
একদিকে লিভারপুল—বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবল ক্লাবগুলোর একটি। গত মৌসুমেও উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলেছে। অন্যদিকে ত্রাবজোনস্পোর জনপ্রিয়তায় তুরস্কের প্রথম তিনেও নেই। দেশটির ফুটবল–সমর্থকদের প্রায় ৯০ শতাংশই গালাতাসারাই, ফেনেরবাচে বা বেসিকতাসের বলে ধরা হয়।
যার অর্থ তুরস্কের গণ্ডিতেও ত্রাবজোনস্পোর প্রভাবশালী কোনো নাম নয়। নতুন মৌসুমে সরাসরি ইউরোপা লিগেও খেলতে পারছে না দলটি। মূল পর্বে খেলতে আগে উতরাতে হবে বাছাইপর্ব। এমন এক ক্লাবেই ক্যারিয়ারের নতুন অধ্যায় শুরু করেছেন মোহাম্মদ সালাহ। গতকাল তুর্কি ক্লাবটির সঙ্গে দুই বছরের চুক্তিতে সই করেছেন ‘ইজিপশিয়ান কিং’।
বয়স তাঁর ৩৪। এই বয়সে পৌঁছানো খেলোয়াড়দের নিয়ে ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর আগ্রহ কমতে থাকে। ফুটবলাররা নিজেরাও ক্যারিয়ারের শেষবেলা কোথায় কীভাবে কাটাতে চান, তা ভাবা শুরু করে দেন। তবে ২০২৫ সালের এপ্রিলে যিনি দুই বছরের জন্য চুক্তি নবায়ন করেছেন, তাঁর জন্য এক বছর পরই লিভারপুল ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটা সহজ নয়। আরও সহজ নয় শীর্ষ লিগ থেকে ৯ নম্বর লিগে নাম লেখানো (উয়েফা কো-ইফিশিয়েন্ট র্যাঙ্কিং অনুসারে)।
প্রশ্নটা তাই স্বাভাবিক—লিভারপুলের মতো ইউরোপীয় পরাশক্তি ছেড়ে কেন তুরস্কের চতুর্থ জনপ্রিয় ক্লাবকে ঠিকানা হিসেবে বেছে নিলেন সালাহ?
লিভারপুল ও ত্রাবজোনস্পোর আর ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ ও তার্কিশ সুপার লিগের পার্থক্যের কারণে সালাহর সিদ্ধান্তটি বিস্ময়করই লাগতে পারে কারও কারও। তবে একটু গভীরে গেলেই মিলবে কয়েকটি বাস্তবসম্মত কারণ।
সৌদি নয়, ইউরোপেই থাকতে চেয়েছেন
লিভারপুল ছাড়ার ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই সালাহর সম্ভাব্য গন্তব্য নিয়ে জোর আলোচনা ছিল। তাঁর প্রতি সৌদি আরবের ক্লাবগুলোর আগ্রহ নতুন কিছু নয়। ২০২৩ সালেই তাঁকে দলে নিতে ১৫ কোটি পাউন্ডের প্রস্তাব দিয়েছিল আল ইত্তিহাদ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সালাহ এমন একটি বিকল্প বেছে নিয়েছেন, যেখানে ইউরোপের প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল থাকবে।
বেতনেও বড় ছাড় দিতে হয়নি
৩৪ বছর বয়সে স্পেন বা ইতালির কোনো ক্লাবে গেলে সালাহকে হয়তো বেতনে বড় ধরনের সমঝোতা করতে হতো। ত্রাবজোনস্পোরে সেটি করতে হয়নি। ইএসপিএনের তথ্য অনুযায়ী, দুই বছরের চুক্তিতে মৌসুমপ্রতি প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ ইউরো পাবেন সালাহ। ত্রাবজোনস্পোর তার্কিশ স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত। ক্লাবটি শেয়ারহোল্ডারদের জানিয়েছে, তাঁর নামে বিক্রি হওয়া পণ্যের ২০ শতাংশ অর্থ পাবেন সালাহ। এ ছাড়া পারফরম্যান্সভিত্তিক বোনাস তো থাকছেই।
পরিবার, করসুবিধা ও মিসরের কাছাকাছি থাকা
একজন ফুটবলারের দল বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তে মাঠের বাইরের জীবনও বড় ভূমিকা রাখে। ত্রাবজোনে যাওয়া মানে পরিবার নিয়ে ইউরোপেই থাকা সম্ভব হচ্ছে সালাহর। তুরস্কের কৃষ্ণসাগর উপকূলের শহরটি থেকে মিসরে পৌঁছাতেও সময় লাগে কম—মাত্র দুই ঘণ্টা। পাশাপাশি তুরস্কের করব্যবস্থাও ইউরোপের কয়েকটি বড় ফুটবল দেশের তুলনায় বিদেশি খেলোয়াড়দের জন্য বেশি সুবিধাজনক বলে বিবেচিত হয়। এসব বিষয়ও সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ম্যারাডোনা-ফর্মুলা!
৯ বছরে ২৫৭ গোল, প্রিমিয়ার লিগ, চ্যাম্পিয়নস লিগসহ প্রায় সব বড় শিরোপা—লিভারপুল ইতিহাসের ‘কিংবদন্তি’ হিসেবেই ক্লাব ছেড়েছেন সালাহ। এখন ত্রাবজোনে তাঁর ভিন্ন এক চ্যালেঞ্জ। ক্লাবটি সাতবার লিগ জিতলেও গত ৪২ বছরে জিতেছে মাত্র একবার (২০২১-২২ মৌসুমে)।
যদি সালাহ তাঁদের আবার লিগ শিরোপা এনে দিতে পারেন, ইউরোপের মঞ্চেও সামনে নিয়ে যেতে পারেন, তাহলে এই ক্লাবের ইতিহাসেও কিংবদন্তির মর্যাদা পাবেন তিনি। কেউ কেউ এ ক্ষেত্রে ম্যারাডোনার উদাহরণ টেনেছেন। ১৯৮৪ সালে বার্সেলোনা ছেড়ে তখনকার দিনের স্বল্প আলোচিত নাপোলিতে গিয়ে ক্লাবটিকে বদলে দিয়েছিলেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। নাপোলির নামের সঙ্গে ম্যারাডোনার নাম যেভাবে জড়িয়ে গেছে, সালাহর সামনেও ত্রাবজোনে একই সুযোগ।
ত্রাবজোনস্পোরের বৈশ্বিক পরিচয়ের সুযোগ
এই চুক্তি শুধু সালাহর জন্য নয়, ত্রাবজোনস্পোরের জন্যও বিশাল এক ব্যবসায়িক বিনিয়োগ। সালাহর আগমনের ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্লাবটির অনুসারী কয়েক গুণ বেড়েছে। ফুটবলের সবচেয়ে পরিচিত মুখগুলোর একটিকে দলে টানতে পারা নতুন স্পনসর, বাণিজ্যিক অংশীদার এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ক্লাবটির পরিচিতি বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে, সালাহর সিদ্ধান্তকে শুধু ‘বড় ক্লাব ছেড়ে ছোট ক্লাবে যাওয়া’ হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটা ধরা পড়ে না। ইউরোপে থাকা, উচ্চ বেতন বজায় রাখা, পরিবারের সুবিধা, নতুন এক ফুটবল ইতিহাস গড়ার সুযোগ এবং ত্রাবজোনস্পোরের বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা—সব মিলিয়েই এই বিস্ময়কর দলবদলের পেছনের যুক্তিগুলো দাঁড়িয়ে আছে।