
সিডনির আকাশটা আজ বেশ নীল। তবে ঝলমলে এই শহরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের নারী ফুটবলারদের মনে যে ঝড় বইছিল গত কয়েক দিন, তা বোধ হয় আন্দাজ করা অসম্ভব। দীর্ঘ ৪৫ বছর পর বাংলাদেশের কোনো ফুটবল দল এশিয়ার সর্বোচ্চ আসরে পা রেখেছিল। এই সফর কি শুধুই ইতিহাস গড়ার মাহেন্দ্রক্ষণ ছিল? নাকি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের ফুটবল অবকাঠামোর করুণ দশাটি স্পষ্টভাবে দেখার উপলক্ষও?
সিডনিতে বসে যখন এই প্রতিবেদন লিখছি, ততক্ষণে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল দেশের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। আজ রাত ১২টা ৫০ মিনিটে তাদের দেশে পৌঁছানোর কথা।
ওয়েস্টার্ন সিডনি স্টেডিয়ামের অত্যাধুনিক গ্যালারি আর নিখুঁত সবুজ ঘাসের গালিচায় যখন মারিয়া মান্দা, মনিকা চাকমা আর শিউলি আজিমরা চীন ও উত্তর কোরিয়ার মতো এশিয়ার পরাশক্তির সঙ্গে খেলেছেন, তখন তাঁদের পায়ের ছন্দে মিশে ছিল এক আক্ষেপ। এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে নামার আগে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ হয়েছে সিডনি ভ্যালেন্টাইন পার্ক ও শহরের এক প্রান্তে রাগবি-ফুটবলের জন্য বিখ্যাত জুবিলি স্টেডিয়ামে। এই সুযোগটা হয়তো পাওয়া যেত না, যদি না সিডনির এই উন্নত ভেন্যুর শরণাপন্ন হতো বাংলাদেশ। কিন্তু এই সুযোগ পাওয়াটাই কি বাংলাদেশের প্রস্তুতির বড় ট্র্যাজেডি নয়?
এশিয়ান কাপে খেলার অভিজ্ঞতা মেয়েদের জন্য এক দারুণ উপলব্ধি। অস্ট্রেলিয়ার নির্মল পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতা, খাবারদাবার এবং স্টেডিয়ামের মখমলে ঘাস—সবকিছুই মুগ্ধ করেছে তাঁদের। তাঁরা অস্ট্রেলিয়ায় এমন কিছু সময় কাটিয়েছেন, যা তাঁদের পেশাদারত্বের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছে। তাঁরা ঘুরেছেন সিডনির ঐতিহাসিক অপেরা হাউস, সিডনির রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনে। এই টুর্নামেন্টে মেয়েরা শিখেছেন ‘মিক্সড জোন’ কাকে বলে, শিখেছেন বড় মঞ্চে কীভাবে নিজেদের সামলে রাখতে হয়। শিখেছেন পরাক্রমশালী দলগুলোর সঙ্গে কীভাবে দাঁতে দাঁত চেপে লড়তে হয়।
তবে মাঠের লড়াইয়ের পরিসংখ্যানটা বেশ নির্মম। তিন ম্যাচে প্রতিপক্ষের জালে গোল দিতে না পারলেও খেয়েছে ১১টি গোল। চীনের কাছে লড়েও হার ২-০ গোলে, উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে অসহায় আত্মসমর্পণ ৫-০ গোলে, আর শেষ ম্যাচে উজবেকিস্তানের কাছে ৪-০ গোলের হারে শেষ আটে যাওয়ার স্বপ্ন শেষ হয়েছে বাংলাদেশের। আরও গোল হয়তো খেতে পারতেন বাংলাদেশের মেয়েরা, তাতে তাঁদের দোষও দেওয়া যেত না। কিন্তু এই হারের গ্লানির চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে তাঁদের প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতা, দেশে খেলাহীনতার সংস্কৃতি আর নামমাত্র একটা লিগের অভিজ্ঞতা।
বাফুফের কর্তারা টিভি ক্যামেরায় সমানে বাগাড়ম্বর করলেও প্রস্তুতির জন্য কার্যকর কিছুই করেননি। মেয়েদের দেশের বাইরে কোথাও ক্যাম্প করানোর একাধিক প্রতিশ্রুতি দিয়েও শেষ পর্যন্ত ফল অশ্বডিম্ব। অস্ট্রেলিয়ায় আসার আগে তিন মাস কোনো প্রস্তুতি ম্যাচ খেলানো হয়নি মেয়েদের, ভাবা যায়! লিগের মান বাড়ানোর কোনো চেষ্টা করতেও কর্তাদের দেখা যায়নি।
‘মাঠই আমাদের বড় প্রতিপক্ষ’ সংবাদ সম্মেলনে বারবার কোচ পিটার বাটলার প্রস্তুতি নিয়ে বাফুফের বালখিল্যতার প্রসঙ্গ টেনেছেন। বিদেশি সাংবাদিকেরা সেসব শুনে কী ভেবেছেন কে জানে! তবে পার্থে উজবেকদের কাছে ৪ গোলে উড়ে যাওয়ার পর বাটলার নিজেদের বিদায়ের ইঙ্গিত দিয়ে শেষ আক্ষেপটা ঝেড়েছেন এভাবে, ‘আমাদের একটি ভালো মাঠ নেই।’
তারপরই তিনি টেনে আনেন দারুণ এক উদাহরণ, ‘ব্যাপারটা এমন যে একজন বক্সার এক হাত পেছনে বেঁধে লড়াইয়ে নেমেছে।’ কথাটার তাৎপর্য বাফুফের কর্তারা বুঝবেন কি না, কে জানে! সিডনি বা পার্থের মিডিয়া সেন্টারে বসে বাটলার যে কথাগুলো বলেছেন গত কদিনে, তা ফুটবল ফেডারেশনের কর্তাদের কানে পৌঁছাবে কি না, সে–ও এক প্রশ্ন। কারণ, ফুটবল কর্তারা টিভি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের প্রচারের কাজে ব্যস্ত থাকতেই বেশি ভালোবাসেন।
বাটলারের সাফ কথা ছিল, ‘আমরা এই মঞ্চে এসেছি নিজেদের প্রমাণ করতে, কিন্তু আমরা কোনো জাদুর কাঠি নিয়ে আসিনি।’ কোচ বারবার যে বিষয়টির ওপর জোর দিচ্ছিলেন, তা হলো তাঁর ভাষায় ‘প্রপার ট্রেনিং গ্রাউন্ড’ বা ভালো অনুশীলন মাঠ না পাওয়া। বাটলারের মতে, সিডনি বা পার্থের প্রতিটি মাঠ যেন এক একটি শিল্পকর্ম। এখানকার ঘাসের ঘনত্ব, মাটির ভারসাম্য আর ড্রেনেজ সিস্টেম এমনভাবে তৈরি যে বলের গতি কখনোই স্বাভাবিক ছন্দের বাইরে যায় না।
কিন্তু বাটলার যখন বাংলাদেশে তাঁর শিষ্যদের প্রশিক্ষণ দেন কমলাপুর স্টেডিয়ামের টার্ফে বা ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে, তখন সেই সেসব মাঠের কথা ভেবেই শিউরে ওঠেন। কোচ আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘আমি জানি না, আপনারা কীভাবে প্রত্যাশা করেন যে মেয়েরা বিশ্বমানের ফুটবল খেলবে, যদি তাদের পায়ের নিচে সেই মানের মাঠটাই না থাকে।’ বাটলারের এই আকুতি যেন এক অরণ্যে রোদন।
দলের অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার শিউলি আজিম সিডনির জুবিলি স্টেডিয়ামে অনুশীলন শেষে মাঠ থেকে যখন বেরিয়ে আসছিলেন, তখন তাঁর পায়ের বুটের নিচে লেগে থাকা ঘাসগুলো যেন তাঁকে বিদায় জানাল। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি যা বললেন, তা এককথায় মর্মস্পর্শী, ‘সিডনির মাঠগুলো কতটা ভালো, তা বলে বোঝানো যাবে না। আমরা যখন এখানে বল পাস দিই, তখন বলের গতিতে আমরা অভ্যস্ত নই (দেশের মাঠগুলো অনেকটা শক্ত আর অমসৃণ)। দেশে বল নিয়ন্ত্রণ করতে যে শক্তি ব্যয় করতে হয়, এখানে তার অর্ধেকও লাগে না।’
একই সুর অধিনায়ক আফঈদা খন্দকারের কণ্ঠে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মেয়েরা লড়াই করেছেন শুধু বড় দলের সঙ্গে নয়, লড়াই করেছেন নিজেদের সামর্থ্য বাড়ানোর জন্যও। কিন্তু ভালো একটা মাঠ ছাড়া কি ভালো ফুটবলার হওয়া যায়? আফঈদার ভাষায়, ‘আমরা আমাদের দেশে একটা ভালো মাঠ চাই। আমাদের এমন একটা মাঠ দিন, যেখানে আমরা ভালো ফুটবল খেলতে পারি।’ পার্থে উজবেকিস্তানের কাছে হেরে সংবাদ সম্মেলনে বলা আফঈদার এ কথাটা কানে বড় বেশি বাজে।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, অস্ট্রেলিয়ায় আসার আগে মেয়েদের জন্য কমলাপুরের টার্ফে নামকাওয়াস্তে একটা লিগ আয়োজন করে বাফুফে। সেই লিগে হয়ছে ভূরি ভূরি গোল। সব মিলিয়ে মেয়েরা যখন সিডনিতে পা রাখেন, তখন তাঁরা মানসিকভাবে বেশ চাপে ছিলেন। সিডনির ভ্যালেন্টাইন স্পোর্টস পার্কে প্রথমে ওঠা, তারপর টিম হোটেল থেকে জুবিলি স্টেডিয়াম পর্যন্ত প্রতিদিন ৪০-৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েও মেয়েরা অনুশীলনে কমতি রাখেননি।
দিন শেষে পার্থের মিষ্টি রোদ যখন মুছে যায়, তখন শিউলি আজিম আর আফঈদা খন্দকারদের সেই আকুতি যেন বাতাসে ভেসে বেড়ায়, ‘আমাদের একটা মাঠ দাও।’ এই আক্ষেপ শুধুই ফুটবলের নয়, এটি প্রতিটি সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়ের হৃদয়ের আর্তনাদ। বাফুফে কি এবার নড়েচড়ে বসবে? নাকি আরেকটি আন্তর্জাতিক আসরে গিয়ে আবারও মেয়েদের ভালো মাঠের অভাব এবং ভালো মানের প্রস্তুতি নিয়ে কাঁদতে হবে?
তাত্ত্বিকভাবে ফিজিও সমস্যার সমাধান হয়েছে একজন অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশি ফিজিওকে নেওয়ার মাধ্যমে। কিন্তু দলের ভেতরের পরিবেশ বলছে, এ যেন ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ লাগানো। কোচ পিটার বাটলার দলের শৃঙ্খলা ও মানসিক কাঠামোর ওপর কাজ করছেন। তিনি খেলোয়াড়দের বলেছিলেন, ‘রক্ষণে বাস পার্কিং কোরো না, নিজেদের মেলে ধরো।’ কিন্তু বাস পার্কিং না করে যখন প্রতিপক্ষ চীন-কোরিয়া বা উজবেকিস্তানের মতো দলের সামনে দাঁড়াতে হয়, তখন রক্ষণের ভুলগুলোই বড় হয়ে ওঠে। আর এই ভুলগুলো শোধরানোর জন্য যে অনুশীলনের প্রয়োজন, তা বাংলাদেশে অসম্ভব।
সিডনি-পার্থের ভেন্যুগুলোয় বাংলাদেশর জাতীয় পতাকা উড়ছে, জাতীয় সংগীত বেজেছে। প্রবাসী বাঙালিরা উৎসাহিত। সিডনি ও পার্থের স্টেডিয়ামে লাল-সবুজের জার্সি গায়ে গ্যালারি মুখর করেছেন তাঁরা। একজন সাংবাদিক হিসেবে স্টেডিয়াম চত্বরে যখন হাঁটছিলাম, দেখলাম বাদুড় ঝুলে থাকা পুরোনো ক্রিকেট মাঠ আর নিখুঁত রাগবি মাঠগুলো। অস্ট্রেলিয়ার এই মাঠগুলো দেখলে মনে হয়, খেলাধুলা এখানে জীবনের অংশ। বাংলাদেশে খেলাধুলা শুধুই একটা ইভেন্ট।
২১ দিনের এই টুর্নামেন্ট শেষ হবে ২১ মার্চ, সিডনি অলিম্পিক স্টেডিয়ামে। সেই স্টেডিয়ামে আছে ২০০০ সালে সিডনি অলিম্পিকে অংশ নেওয়া বাংলাদেশের ৫ অ্যাথলেটের নামও। সেখানে আজ বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল নেই, কিন্তু তারা লড়েছিল বড় কোনো লক্ষ্যের জন্য। ২০২৭ সালের ফিফা নারী বিশ্বকাপ, ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক—এই বড় মঞ্চের স্বপ্নের দিকে তাকিয়ে মেয়েরা তাঁদের জীবনের সেরা পারফরম্যান্স দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু হলো না।
দিন শেষে পার্থের মিষ্টি রোদ যখন মুছে যায়, তখন শিউলি আজিম আর আফঈদা খন্দকারদের সেই আকুতি যেন বাতাসে ভেসে বেড়ায়, ‘আমাদের একটা মাঠ দাও।’ এই আক্ষেপ শুধুই ফুটবলের নয়, এটি প্রতিটি সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়ের হৃদয়ের আর্তনাদ। বাফুফে কি এবার নড়েচড়ে বসবে? নাকি আরেকটি আন্তর্জাতিক আসরে গিয়ে আবারও মেয়েদের ভালো মাঠের অভাব এবং ভালো মানের প্রস্তুতি নিয়ে কাঁদতে হবে?
সিডনি-পার্থের এই নিখুঁত সবুজ গালিচা বাংলাদেশের নারী ফুটবলারদের মনে এক চিরস্থায়ী দাগ রেখে যাবে। তাঁরা আজ জানছেন যে ফুটবল শুধুই প্রতিভার লড়াই নয়, এটি পরিকাঠামোরও লড়াই। উজবেকিস্তানের মতো ৬৩ ধাপ এগিয়ে থাকা দলকে হারানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন মেয়েরা, কিন্তু তার আগে কি উচিত নয় নিজেদের ঘরটা অন্তত সাজিয়ে নেওয়া?
সিডনি-পার্থের স্টেডিয়াম থেকে পাওয়া এই অভিজ্ঞতা যদি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ফুটবলের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে, তবেই এই সফর সফল। নইলে লড়াইটা শুধুই একটি পরিসংখ্যান হয়ে বেঁচে থাকবে ইতিহাসের পাতায়। সিডনি থেকে এখন একটাই চাওয়া—আগামী দিনে যেন এই মেয়েরাই দেশের মাঠে এমন নিখুঁত ঘাসের ওপর বল নিয়ে দৌড়াতে পারেন, র্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে থাকা দলের সঙ্গে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার সুযোগ মেলে।