বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোল এমবাপ্পের
বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোল এমবাপ্পের

তর্জনী উঁচিয়ে গোলের এভারেস্টে এমবাপ্পে

বল ইংল্যান্ডের জালে। কিলিয়ান এমবাপ্পে দৌড়াচ্ছেন তর্জনী উঁচিয়ে। এ ছবি ফিরিয়ে নেয় ২০ বছর আগের এক স্মৃতিতে। সেটি অন্য এক উঁচু তর্জনীর গল্প।

২০০৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলো। ঘানার জালে গোল করে তর্জনী উঁচিয়ে ছুটলেন রোনালদো নাজারিও। চেনা উদ্‌যাপন, কিন্তু সেদিনেরটা বিশেষ। তর্জনীটি উঠেছিল বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডের পর। ২০ বছর পর সেই একই সিংহাসনে আসীন হয়ে উঠল এমবাপ্পের তর্জনীও। তাতে গর্বে ক্লদ ম্যাকলেলের বুকের ছাতি ফুলে ওঠার কথা।

শুধু দেশের ছেলে হিসেবে নয়; এমবাপ্পেকে ‘আধুনিক সময়ের আরনাইন’ মনে হয় সাবেক এই মিডফিল্ড জেনারেলের। মার্কাকে কয়েক দিন আগেই বলেছেন কথাটা। গতি, সামর্থ্য ও ফিনিশিংয়ে মিল যে নেই তা নয়। মিল পান ‘আরনাইন’ মানে রোনালদো নিজেই। সপ্তাহ তিনেক আগেই লেকিপকে বলেছেন, ‘এমবাপ্পের খেলার ধরনে নিজের সেরা সময়টা মনে পড়ে।’

মুদ্রার এক পিঠের মতো এটি এমবাপ্পের ব্রাজিলিয়ান-সংযোগের স্রেফ এক পাশ। অন্য পাশটা দেখে অবশ্য রোনালদোর স্বস্তি লাগবে না। এবার বিশ্বকাপে এমবাপ্পের গোলসংখ্যা ব্রাজিল দলের সমান। ১০টি। সর্বশেষ বিশ্বকাপেও তা–ই! ৮টি।

ব্রাজিল বিশ্বকাপ ইতিহাসেই সবচেয়ে বেশি গোল করা দল। সেখানে দুটি বিশ্বকাপে (১০ ম্যাচ) কেউ একাই তাঁদের সমান গোল করলে একটু অবাক তো লাগেই। এমবাপ্পের বেলায় সব স্বাভাবিক। ফাইনালে লিওনেল মেসি রেকর্ডটি নিয়ে নিলে সেটাও স্বাভাবিক। কিন্তু তারপর অনাগত দিনগুলো ভাবলে বিস্ময়ে চোখ কপালে ওঠে।

জোড়া গোলে বিশ্বকাপ শেষ করেছেন এমবাপ্পে

মেসির বয়স ৩৯ বছর। এটাই যে তাঁর শেষ বিশ্বকাপ, মোটামুটি নিশ্চিত। ৩৩ ম্যাচে তাঁর ২১ গোল, এমবাপ্পের ২২ ম্যাচে ২২। মেসি পুরোদস্তুর স্ট্রাইকার না হওয়ায় ব্যাপারটা যেমন অবিশ্বাস্য লাগে, তেমনি এমবাপ্পে স্ট্রাইকার হওয়ায় বিস্ময় জাগে অনাগত দিনগুলোয় তাকিয়ে।

এবারই এমবাপ্পে তাঁর দ্বিতীয় গোল্ডেন বুটটি জিততে পারেন। বিশ্বকাপে এমন কিছু আগে দেখা যায়নি। অথচ বয়স মাত্র ২৭ বছর। এমবাপ্পের যে ফিটনেস, তাতে আরও দুটি বিশ্বকাপে খেলা মোটামুটি নিশ্চিত।

আধুনিক ক্রীড়াবিজ্ঞান ও নিজের প্রতি যত্ন হয়তো তাঁকে আরও একটি বিশ্বকাপের ট্রেন ধরিয়ে দিতে পারে। এবার ভাবুন, ২২ গোলের এই পরিসংখ্যান কোন উচ্চতায় উঠতে পারে? এই ধরুন, ২৯,০৩১.৭ ফুট! ওটা মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা।

এমবাপ্পে আপাতত কোন গতিতে সেই ‘পর্বত’ বেঁধে যাচ্ছেন, সেটার একটি উদাহরণ দেওয়া যায়। ২০১৮ বিশ্বকাপে ৪ গোল, ’২২ বিশ্বকাপে ৮ গোল এবং এবার ১০ গোল। সময় যত এগোচ্ছে, গোলের হারও বাড়ছে। কতটা? গত ৫৬ বছরের মধ্যে বিশ্বকাপের এক আসরে এমবাপ্পে ছাড়া কেউ ১০ গোল করতে পারেনি। এবার বিশ্বকাপটা তাঁর হওয়ার কথা ছিল। শুধু স্পেনের বিপক্ষেই তা হয়নি। ফ্রান্সও পারেনি ফাইনালে উঠতে, তবে এমবাপ্পের অমরত্বও ঠেকেনি।

তাতে সবচেয়ে বেশি গা না করা ব্যক্তিও সম্ভবত এমবাপ্পেই। মায়ামিতে ম্যাচ শেষেই বলেছেন,‘বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার চেয়ে আগামীকালের (আজ রাতে) ফাইনাল খেলাটাই বেছে নিতাম।’

আহা, বিশ্বকাপ ফাইনাল! এমবাপ্পে সর্বশেষ দুবারই খেলে একবার জিতেছেন। তবু সাধ মেটে না। কারণটা হয়তো এমবাপ্পে বিশ্বকাপেরই সন্তান। জন্ম ১৯৯৮ বিশ্বকাপের বছর, তাঁর দেশই জিতেছে সেবার। বাকিটা সবারই জানা। ২০১৮ বিশ্বকাপেই তারকা, পরের বিশ্বকাপ ফাইনালে হ্যাটট্রিকে আরও বড় এবং এবার যেন বিশ্বকাপে গোলের সৌরমণ্ডলে বৃহস্পতি নক্ষত্র! ব্যক্তিগত মহলে এমবাপ্পে নিজেই বলেন, বিশ্বকাপে আলো জ্বালতেই নাকি তাঁর জন্ম।

২০১৮ বিশ্বকাপ জিতেছে ফ্রান্স

পৃথিবীতে সেই আলো জ্বলেছিল ১৯৯৮ বিশ্বকাপের প্রায় পাঁচ মাস পর। আর সেই বিশ্বকাপটা হওয়ার কথা ছিল রোনালদোর। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড একদিন তাঁর হবে এবং সেটা কেউ ছুঁতে পারবে না, তেমন আলোচনাও ছিল তখন। পরের অনুমানটি সত্যি হয়নি। কিন্তু এমবাপ্পে তাঁর শেষ বিশ্বকাপটি খেলার পর গোল-পর্বতের ডগায় কেউ উঠতে পারবে?

উত্তরটি আন্দাজ করা সহজ হতে পারে এই পরিসংখ্যানে। এবার বিশ্বকাপে ১৪ গোলে অবদান এমবাপ্পের। বিশ্বকাপের ইতিহাসে শুধু একজনই তাঁর চেয়ে এই কাজে ভালো ছিলেন। ৬৬ বছর আগে এমবাপ্পেরই স্বদেশি জাস্ট ফন্তেইন (১৫)।

আসলে এমবাপ্পেরা এত দ্রুত আসেন না। ক্ষণজন্মা হতে হয়।