজিদ বড় স্বপ্ন দেখার কথাই বলে গেলেন। তাঁর সংবাদ সম্মেলনের একটা প্রশ্নের উত্তরই হয়তো ঠিকঠাক বোঝাতে পারে তা। তানজিদ সেঞ্চুরি পাওয়ার পর বয়সভিত্তিক দলে তাঁর নির্বাচক ও এখন কোচ হান্নান সরকার ফেসবুকে লিখেছেন তানজিদ ওয়ানডেতে ২০ সেঞ্চুরি করবেন, এমন আশা তাঁর। তানজিদও কি তেমন ভাবেন?
২০টার থেকে বেশিও হতে পারে। স্বপ্ন দেখতে তো কোনো সমস্যা নাই।তানজিদ হাসান, বাংলাদেশের ব্যাটসম্যান
এমন প্রশ্নে তানজিদের উত্তর, ‘চেষ্টা করব। হয়তো ২০টার থেকে বেশিও হতে পারে। স্বপ্ন দেখতে তো কোনো সমস্যা নাই।’ তাঁকে নিয়ে থাকা বড় স্বপ্নটা অবশ্য এত দিন সেভাবে পূরণ করতে পারেননি তানজিদ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিনি পা রেখেছেন আড়াই বছর, দলের একাদশেও নিয়মিত হয়েছেন অনেক দিন।
ওয়ানডে আর টি-টুয়েন্টি মিলিয়ে খেলেছেন ৭৫টি ম্যাচ। তাতে যে খুব খারাপ করেছেন, তা-ও নয়। ওয়ানডেতে ৫টি ফিফটি করেছেন, টি-টুয়েন্টিতে ১১টি। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১৬ ফিফটির একটিকেও সেঞ্চুরিতে রূপ দিতে পারছিলেন না। ব্যাটসম্যানদের জন্য এমনিতেই পরম আরাধ্যের নাম সেঞ্চুরি, ওপেনার হওয়ায় তানজিদের সুযোগটা যেহেতু বেশি ছিল। তাঁর দুঃখটাও একটু বেশিই হওয়ার কথা।
তানজিদের কথায়ও বোঝা গেল তেমনই, ‘একটু খারাপ তো লাগেই (সেঞ্চুরি না পেলে)। হয়তো আরও আগে হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু করতে পারিনি। অনেকগুলো ভালো ইনিংস ছিল সেগুলোকে টেনে নিতে পারিনি। যা অতীত হয়ে গেছে, ওদিকে তাকাতে চাই না। সামনে এগোতে চাই।’
তানজিদ কাল ইনিংসের প্রায় পুরোটা সময়ই এক শর বেশি স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করেছেন। ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই হারিস রউফকে চার-ছক্কা মেরেছেন। পাওয়ারপ্লের ১০ ওভার শেষে বাংলাদেশের রান যখন ৫০, তানজিদ তখন অপরাজিত ৩০ রানে। এ সময়ের মধ্যে দুই ছক্কা মেরে নিজের করে নেন একটা রেকর্ডও। লিটন দাসকে ছাড়িয়ে ওয়ানডেতে পাওয়ারপ্লেতে বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি ছক্কার রেকর্ড এখন তাঁর দখলে।
এমন ঝলক অবশ্য তানজিদের জন্য নতুন কিছু নয়। বাউন্ডারি মারার সক্ষমতায় তিনি দেশের অন্যতম সেরা। তবে ইনিংস টেনে লম্বা করতে না পারার আফসোসটাই শুধু তাঁর সঙ্গী হয়েছে বারবার। এদিন সেই আক্ষেপও ঘুচেছে। ৪৭ বলে ফিফটি। সেঞ্চুরি আসে ৯৮ বলে। ৯ চারের পাশাপাশি তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে ৭টি ছক্কাও।
তানজিদ অবশ্য বলছেন আলাদা করে মারমুখী হওয়ার কোনো পরিকল্পনা নাকি থাকে না তাঁর। পাওয়ারপ্লের সময়টাতে যেহেতু দৌড়ে রান নেওয়ার সুযোগ কম থাকে তাই সুযোগ পেলেই চেষ্টা করেন বাউন্ডারি মারার, ‘যখন ব্যাটিং করি আমার মানসিকতা ইতিবাচক থাকে। আমার রেঞ্জে যেটা থাকে আমি সেটা সব সময় চেষ্টা করি বাউন্ডারি মারতে।’
তাতে তানজিদ যে সফল, তা পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেও বোঝা যায়। মিরপুরের শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে এক ইনিংসে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানের সবচেয়ে বেশি ছক্কার রেকর্ডটা কাল নিজের করেছেন তানজিদ। পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানের এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কার কীর্তিও হয়েছে।
তানজিদের সেঞ্চুরিতে কাল লম্বা একটা অপেক্ষা শেষ হয়েছে পুরো বাংলাদেশেরই। ২০২৫ সালে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে সেঞ্চুরি পেয়েছিলেন তাওহিদ হৃদয়। ১২ ম্যাচ পর আবার ওয়ানডেতে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানের সেঞ্চুরি। তাঁর ১০৭ বলের ইনিংস ছড়িয়ে দিয়েছে একটা প্রতিশ্রুতিও। সেঞ্চুরির পর ব্যাটটা উঁচিয়ে দুই হাত দুই দিকে ছড়িয়ে দিয়ে তানজিদ সেটাই ভাবছিলেন কি না, কে জানে—দীর্ঘ যাত্রার এ তো কেবলই শুরু।
বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ মনে করেন তানজিদের ভালো করা দরকার দলের জন্যও, ‘আমার কাছে মনে হয় তানজিদ যেভাবে ক্রিকেট খেলে, ওর বেশির ভাগ দিনই রান করা উচিত। ও যদি রান করে দলের জন্য অনেক সাহায্য হয়।’