
বিমানে তখন উৎসবের আমেজ। রিয়াল মাদ্রিদকে হারিয়ে স্প্যানিশ সুপার কাপ জেতার তৃপ্তি নিয়ে সৌদি আরব থেকে বার্সেলোনার পথে উড়াল দিয়েছে পুরো দল। মৌসুমের সবচেয়ে বড় জয়ের উদ্যাপন চলছে। আনন্দ আর হাসিতে মাখামাখি বার্সেলোনার ফুটবলাররা।
এর মধ্যেই একটু আলাদা হয়ে গেলেন রাফিনিয়া। এয়ারলাইনসের মেনু কার্ড দেখে ছোট্ট একটা কেক অর্ডার দিলেন ব্রাজিলিয়ান উইঙ্গার। কেকের ওপর একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে এগিয়ে গেলেন দলের সবচেয়ে কনিষ্ঠ সদস্যের দিকে।
দিনটি ছিল ১২ জানুয়ারি, সোমবার। পেদ্রো ফার্নান্দেজ—বার্সেলোনায় সবাই যাকে ভালোবেসে ‘দ্রো’ নামে ডাকে—তাঁর ১৮তম জন্মদিন ছিল ওইদিন। বার্সেলোনার সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলগুলোতে সেই মুহূর্তের ছবি শেয়ার করা হলো। সবাই দেখল কোচ হান্সি ফ্লিকের এই বার্সা কত একতাবদ্ধ, যেন একটা সুখী পরিবার।
এর ঠিক পাঁচ দিন পরই দ্রো জানিয়ে দিলেন—তিনি বার্সেলোনা ছাড়তে চান!
আজ পিএসজির ওয়েবসাইটে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, বার্সেলোনা থেকে দ্রো ফার্নান্দেজকে কিনে নিয়েছে তারা। ১৮ বছর বয়সী এই স্প্যানিশ মিডফিল্ডারের সঙ্গে ২০৩০ পর্যন্ত চুক্তি হয়েছে প্যারিসের ক্লাবটির। ইউরোপের একাধিক সংবাদমাধ্যমের খবর, দ্রোয়ের ৬০ লাখ ইউরো রিলিজ ক্লজের পুরোটাই বার্সেলোনাকে দিয়েছে পিএসজি, সঙ্গে দুই ক্লাবের মধ্যে ‘সৌহার্দ্যের নিদর্শন’ হিসেবে দিয়েছে আরও ২০ লাখ ইউরো!
যাকে ক্লাবের ভবিষ্যৎ মনে করা হচ্ছিল, বলা হচ্ছিল বার্সেলোনার নতুন ইনিয়েস্তা, কেন তিনি এমন হঠাৎ করে ক্লাব ছেড়ে গেলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আগে জানতে হবে দ্রো-এর উত্থানের গল্প।
পুরো নাম পেদ্রো ফার্নান্দেজ সার্মিয়েন্তো। বার্সেলোনার লা মাসিয়া একাডেমিতে তাঁর বেড়ে ওঠা। সেখানেই একের পর এক সবাইকে মুগ্ধ করেছেন। বার্সেলোনার শুরুতে পরিকল্পনা ছিল চতুর্থ বিভাগের দল ‘বার্সা অ্যাতলেতিক’-এ খেলিয়ে ফার্নান্দেজকে আরেকটু পোক্ত করে তোলার।
কিন্তু ফ্লিক দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্রোর খেলায় মুগ্ধ হয়ে তাঁর দিকে আলাদা নজর দেন। এই তরুণ মিডফিল্ডারকে তিনি এতটাই পছন্দ করেছিলেন যে গ্রীষ্মকালীন এশিয়া সফরে তাঁকে মূল দলের সঙ্গী করেন। বার্সার ট্রেনিং গ্রাউন্ডে যারা প্রতিদিনের কাজ দেখেন, তাদের চোখে দ্রো ছিলেন ‘লা মাসিয়ায় ফ্লিকের স্বপ্নের প্রজেক্ট’। মূল দলেও অভিষেক হয়ে যায় দ্রো-র।
কিন্তু হঠাৎ কী এমন হলো যে দ্রো ক্লাবই ছেড়ে গেলেন? স্প্যানিশ সুপার কাপ জিতে বার্সেলোনা সৌদি আরব থেকে ফেরার পর চোটের কারণে কয়েক দিন অনুশীলন করেননি দ্রো। কোপা দেল রের শেষ ষোলোতে রেসিং সান্তান্দারের বিপক্ষে তিনি স্কোয়াডে ছিলেন না। ১৭ জানুয়ারি ওই ম্যাচটা বার্সা ২-০ গোলে জেতার পর দ্রো দেখা করতে চাইলেন কোচের সঙ্গে। তাঁর মুখে ক্লাব ছাড়ার কথা শুনে ফ্লিক যেন আকাশ থেকে পড়লেন।
বার্সার ভেতরের খবর, দ্রোর এই সিদ্ধান্তে ফ্লিক ভীষণ কষ্ট পেয়েছেন। দ্রো-র পেছনে তিনি ব্যক্তিগতভাবে অনেক সময় দিয়েছেন।
সাধারণত লা মাসিয়ার একজন কিশোর বা তরুণের যাত্রাটা হয় ধাপে ধাপে—অনূর্ধ্ব-১৯ থেকে বার্সা আতলেতিকো, তারপর মূল দল। কিন্তু দ্রো যে প্রায় রকেটের গতিতে সেই ধাপগুলো হয়েছেন, এর পেছনে বড় ভূমিকা ছিল ফ্লিকের। যাঁকে এত পছন্দ করেন বার্সেলোনা কোচ, সেই ছেলেটা ক্লাব ছেড়ে গেলে তাঁর তো খুব খারাপ লাগবেই।
তবে এর পেছনে আছে বার্সেলোনার বর্তমান স্কোয়াডে এক কঠিন বাস্তবতাও।
দ্রোর প্রিয় পজিশন ‘অ্যাটাকিং মিডফিল্ড’। কিন্তু সেখানে ২৭ বছর বয়সী দানি ওলমো, ২২–এর ফেরমিন লোপেজ, ২১–এর গাভিদের ভিড়ে জায়গা পাওয়াটা ছিল হিমালয় জয়ের মতোই কঠিন।
উইংয়ে ডান বা বাঁ প্রান্তে সুযোগ পেতে পারতেন? সেখানেও তো ভিড়। লামিনে ইয়ামালের বয়স মাত্র ১৮। নতুন আসা রুনি বার্গজির বয়স ২০ বছর। ২৯ বছর বয়সী রাফিনিয়া শুরুর একাদশে একেবারে নিশ্চিত নাম। ক্লাব চায় ইউনাইটেড থেকে ধারে আনা ২৮ বছরের মার্কাস রাশফোর্ডকে রেখে দিতে। আসছে গ্রীষ্মে একজন স্ট্রাইকার নেওয়ার পরিকল্পনাও আছে। তাহলে তো ‘ফলস নাইনে’র দরজাটাও প্রায় বন্ধ।
লা মাসিয়া থেকে উঠে আসা ইয়ামাল, কুবারসি বা গাভিরা যখন সুযোগ পেয়েছিলেন, তখন বার্সার অবস্থা ছিল নড়বড়ে। দলে বড় তারকার অভাব ছিল। এখন দৃশ্যপট বদলেছে। দলে এখন তারার মেলা, তাই পরের প্রজন্মের জন্য জায়গা পাওয়াটা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সুযোগটাই নিয়েছে পিএসজি। আর এমন একজনকে মাত্র ৮০ লাখ ইউরোতে পেয়ে যাওয়া মানে তো হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো।
বার্সেলোনা হয়তো আর কিছুদিন পরেই তাঁর রিলিজ ক্লজ কয়েক শ কোটি ইউরো করতে পারত। কিন্তু এর আগেই দ্রো তাদের হাতছাড়া হয়ে গেলেন।
স্পেনে তরুণ ফুটবলাররা ১৮ হওয়ার আগে দীর্ঘমেয়াদি পেশাদার চুক্তি করতে পারেন না। ১৮ হওয়ার আগে চুক্তির মেয়াদ ও রিলিজ ক্লজ—দুটোরই সীমা থাকে। দ্রো তাই ছিলেন বার্সা একাডেমির মূল চুক্তিতে। ওই চুক্তিতে থাকা সব লা মাসিয়া খেলোয়াড়েরই রিলিজ ক্লজ ৬০ লাখ ইউরো।
কিছু ব্যতিক্রমও আছে। ১৮ হওয়ার আগেই বার্সেলোনার মৌখিক সমঝোতা হয়েছিল ইয়ামালের সঙ্গে, ১৫ বছর বয়সে প্রথম দলে সুযোগ পাওয়ার পরই। কুবারসির বেলায়ও একই পথে হেঁটেছে বার্সা। এর আগে আনসু ফাতি ও ইলাইশ মোরিবার ক্ষেত্রেও এমন হয়েছে। কিন্তু দ্রো-এর সঙ্গে তাদের কোনো মৌখিক সমঝোতাও ছিল না। বার্সার একটি সূত্র দ্য অ্যাথলেটিককে বলেছে, ‘আমরা তো আবেগের বশে কোনো তরুণকে আকাশচুম্বী বেতন দিয়ে রেখে ক্লাবের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারি না।’
কিন্তু দ্রো যে অন্য কোনো সাধারণ তরুণ ফুটবলার নন, এটা কি হান্সি ফ্লিকও জানতেন না?