এমবাপ্পে ও ভিনিসিয়ুস টি-শার্টটা বুক পর্যন্ত পরলেন বটে, মুহূর্ত বাদেই নামিয়ে রাখলেন।
এমবাপ্পে ও ভিনিসিয়ুস টি-শার্টটা বুক পর্যন্ত পরলেন বটে, মুহূর্ত বাদেই নামিয়ে রাখলেন।

এমবাপ্পে–ভিনিদের বিশেষ জার্সি না পরা নিয়ে সমালোচনার মুখে রিয়াল

মাঠের বাঁশি তখনো বাজেনি। টানেলের ভেতর খেলোয়াড়েরা সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছেন। ঠিক তখনই দেখা গেল, সবার হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে একটা সাদা টি-শার্ট। কেউ জানত না, নব্বই মিনিট পর কার্লোস এস্পির শেষ মুহূর্তের গোলে নাটকীয়ভাবে যে ম্যাচটা শেষ হবে, সেই ম্যাচ শুরুর আগেই এই টি-শার্ট নিয়ে একটা বিতর্ক তৈরি হবে এই করিডরে।

এলচের মাঠে রিয়াল ৩-২ গোলের নাটকীয় এক জয় পেয়েছে গতকাল, খবরটা এমনই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ম্যাচ শুরুর বাঁশি বাজার ঠিক আগের দৃশ্যটা ক্যামেরার লেন্সে আবার টেনে আনলে দেখা যাবে অন্য এক টানাপোড়েন, যা এখন রিয়ালের জয়ের চেয়েও বেশি আলোচনায়।

স্পেনের সেউতা শহরের সমর্থনে দুই দলের খেলোয়াড়দেরই এদিন পরার কথা ছিল বিশেষ বার্তা সংবলিত টি-শার্ট। এলচের ফুটবলাররা গায়ে জড়িয়েই টানেল থেকে মাঠে নামলেন। রিয়ালের খেলোয়াড়দের হাতেও সেই টি-শার্ট তুলে দিলেন কিট কর্মকর্তা। বিপত্তিটা বাঁধালেন তিনজন।

কিলিয়ান এমবাপ্পে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও ইব্রাহিমা কোনাতে।

এমবাপ্পে ও ভিনিসিয়ুস টি-শার্টটা বুক পর্যন্ত পরলেন বটে, মুহূর্ত বাদেই নামিয়ে রাখলেন। কোনাতে সেই সৌজন্যটুকুও দেখালেন না, স্রেফ হাতে ধরে রাখলেন। টি-শার্টে লেখা ছিল, ‘আমরা সবাই কায়াবাস’।

ম্যাচের আগে বিশেষ জার্সি পরেছিলেন এলচে ও রিয়াল মাদ্রিদের খেলোয়াড়েরা।

‘কায়াবাস’ শব্দটি মূলত স্পেনের সেউতা শহরের স্থানীয় বাসিন্দাদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। সেউতা মরক্কো সীমান্তে অবস্থিত স্পেনের একটি স্বায়ত্তশাসিত শহর। সাম্প্রতিক সময়ে মরক্কো সীমান্ত দিয়ে প্রায় ৭২ হাজার অভিবাসী ও শরণার্থী স্পেনের ভূখণ্ডে ঢোকার উদ্দেশ্যে সেউতায় চলে আসেন, যা ৮৫ হাজার জনগোষ্ঠীর ছোট্ট শহরটির জন্য পরিণত হয় বড় ধরনের সংকটে। আকস্মিক ও বিপুল এই মানুষের ঢলে স্বাস্থ্যসেবা, বাসস্থান আর স্থানীয় প্রশাসনের ওপর তীব্র চাপ পড়ে। শহরের বাসিন্দারা দিন কাটাচ্ছেন চরম নিরাপত্তাহীনতা আর অনিশ্চয়তায়।


স্পেনের লা লিগার ক্লাব ও খেলোয়াড়েরা এই উদ্যোগের মাধ্যমে কয়েকটি বার্তা দিতে চেয়েছিলেন। সংকটে পড়া সেউতাবাসীর পাশে দাঁড়ানো, তাঁদের বোঝানো যে তাঁরা একা নন। সেউতার বাসিন্দাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করা আর ফুটবলের বিশাল দর্শকপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে সেউতার কঠিন পরিস্থিতির দিকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা।

মানবিক আর রাজনৈতিক দোলাচলের এমন এক আবহে রিয়ালের তিন তারকার টি-শার্ট না পরাটাই হয়ে উঠল বিতর্কের জ্বালানি।


কিন্তু মানবিক আর রাজনৈতিক দোলাচলের এমন এক আবহে রিয়ালের তিন তারকার টি-শার্ট না পরাটাই হয়ে উঠল বিতর্কের জ্বালানি। তারা কি তবে এই মানবিক উদ্যোগকে সমর্থন করেন না?
এ বিষয়ে রিয়াল মাদ্রিদ এখন পর্যন্ত বেশ নিস্পৃহ। স্প্যানিশ দৈনিক ‘মুন্দো দেপোর্তিভো’ জানাচ্ছে, ক্লাবটি এই বিষয়ে কোনো পাত্তাই দিতে রাজি নয়। ক্লাবের একটি সূত্র পত্রিকাটিকে জানিয়েছে, কে কী পোশাক পরবে, সেটা বেছে নেওয়ার অধিকার সবার আছে। ক্লাবের বেশির ভাগ খেলোয়াড় তো পরেছেনই। এই তিনজনকে নিয়ে ক্লাবের মন্তব্য একটাই—কাউকে বাধ্য করা যায় না, আবার বারণও করা যায় না।


কিন্তু ঘটনা নিয়ে বিভক্ত এখন মাদ্রিদ ও বার্সেলোনাভিত্তিক সংবাদমাধ্যমগুলোও। বার্সেলোনাভিত্তিক স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ‘স্পোর্ত’-এর দাবি, নিজেদের বাঁচাতে রিয়াল এই ঘটিনায় টেনে এনেছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনাকে। ঘনিষ্ঠ মিডিয়াগুলোকে রিয়াল নাকি মনে করিয়ে দিয়েছে, আগের ম্যাচে লেভান্তের বিপক্ষে বার্সেলোনাও তো এই একই টি-শার্ট পরতে সরাসরি মানা করে দিয়েছিল। তখন এত শোরগোল হলো না কেন?

‘স্পোর্ত’ অবশ্য রিয়ালের এই যুক্তিকে খোঁড়া অজুহাত হিসেবে তুলে ধরে সমালোচনা করেছে। পত্রিকাটির মতে, বার্সেলোনা প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এই উদ্যোগে অংশ নেবে না। রিয়ালে ঘটেছে উল্টো ব্যাপার, তিন ফুটবলার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে টি-শার্ট পরেননি। দুই ঘটনার প্রেক্ষাপট আলাদা। তবু রিয়ালের মুখের ‘তখন তো কেউ কিছু বলেনি’ বাক্যটিই বিতর্কের নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে বলে মত কাতালান সংবাদমাধ্যমটির।

এলচের বিপক্ষে ৩-২ গোলে জিতেছে রিয়াল মাদ্রিদ।


এদিকে এই বিতর্কে আরেকটি নামও এখন আলোচনায়। দিনকয়েক আগে ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে ম্যাচে এই একই টি-শার্ট পরেই মাঠে নেমেছিলেন রিয়াল বেতিসের মরক্কোন তারকা আবদে এজ্জালজুলি। সে জন্য নিজ দেশ মরক্কোর মানুষের কাছ থেকেই তাঁকে কটূক্তি শুনতে হয়েছিল।
ইনস্টাগ্রামে সেই সমালোচনার কড়া জবাব দিয়েছিলেন এজ্জালজুলি নিজেই, ‘প্রথমেই একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। সেউতা শহর নিয়ে এই টি-শার্ট পরার পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না, মরক্কোর মানুষকে ছোট করার ভাবনা তো দূর অস্ত। কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি অঞ্চলের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানবিক তাগিদ থেকেই এটা করা।’


অভিবাসী ও শরণার্থী মরোক্কানদের কাছে এর জন্য ক্ষমা চাইতেও রাজি নন এজ্জালজুলি, ‘কারও কাছে কোনো ক্ষমা চাওয়ার কিছু নেই। যারা আমার দেশের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চায়, তারা তুলতে পারে। আমি মাথা উঁচু করেই বাঁচব, নিজের শিকড়কে গর্বের সঙ্গেই তুলে ধরব।’