কেপ ভার্দের ডিফেন্ডার লোপেজ
কেপ ভার্দের ডিফেন্ডার লোপেজ

লিংকডইনে জাতীয় দলে খেলার আমন্ত্রণ, দেশ ছাড়ার আগে সংবর্ধনা—কেপ ভার্দের লোপেজের গল্প

আয়ারল্যান্ডে জন্ম নেওয়া কেপ ভার্দের ডিফেন্ডার রবার্তো ‘পিকো’ লোপেজের জীবনটাই যেন চমক। জাতীয় দলে ডাক পাওয়া থেকে শুরু করে বিদায় সংবর্ধনা—সবকিছুই যেন একটু অন্য রকম আর অপ্রত্যাশিত। এই তো কদিন আগে বিশ্বকাপে যাওয়ার আগে নিজ শহর ডাবলিনের ক্রামলিনে চমকপ্রদ বিদায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে তাঁকে। অথচ এই সংবর্ধনার কথা লোপেজ নিজেও জানতেন না।

রোববার লোপেজ ভেবেছিলেন, তিনি মা–বাবার বাসায় দুপুরের খাবারের দাওয়াতে যাচ্ছেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছে দেখেন, প্রতিবেশী ও বন্ধুরা একত্র হয়েছেন স্থানীয় এই ফুটবলারকে বিশেষভাবে বিদায় জানাতে। ৩৩ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডার লোপেজ আইরিশ সম্প্রচারমাধ্যম আরটিইকে বলেন, ‘এতগুলো পতাকা দেখে আমার হয়তো বুঝতে পারা উচিত ছিল, এটা শুধু খাওয়ার আয়োজন নয়; বরং একটা বিদায় অনুষ্ঠান!’

এর আগে জাতীয় দলে ডাক পাওয়াটাও ছিল বেশ চমকপ্রদ ঘটনা। আয়ারল্যান্ডের লিগ অব ক্লাব শামরক রোভার্সের হয়ে খেলা লোপেজ তাঁর কেপ ভার্দিয়ান বাবা কার্লোসের সূত্রে আফ্রিকান দেশটির হয়ে খেলার যোগ্যতা পান। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে খেলার সুযোগটা প্রায় হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছিল তাঁর। ২০১৮ সালে লিংকডইনে কেপ ভার্দে ফুটবল ফেডারেশন থেকে পাঠানো একটি বার্তাকে তিনি স্প্যাম ভেবে উপেক্ষা করেছিলেন।
আয়ারল্যান্ড অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে খেলা এই ডিফেন্ডার বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই ভুয়া মেসেজ বা সন্দেহজনক ফোনকল সম্পর্কে সতর্ক থাকতে শেখানো হয়। তাই আমি ভেবেছিলাম, এটা হয়তো স্প্যাম।’

এক বছর পর আবারও লোপেজের সঙ্গে যোগাযোগ করেন আগুয়াস। এবার জাতীয় দলে খেলার আগ্রহ আছে কি না, সেটিই জানতে চাওয়া হয়। তখন অনলাইন অনুবাদ টুল ব্যবহার করে বার্তার অর্থ বুঝতে পারেন লোপেজ এবং দ্রুতই আগ্রহ প্রকাশ করে উত্তর দেন। ফিফাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে লোপেজ বলেন, ‘আমার সম্ভবত আরও আগেই গুগল ট্রান্সলেট ব্যবহার করা উচিত ছিল! জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগটা আমি শতভাগ মন থেকে নিতে চেয়েছিলাম। সৌভাগ্যবশত সুযোগটা হাতছাড়া হয়নি। এরপর থেকে যাত্রাটা অসাধারণ।’

কেপ ভার্দে জাতীয় দলে ডাক পাওয়াটা শিকড়ের প্রতিও আগ্রহী করে তুলেছে লোপেজকে, ‘জাতীয় দলের ডাক পাওয়ার পর আমি আমার শিকড় আর পারিবারিক ঐতিহ্য নিয়ে আরও গভীরভাবে জানতে শুরু করি। এখন তো এটা নিয়ে কথা বলাই থামাতে পারি না! আমার বাবার জন্যও ব্যাপারটা দারুণ। মানুষ তাঁর জন্মস্থান সম্পর্কে জানছে, এতে তিনি খুব গর্ব অনুভব করেন। তিনি এটা ভীষণ উপভোগ করেন।’

কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ খেলায় অবদান আছে লোপেজের (মাঝে)

তবে জাতীয় দলের হয়ে তাঁর পথচলার শুরুতে স্নায়ুচাপে ভোগার কথাও জানান তিনি, ‘আমি ভাবলাম, ইংরেজি গান গাওয়া যাবে না, স্থানীয় কোনো গানই গাইতে হবে। তাই স্পটিফাইয়ে গিয়ে কেপ ভার্দের জনপ্রিয় পুরোনো গানগুলো খুঁজলাম, তারপর একটা বেছে নিয়ে গেয়ে ফেললাম।’

লোপেজের ভাষায়, ‘গানটার নাম সম্ভবত ছিল “ডান্সা মামি ক্রেওলা”। আমি গানটা একেবারে নষ্ট করে ফেলেছিলাম! কিন্তু ছেলেরা সেটা ভীষণ পছন্দ করেছিল। এসবই মূলত সহজ হতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছিল।’

২০১৯ সালে কেপ ভার্দের হয়ে অভিষেক হয় লোপেজের। ২০২৪ আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে কেপ ভার্দের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাঁর। এ ছাড়া বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ১০ ম্যাচের মধ্যে ৯টিতেই শুরুর একাদশে খেলেছেন তিনি।

লোপেজ এবার বিশ্বকাপে আইরিশ ফুটবল সমর্থকদেরও বাড়তি সমর্থনের কারণ হয়ে উঠতে পারেন। কারণ, ২০০২ সালের পর আর বিশ্বকাপে উঠতে না পারা আয়ারল্যান্ড এবারও আসরে জায়গা পায়নি। প্লে-অফ সেমিফাইনালে চেক প্রজাতন্ত্রের কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিতে হয়েছে তাদের।

রক্ষণে কেপভার্দের ভরসার নাম লোপেজ

লোপেজকে নিয়ে প্রতিবেশী শিনা হিভি বলেন, ‘পিকো, তাঁর পরিবার এবং পুরো জাতির জন্যই এটি বিশাল এক অর্জন। বহু, বহু বছর পর কোনো আইরিশ ফুটবলার বিশ্বকাপে খেলতে যাচ্ছেন।’

দলের তালিকায় তাঁর নাম ‘রবার্তো’লেখা থাকলেও লোপেজ মূলত ‘পিকো’ নামে পরিচিত। এই ডাকনামটি দিয়েছিলেন তাঁর বাবা। এই নামকরণ নিয়ে লোপেজ বলেন, ‘এর পেছনে কয়েকটি কারণ আছে। আমার বাবার এলাকায় “পিকো” শব্দের অর্থ “শক্তিমান মানুষ”। আবার সেখানে একটি বড় পাহাড়ও আছে—পিকো দো মন্তে গোরদো। তাই নামটির সঙ্গে নানা ধরনের অর্থ জড়িয়ে আছে!’

কেপ ভার্দে তাদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে আগামী ১৫ জুন ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে। এরপর গ্রুপ ‘এইচ’-এ উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের মুখোমুখি হবে তারা।