এবারের বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের লাইনআপ দেখে একটা কথা খুব স্পষ্টভাবে বলা যায়, কোনো নতুন চ্যাম্পিয়ন আমরা পাচ্ছি না। সেমিফাইনালে ওঠা চার দলই সাবেক ও বর্তমান চ্যাম্পিয়ন এবং যোগ্যতার ভিত্তিতেই এই জায়গায় এসেছে। ফ্রান্স, স্পেন ও আর্জেন্টিনার শেষ চারে আসা শুরু থেকেই ছিল প্রত্যাশিত। তবে যদি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি, ইংল্যান্ড সেমিফাইনালে আসবে, শুরুতে আমি এতটা ভাবিনি।
কিন্তু ইংল্যান্ড যোগ্যতর দল হিসেবেই এসেছে সেমিফাইনালে। আর এই সেমিফাইনাল লাইনআপে আসলে কোনো চমক নেই। যদিও এই সেমিফাইনালিস্টদের বাইরেও বেলজিয়াম ও মরক্কোর মতো দলের সেমিফাইনাল খেলার যোগ্যতা ছিল। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালের কঠিন লড়াইয়ে তারা ছিটকে গেছে। তা সত্ত্বেও বলতে দ্বিধা নেই, বেলজিয়াম-মরক্কো যে ফুটবল খেলেছে, তাতে তারা সেমিফাইনালে এলে অবাক হতাম না।
এখন দেখার বিষয়, ফাইনালের লড়াই কোন দুই দলের মধ্যে হয়। ব্যক্তিগত বিশ্বাস থেকে আমি বলে আসছিলাম, এবার চ্যাম্পিয়ন ইউরোপ থেকে হবে। ইউরোপ থেকে চ্যাম্পিয়ন মানে নতুন কোনো দল নয়, পুরোনো চ্যাম্পিয়নকেই বুঝিয়েছি। আর সেটা হওয়ার সম্ভাবনা এখনো ভালোভাবেই জীবন্ত। সেমির চার দলের তিনটিই যে ইউরোপের—ফ্রান্স, স্পেন ও ইংল্যান্ড।
ইউরোপ থেকে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দাবিদারও তাই বেশি। সেই দাবিটা সম্ভবত সবচেয়ে বেশি কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্সের। ফ্রান্স খেলছেও দুর্দান্ত। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সেমিফাইনাল বা ফাইনালের ফল যেকোনো দিকে যেতে পারে। কারণ, হিসাব সব সময় মেলে না। যেমন মেলেনি ইংল্যান্ডের ক্ষেত্রে। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে ফেবারিট হিসেবে সেমির সম্ভাব্য দল হিসেবে ইংল্যান্ডের নাম বলতে অনেকেরই দ্বিধা ছিল। বাকি তিন দলের কথা ঘুরেফিরেই এসেছে বিশ্লেষকদের কথায়। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার পর এক-দুটি ম্যাচ দেখেই বোঝা গেছে এই ইংল্যান্ড দল অনেক দূর যাবে। সেই অনুমান সত্যি করে ওরা শেষ চারে এসেছে।
গ্রুপ পর্বে প্রথম ম্যাচেই ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ৪-২ গোলের জয় টনিক হিসেবে কাজ করেছে ইংল্যান্ডের। এরপর প্রতিটি ম্যাচে তারা যেভাবে জয় ছিনিয়ে এনেছে, তা ছিল দুর্দান্ত। কোচ টমাস টুখেল একজন তুখোড় ট্যাকটিশিয়ান এবং হাতে থাকা মেধাবী ফুটবলারদের কাজে লাগিয়ে তিনি দলটাকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন।
আর্জেন্টিনা গতবারের চ্যাম্পিয়ন দল, তাদের ফেবারিট তালিকায় আপনাকে রাখতেই হবে। কোয়ালিফাইং থেকেই তারা শক্তিশালী ফুটবল খেলে আসছিল এবং তিনবারের চ্যাম্পিয়নরা যে সেমিফাইনাল-ফাইনালের দাবিদার, তা আগেই প্রমাণ করেছিল। বিশ্বকাপে এসে নকআউটের রাউন্ড ৩২ আর রাউন্ড ১৬-এর প্রথম দুটি ম্যাচে তীব্র চাপে পড়েছিল আর্জেন্টিনা। তবে শেষ পর্যন্ত শক্তি আর অভিজ্ঞতায় কেপ ভার্দে ও মিসর ম্যাচ বের করে নিয়েছে। পেরিয়েছে সুইজারল্যান্ডের বাধাও। আর্জেন্টিনার রক্ষণ ও গোলকিপিংয়ে কিছু সমস্যা হলেও মাঠের লড়াইয়ে তারা সব সময়ই এগিয়ে ছিল।
বর্তমান ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেনের মাঝমাঠ বেশ ভালো, আক্রমণেও ধার আছে। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ক্ষমতা রাখে দলটি। প্রত্যাশা মতোই তারা কক্ষপথে আছে। ব্রাজিল শুরুটা খারাপ করলেও আস্তে আস্তে মনে হচ্ছিল অন্তত সেমিফাইনালে আসতে পারে। কিন্তু পারল না পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নরা। পর্তুগালের মাঝমাঠ নিয়ে অনেক আশার কথা বলা হচ্ছিল। তাই ভেবেছিলাম মাঝমাঠের ওপর ভরসা করে একটা পর্যায়ে হয়তো যাবে দলটি। কিন্তু পর্তুগালকে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে কখনো চিন্তা করিনি। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বয়সের ভারে দলকে টানতে পারেননি।
আরেক বড় দল জার্মানি ব্যর্থ হয়েছে এবারও। দলটির রক্ষণভাগ নিয়ে আমার কিছুটা সংশয় ছিল। এই রক্ষণকে আমার ধীরগতির মনে হয়েছে। তাই টুর্নামেন্ট যত এগিয়েছে, সেমির তালিকায় রাখতে পারছিলাম না তাদের। জার্মানিও জোর করে আমাদের আশান্বিত করার চেষ্টা করেনি।
যা–ই হোক, বিশ্বকাপে এখন চূড়ান্ত রোমাঞ্চের অপেক্ষা। ফ্রান্স-স্পেন, আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড। দুটি সেমিফাইনালে কারা জিতবে? বলা কঠিন। আপাতত অনুমানে না গিয়ে উপভোগ্য দুটি সেমিফাইনাল দেখার প্রত্যাশায় রইলাম।
লেখক: সাবেক ফুটবলার ও কোচ