‘আমার পছন্দ, আমার দেশ’—তেহরানের কেন্দ্রস্থলে ভালিআসর স্কয়ারে এক বিশাল বিলবোর্ডে শোভা পাচ্ছিল এই স্লোগান। ইরানের জাতীয় টেলিভিশনে সরাসরি দেখানো হচ্ছিল এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। সেখানে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন দেশটির নারী ফুটবল দলের সদস্যরা। পাশে সরকারি কর্মকর্তারা। পতাকাবাহী একদল মানুষের উল্লাসের মধ্য দিয়ে তাঁদের বীরোচিত অভ্যর্থনা জানানো হয়।
ইংল্যান্ড জাতীয় দলের মতো ইরানের নারী দলও ‘লায়নেস’ নামে পরিচিত। অস্ট্রেলিয়ায় নারী এশিয়ান কাপে তিন ম্যাচের সব কটিতেই হেরেছে ইরান। গত বৃহস্পতিবারের সেই সংবর্ধনা আয়োজন খুব একটা দীর্ঘ হয়নি; কারণ, প্রতি রাতেই দেশটিতে মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান থেকে বোমা হামলা চালানো হচ্ছিল। তবে ইরান সরকারের কাছে এই খেলোয়াড়দের দেশে ফেরাটাই ছিল এক বড় জয়। মাত্র কয়েক দিন আগেই দলের অধিনায়ক, পাঁচ খেলোয়াড় ও কিট-উইম্যান ব্রিসবেনের একটি সেফ হাউসে ছিলেন এবং তারা দেশত্যাগের পরিকল্পনা করছিলেন। শেষ পর্যন্ত মাত্র দুজন সেখানে থেকে যান।
ইরান ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট মেহেদি তাজ ঘোষণা করেন, ‘এটা নিশ্চিত যে এই অ্যাথলেটরা তাদের মাতৃভূমি, পতাকা, নেতা ও বিপ্লবের প্রতি অনুগত।’ জার্সি ও বাধ্যতামূলক কালো হিজাব পরে মঞ্চে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত গাইছিলেন নারী ফুটবলাররা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস জানিয়েছে, ক্যামেরায় নারী খেলোয়াড়দের মুখগুলো বিষণ্ন দেখা গেছে। খেলোয়াড়েরা হয়তো মনে মনে ভাবছিলেন—কী আছে তাঁদের ভাগ্যে!
অথচ তিন সপ্তাহও পার হয়নি, নারী এশিয়ান কাপে ইরানের উদ্বোধনী ম্যাচের আগে জাতীয় সংগীতের সময় চুপ করে থাকায় খেলোয়াড়দের ‘যুদ্ধকালীন বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিয়েছিল দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন।
সেদিন সকালেই ১৯ বছর বয়সী কুস্তিগির সালেহ মোহাম্মদিসহ আরও দুই তরুণের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। গত জানুয়ারির বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগে তাঁদের এই দণ্ড দেওয়া হয়। দ্য টাইমসের ধারণা, এই বিক্ষোভে সরকারি বাহিনীর হাতে অন্তত ৩০ হাজার মানুষ গণহত্যার শিকার হয়েছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন ইরানের জাতীয় পুরুষ দলের গোলকিপার রশিদ মাজাহেরি। সেখানে তিনি ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে ‘শয়তানের’ সঙ্গে তুলনা করেন। এর পর থেকেই নিখোঁজ রয়েছেন মাজাহেরি।
ইরান নারী ফুটবল দলের অনেক সদস্যের বয়স মাত্র ২১ বছর। তাঁদের সামনে পথ ছিল দুটি, যার একটি অন্যটির চেয়ে কঠিন। একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত নিজ দেশ আর দমনকারী শাসকগোষ্ঠী—যাদের হাতে তাদের বন্ধুসহ হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আর অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয়, যা তাদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা দিলেও দেশে থাকা পরিবারকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিত।
‘এটি একটি সন্ত্রাসী শাসনব্যবস্থা, যারা চাপ সৃষ্টি করার জন্য যেকোনো হীন পথ বেছে নিতে পারে’—দ্য টাইমসকে বলেছেন ইরান জাতীয় দলে খেলা ৫৮ বছর বয়সী সাবেক ফুটবলার মোহাম্মদ তাগভি। এখন তিনি ইংল্যান্ডে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন এবং খেলাধুলার ধারাভাষ্য দেন। তাগভি জানিয়েছেন, জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে তাঁর পরোক্ষ যোগাযোগ আছে। তাগভির ভাষায়, ‘তারা যদি বোঝে আপনার দুর্বল জায়গা পরিবার, তবে সেটিকেই তারা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে। এই মেয়েগুলো তো শিশু; ভাবুন তো, মায়েরা যখন কান্নাকাটি করে তাদের প্রাণভিক্ষা চায়, তখন তাদের মনের অবস্থা কী হয়!’
কিছুদিন আগপর্যন্তও ইরানে নারীদের স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলা দেখার অনুমতি ছিল না। অনেক নারী পুরুষের ছদ্মবেশে লুকিয়ে গ্যালারিতে ঢুকতেন। ২০১৯ সালে সাহার খোদায়ারি নামের এক তরুণী ইরানের আজাদি স্টেডিয়ামে প্রবেশের চেষ্টা করে গ্রেপ্তার হন। ‘ব্লু গার্ল’ বা ‘নীল কন্যা’ নামে পরিচিত সেই তরুণী পরে আদালত প্রাঙ্গণে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন এবং হাসপাতালে মারা যান।
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থাগুলোর সদস্যপদ টিকিয়ে রাখতে দেশগুলোয় নারী দর্শক এবং জাতীয় নারী ফুটবল দল থাকা বাধ্যতামূলক। এই নিয়ম না মানলে পুরুষ দলও আগামী বিশ্বকাপের মতো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টগুলোয় খেলার যোগ্যতা হারাবে। আর সেই বিশ্বকাপেই অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে ইরানের; যদিও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে ইরান ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ইরান জাতীয় দলের হয়ে খেলা ছিল দেশটির নারী ফুটবলারদের জন্য স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো ব্যাপার। অস্ট্রেলিয়ায় এশিয়ান কাপের আয়োজকদের দেওয়া ‘নির্ভীক স্বপ্ন’ (ড্রিম ফিয়ারলেস) স্লোগানটি যেন এই দলের সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি মানানসই।
কিন্তু সেই স্বপ্ন অনেকের জন্য শেষ পর্যন্ত দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। অস্ট্রেলিয়ার গোল্ড কোস্টের রয়্যাল পাইনস রিসোর্ট হোটেল থেকে ইরানি নারী ফুটবল দলের খেলোয়াড়দের স্বাধীনতার খোঁজে পালানোর চেষ্টা যেন কোনো সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। তিন সপ্তাহ আগে তাঁরা যখন সেখানে পৌঁছান, তার কিছু সময় পরই ইরানে শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিশাল বিমান হামলা। সে হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন।
দ্য টাইমস জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর সময় হোটেলের টেলিভিশন আর মুঠোফোনের স্ক্রিনে সারাক্ষণ চোখ রাখছিলেন নারী ফুটবলাররা। ইরানে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটছিল খেলোয়াড়দের।
সংবাদমাধ্যমটি আরও জানিয়েছে, লি সোয়ানসবোরো নামের ৫৫ বছর বয়সী এক অস্ট্রেলীয় নারী এক দশকের বেশি সময় ধরে ইরানের নারী ফুটবলের খোঁজখবর রাখেন। একটি ইনস্টাগ্রাম পোস্ট দেখে তিনি বুঝতে পারেন, দলটি এই হোটেলেই অবস্থান করছে। এরপর খেলোয়াড়দের দেখার জন্য সেই হোটেলে যান সোয়ানসবোরো। ২০২২ সালে সোয়ানসবোরো ইরান ভ্রমণ করেন এবং গত বছর পার্থে অলিম্পিক বাছাইপর্বের ম্যাচেও ইরানের নারী খেলোয়াড়দের সমর্থন দিতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
সোয়ানসবোরো দ্য টাইমসকে বলেন, ‘গত জানুয়ারিতে বড় ধরনের একটি গণহত্যার দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে দলটি খেলতে এসেছিল। তাদের অনেক বন্ধু ও পরিবারের সদস্য সেই সময় প্রাণ হারিয়েছেন।’
২ মার্চ দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে নারী এশিয়ান কাপে প্রথম ম্যাচ খেলে ইরান। যুদ্ধ শুরুর ৪৮ ঘণ্টাও পার হয়নি তখন। ম্যাচের আগে যখন জাতীয় সংগীত বাজছিল, ইরানের খেলোয়াড়েরা তাতে গলা মেলাননি। এটি দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের এক ভাষ্যকার তাঁদের ‘যুদ্ধকালীন বিশ্বাসঘাতক’ বলে আখ্যা দেন এবং তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার দাবি তোলেন। পরের ম্যাচগুলোয় খেলোয়াড়েরা শুধু জাতীয় সংগীতই গাননি, বরং সামরিক কায়দায় অভিবাদন (স্যালুট) জানান।
মাঠের বাইরেও এক রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে জড়িয়ে পড়েন ইরানের খেলোয়াড়েরা। গ্যালারিতে দর্শকদের বড় একটি অংশ ইরানের শেষ শাহর ছেলে রেজা পাহলভির সমর্থনে স্লোগান দেয়। এই পাহলভি গত জানুয়ারিতে বিক্ষোভকারীদের রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং তাঁদের সহায়তায় ট্রাম্প প্রশাসনকে হস্তক্ষেপ করার অনুরোধ করেছিলেন। নিজেকে তিনি ইরানের ‘অন্তর্বর্তীকালীন নেতা’ হিসেবে দাবি করেন। তবে ইরানের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তাঁকে নিয়ে মতভেদ রয়েছে। অনেকের কাছে পাহলভি মানেই তাঁর বাবার আমলের সেই বিলাসিতা আর দুর্নীতির শাসন।
সোয়ানসবোরো দ্য টাইমসকে বলেন, ‘আপনাকে বুঝতে হবে যে সফরের সময় তাঁদের চারপাশে থাকা সবাই মূলত গোয়েন্দা সংস্থার লোক। খেলোয়াড়েরা সেখানে কার্যত বন্দী হয়ে থাকেন। কোচিং স্টাফের বাইরে দলের সঙ্গে থাকা অন্য সব কর্মীকে সরকারের অনুগত হতে হয়। তা না হলে সরকার তাঁদের পাঠাত না; কারণ, তারা নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে চায়। শাসকগোষ্ঠী বিশ্বকে দেখাতে চায় যে সবকিছু “স্বাভাবিক ও ঠিকঠাক” আছে এবং এই মেয়েদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়।’
খেলোয়াড়দের মুঠোফোনে আড়ি পাতা হতে পারে—এমন আশঙ্কায় সোয়ানসবোরো সরাসরি তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। প্রথম দিন সকালে হোটেলের লবিতে বসে তিনি ভাবছিলেন, নাশতার টেবিলে যাওয়ার সময় হয়তো তাঁদের দেখা মিলবে। কিন্তু দেখা গেল উল্টো চিত্র। নিচু মাথায় হেঁটে যাওয়া খেলোয়াড়দের ঘিরে রেখেছিল নিরাপত্তারক্ষীরা। সোয়ানসবোরো বলেন, ‘আমি বুঝতে পারলাম, তাঁদের কোনো পাবলিক জায়গায় খাওয়ার অনুমতি নেই, যেখানে সাধারণ মানুষ তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে পারে। এমনকি কফি শপ থেকে কফি কেনারও সুযোগ নেই তাঁদের।’
সোয়ানসবোরো আরও বলেন, ‘হোটেল কর্তৃপক্ষ আমাকে সম্ভবত চতুর্থ দিনেই জানিয়ে দেয় যে আমি যদি খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বলা চালিয়ে যাই, তবে আমাকে হোটেল থেকে বের করে দেওয়া হবে। অথচ আমি সেখানে অর্থ দিয়ে থাকা একজন অতিথি। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, “বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলা কি অবৈধ?” তারা বলেছিল, “আসলে এটি দলের ম্যানেজারের নিয়ম।” তখন আমি তাদের মনে করিয়ে দিয়েছিলাম যে ইরান সরকারের দেওয়া সেই কঠোর নিয়মগুলোই এখন আপনারা এখানে কার্যকর করছেন। আর এই মেয়েগুলো তো আসলে বন্দী।’
নারী এশিয়ান কাপ থেকে বিদায়ের পর ইরানের মেয়েদের দেশে ফেরার প্রস্তুতি শুরু হয়। শেষ ম্যাচেও হারের পর মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে যখন ইরানের টিম বাস স্টেডিয়াম ছেড়ে যাচ্ছিল, তখন একদল বিক্ষোভকারী বাসটিকে ঘিরে ধরে ‘আমাদের মেয়েদের বাঁচাও’ বলে স্লোগান দিয়েছেন। বাসের ভেতর কয়েকজন খেলোয়াড়কে ‘এসওএস’ (বাঁচানোর আকুতি) সংকেত দিতে দেখা যায়, যদিও অন্যরা তখন বাসের পর্দা টেনে দিয়েছিলেন।
এর আগে কয়েক দিন ধরে স্থানীয় প্রবাসী ইরানিদের মাধ্যমে দেশটির ইমিগ্রেশন বা অভিবাসন বিভাগের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রাখছিলেন ফুটবল দলের সদস্যরা। তাঁদের সম্ভাব্য পলায়ন বা দেশত্যাগের বিষয়টি নিয়ে পর্দার আড়ালে কাজ করছিল অস্ট্রেলীয় ফেডারেল পুলিশ (এএফপি) ও দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পরিস্থিতি চূড়ান্ত রূপ নেয় পরদিন ৯ মার্চ সন্ধ্যায়। ডিনারের সময় দেখা যায় দলের পাঁচ খেলোয়াড় নিখোঁজ। তাঁরা হলেন দলের অধিনায়ক ও ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা জোহরা গানবারি, ফাতেমেহ পাসানদিদেহ, জোহরা সারবালি, আতেফে রামাজানজাদেহ ও মোনা হামুদি।
তখন হোটেলের লবিতে ছিলেন সোয়ানসবোরো ও সিডনির কাউন্সিলর ইরানি বংশোদ্ভূত টিনা করদরোস্তামি। টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই টিনা খেলোয়াড়দের ওপর সম্ভাব্য হুমকির বিষয়ে অস্ট্রেলীয় সরকারকে সতর্ক করেছিলেন।
সোয়ানসবোরো বলেন, ‘সেদিন আমি হোটেলের অতিথি না হওয়া সত্ত্বেও সারা দিন লবিতে পড়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিই। আমি জানতাম, বড় কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। সময় দ্রুত বয়ে যাচ্ছিল। আমি দেখলাম, স্যুট পরা কিছু ব্যক্তি এএফপির কর্মকর্তাদের সঙ্গে লিফটে চড়ে ওপরে যাচ্ছেন। আমি নিশ্চিত হলাম যে তলেতলে কাজ চলছে। সেখানে একজন নারীকেও দেখলাম, যাঁর পোশাক দেখে মনে হচ্ছিল তিনি একজন ইমিগ্রেশন আইনজীবী।’
হঠাৎই একটি হট্টগোল তাঁদের নজরে আসে। সোয়ানসবোরো দ্য টাইমসকে বলেন, ‘চোখের কোণ দিয়ে দেখলাম ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) এক সদস্য এবং দলের কোচ খুব দ্রুত হাঁটছেন, একপর্যায়ে তাঁরা দৌড়াতে শুরু করেন। তাঁরা পার্কিংয়ের সিঁড়ির দিকে যাচ্ছিলেন। দেরি না করে আমিও তাঁদের পিছু নিলাম।’
পুরো ঘটনা নিজের মুঠোফোনে ধারণ করছিলেন সোয়ানসবোরো। তাঁর পেছনে থাকা টিনাও ভিডিও করছিলেন। সোয়ানসবোরো চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘আমি জানি তোমরা কারা। তোমরা আইআরজিসি!’ সোয়ানসবোরো আরও বলেন, ‘ইরানে এভাবে হেনস্তা হওয়ার অভ্যাস তাঁদের নেই। কারণ, ইরানে এই কাজ করলে নির্ঘাত মেরে ফেলা হতো। ব্যক্তিগত কারণও ছিল; এই আইআরজিসি আমার বন্ধুদের হত্যা করেছে। তাই আমি চিৎকার করে বলছিলাম—আইআরজিসি, অস্ট্রেলিয়া ছেড়ে দূর হও!’
নারী ফুটবলারদের অস্ট্রেলিয়ায় একটি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। ততক্ষণে তাঁদের কাহিনি বিশ্বজুড়ে আলোচনার ঝড় তোলে। আশ্রয় চাওয়া খেলোয়াড়দের পাশে দাঁড়ায় অস্ট্রেলিয়া। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায় ইরান সরকার। তারা অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে খেলোয়াড়দের ‘অপহরণের’ অভিযোগ তোলে। তবে দলের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানায়, উল্টো খেলোয়াড়দের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ইরানে তাঁদের পরিবারের সদস্যদের অপহরণ করেছে দেশটির সরকার। বাকি খেলোয়াড়দের দ্রুত মালয়েশিয়াগামী ফ্লাইটে তুলে দেওয়া হয়।
দলের অর্ধেক সদস্য যখন কুয়ালালামপুরের একটি হোটেলে অপেক্ষা করছিলেন, তখন ব্রিসবেনের সেফ হাউসে থাকা তাঁদের সতীর্থরা দোটানায় পড়ে যান। বর্তমানে নির্বাসিত সাবেক ইরানি ফুটবলার শিবা আমিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘ইরান সরকার তাঁদের পরিবারকে হুমকি দিতে শুরু করে এবং কার্যত পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে ফেলে। এ কারণেই তাঁরা রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাহার করে দেশে ফিরতে বাধ্য হন।’
গত শনিবার রাত পর্যন্ত মাত্র দুজন খেলোয়াড় অস্ট্রেলিয়ায় থেকে যান—৩৪ বছর বয়সী আতেফে রামাজানজাদেহ এবং ২১ বছর বয়সী ফাতেমেহ পাসানদিদেহ। গত সপ্তাহে তাঁদের ব্রিসবেন রোর ক্লাবের সঙ্গে অনুশীলন করতে দেখা গেছে।
এ গল্পের শেষটা কোনো হলিউড সিনেমার মতো আনন্দদায়ক ছিল না। সোয়ানসবোরো বলেন, ‘এই খেলোয়াড়েরা—যাঁরা দেশে ফিরেছেন এবং যাঁরা থেকে গেছেন—সবাইকেই জীবনের কঠিনতম সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এখানে আসলে কেউ জেতেননি।’
ইরানের নারী ফুটবলারদের বীরোচিত সংবর্ধনা দেওয়া হলেও সোয়ানসবোরোর ভয় কাটছে না। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি যখন শান্ত হয়ে আসবে, তখন তাঁদের ওপর শাস্তির খড়্গ নেমে আসবে। আর আমরা সে সম্পর্কে কিছুই জানতে পারব না; কারণ, সেখানে ইন্টারনেট নেই। এই শাস্তি ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ হওয়া হতে পারে, আবার হতে পারে চরম নির্যাতন।’