
১৯৩০ সালে মন্টেভিডিওর সেই ধূসর বিকেলে বিশ্বকাপ নামে যে মহাযাত্রার শুরু হয়েছিল, তা আজ শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। এই যাত্রার কোথাও পেলে-গারিঞ্চার সাম্বার ছন্দ, কোথাও ম্যারাডোনার ঈশ্বরপ্রদত্ত জাদুকরি ছোঁয়া, আবার কোথাও জিনেদিন জিদান কিংবা লিওনেল মেসির অমরত্বের পথে হেঁটে যাওয়া—সব মিলিয়েই তো এই ফুটবল-পুরাণ। ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে বিশ্বকাপের সব রোমাঞ্চকর স্মৃতি ফেরানোর আয়োজন—ফিরে দেখা বিশ্বকাপ।
১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ের ২০ বছর পর আবার কোনো স্বাগতিক দেশ উঁচিয়ে ধরল বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটা। ১৯৯৮ সালের সেই ফরাসি গ্রীষ্ম ছিল জিনেদিন জিদানের রাজকীয় উত্থানের। ইস্পাতকঠিন রক্ষণ আর নান্দনিক আক্রমণের মিশেলে সেবার যেন এক নতুন ফুটবল-পুরাণ লিখেছিল ফরাসিরা।
ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোল ব্যবধান (+১৩) আর সবচেয়ে কম গোল হজম (মাত্র ২টি)-পরিসংখ্যানই বলে দেয়, কেন তারা ছিল অনবদ্য। ফ্রান্সের এ জয়ের পেছনে ভাগ্যের ছোঁয়া কিংবা রেফারির কৃপাদৃষ্টি—কোনো কিছুরই বিন্দুমাত্র ভূমিকা ছিল না। বরং পুরো টুর্নামেন্টে ৩টি লাল কার্ড দেখতে হয়েছিল তাদের, যা সে সময় পর্যন্ত কোনো চ্যাম্পিয়ন দলের জন্য ছিল সর্বোচ্চ।
ফিফা সেবারই প্রথম ২৪ দলের বৃত্ত ভেঙে বিশ্বকাপকে নিয়ে গেল ৩২ দলে। আটটি গ্রুপ, প্রতি গ্রুপে চারটি দল—ফুটবলের এই চেনা রূপ মূলত ১৯৯৮ থেকেই শুরু। এ আসরেই জার্মানির বুড়ো হাড়ের ভেলকি দেখালেন ৩৭ বছর বয়সী লোথার ম্যাথাউস। ৫টি বিশ্বকাপে ২৫টি ম্যাচ খেলার রেকর্ড গড়লেন তিনি।
মাঠের লড়াইয়েও রেকর্ডের ছড়াছড়ি। উদ্বোধনী ম্যাচেই স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে মাত্র ৪ মিনিটের মাথায় গোল করে বসেন ব্রাজিলের সিজার সাম্পাইও—বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের ইতিহাসে যা দ্রুততম। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে মাঠে নামার মাত্র ১৬ সেকেন্ডের মাথায় বল জালে জড়ালেন ডেনমার্কের বদলি খেলোয়াড় এব্বে স্যান্ড! বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোনো বদলি ফুটবলারের এটাই দ্রুততম গোলের রেকর্ড।
আর্জেন্টাইন গোলমেশিন গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতাও গড়লেন এক অনন্য কীর্তি। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে গ্রিসের বিপক্ষে তিন গোল করার পর এবার প্যারিসের পার্ক দে প্রিন্সেসে জ্যামাইকার বিপক্ষেও হ্যাটট্রিক করলেন ‘বাতিগোল’। প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করার রেকর্ডটা তাঁরই।
এই বিশ্বকাপেই ফিফা চালু করল এক বিতর্কিত নিয়ম ‘গোল্ডেন গোল’। ৯০ মিনিটের খেলা ড্র হলে অতিরিক্ত সময়ে যে দল আগে গোল করবে, তারাই জিতবে। পুরো টুর্নামেন্টে কেবল একটি ম্যাচই এই নিয়মে মীমাংসা হয়েছিল। দ্বিতীয় রাউন্ডে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ফরাসিদের যখন নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়, ঠিক ১১৩ মিনিটের মাথায় ডিফেন্ডার লরাঁ ব্লঁ গোল করে ফরাসিদের এনে দিলেন সেই ঐতিহাসিক এক জয়।
ক্রোয়েশিয়ার রবার্ট প্রসিনেচকি আবার লিখলেন অন্য এক ইতিহাস। জ্যামাইকার বিপক্ষে ৫৩ মিনিটে গোল করে তিনি বনে গেলেন দুটি ভিন্ন দেশের হয়ে বিশ্বকাপে গোল করা একমাত্র ফুটবলার! ১৯৯০ বিশ্বকাপে তিনি গোল করেছিলেন যুগোস্লাভিয়ার জার্সিতে।
বিশ্বকাপের অফিশিয়াল রেস্তোরাঁ হিসেবে ফিফা বেছে নিয়েছিল মার্কিন ফাস্টফুড জায়ান্ট ম্যাকডোনাল্ডসকে। আর তাতেই চটে লাল ফরাসি শেফদের সংগঠন। তাঁদের সাফ কথা, ‘ফরাসি রন্ধনশৈলী বিশ্বখ্যাত, আমরা একটা বার্গারকে আমাদের জায়গা নিতে দিতে পারি না।’
তবে মজার ব্যাপার হলো, দলগুলো কিন্তু ফ্রান্সের খাবারের ওপর ভরসা রাখেনি। ইতালি দল তো রীতিমতো ট্রাক বোঝাই করে ১ হাজার ৩০০ কেজি পাস্তা, ৩০০ কেজি পারমেসান চিজ, ৫০০ কেজি টমেটো, ৮০টি পারমা হ্যামের পা এবং ৪০০ লিটার ইতালিয়ান ওয়াইন নিয়ে হাজির হয়েছিল ফ্রান্সের মাটিতে!
কলম্বিয়া আর ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ড নিশ্চিত করার পর রোমানিয়া দল এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসল। টুর্নামেন্টের আগে করা এক প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী, সব খেলোয়াড় তাঁদের চুল ব্লিচ করে একদম রুপালি বানিয়ে ফেললেন। আর কোচ আঙ্গেল ইয়োর্দানেস্কু মাথা কামিয়ে ন্যাড়া হয়ে গেলেন! তিউনিশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে যখন তারা মাঠে নামল, ধারাভাষ্যকারদের পক্ষে খেলোয়াড় চেনাই দায় হয়ে পড়েছিল।
কিন্তু এ রঙিন গল্পের শেষটা ছিল ভীষণ ধূসর। এরপর রোমানিয়া আর কোনো ম্যাচ জেতেনি। দ্বিতীয় রাউন্ডে ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে বিদায় নেয় তারা। ভীষণ ধার্মিক ও কুসংস্কারচ্ছন্ন কোচ ইয়োর্দানেস্কু পরে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘এই পাগলামি করে আমরা আসলে ঈশ্বরকে রাগিয়ে দিয়েছিলাম।’
স্তাদ দ্য ফ্রাঁসের সেই রাত ছিল শুধুই জিনেদিন জিদানের। পুরো টুর্নামেন্টে দারুণ খেললেও ফাইনালের আগপর্যন্ত জিদানের নামের পাশে কোনো গোল ছিল না। গ্রুপ পর্বে লাল কার্ড দেখে দুই ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফেরা ‘জিজু’ যেন তাঁর সবটুকু জমানো বারুদ জমিয়ে রেখেছিলেন ফাইনালের ওই মঞ্চের জন্যই। মজার ব্যাপার হলো, যে জিদানকে বিশ্ব চিনত তাঁর পায়ের জাদুকরি ড্রিবলিং আর স্কিলের জন্য, সেই জিদানই ফাইনালে ব্রাজিলের স্বপ্ন গুঁড়িয়ে দিলেন তাঁর দুটি দুর্দান্ত হেডে! ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ইমানুয়েল পেতিত আরও একটি গোল করলে ৩-০ ব্যবধানের এক ঐতিহাসিক জয় পায় ফ্রান্স।
প্যারিসের শজেলিজেতে যখন ফরাসিরা শ্যাম্পেনের ছিপি ওড়াচ্ছে, তখন ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যমগুলো এক বিস্ফোরক খবর দিল। ফাইনালের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে নাকি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন ‘দ্য ফেনোমেনন’রোনালদো।
তারপর জানা গেল, ফাইনালের আগের রাতে আচমকাই রোনালদোর শরীরে তীব্র খিঁচুনি শুরু হয়। প্যারিসের এক ক্লিনিকে তড়িঘড়ি করে তাঁর বেশ কটি ডাক্তারি পরীক্ষাও করা হয়েছিল। কোচ মারিও জাগালো আর দলীয় চিকিৎসক লিডিও টলেডো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষায় ছিলেন। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে দুপুরের দিকে ফিফাকে দেওয়া অফিশিয়াল টিম শিটে রোনালদোর জায়গায় স্ট্রাইকার হিসেবে এদমুনদোর নাম লিখে দেওয়া হয়েছিল! কিন্তু একদম শেষ মুহূর্তে জাগালো সিদ্ধান্ত বদলান। কোচের দাবি ছিল, রোনালদো নিজেই তাঁর কাছে এসে খেলার আকুতি জানিয়েছিলেন।
তবে ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম এ গল্প গিলতে রাজি ছিল না। তাদের বিশ্বাস ছিল, ব্রাজিলের ফুটবল কনফেডারেশনের তৎকালীন সভাপতি রিকার্দো তেইসেইরার চাপে জাগালো এ কাজ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এমনকি ফাইনালের ঠিক আগে সেন্ট-দেনি স্টেডিয়ামের ড্রেসিংরুমে জাগালো আর তেইসেইরার মধ্যে তুমুল চিৎকার-চেঁচামেচি হয়েছিল, এমন খবরও চাউর হয়। এর পেছনে দলটির অফিশিয়াল কিট স্পনসর নাইকির বাণিজ্যিক চাপ ছিল বলেও গুঞ্জন ওঠে।
অবশ্য নাইকির পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়, ‘দল কেমন হবে, সে বিষয়ে নাইকি কখনোই কোনো মতামত বা প্রভাব খাটায় না’।
পরে নিজের সেই অসুস্থতা নিয়ে রোনালদো বলেছিলেন, ‘স্টেডিয়ামে যখন আসি, আমি ঠিকঠাকই ছিলাম এবং খেলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার আসলে কী হয়েছিল, আমি নিজেই জানি না। রবার্তো কার্লোস অনেক বেশি মানসিক চাপের কথা বলেছিল। হয়তো সেটাই, আবার অন্য কিছুও হতে পারে। কিছু সাংবাদিক লিখেছিল, আমি নাকি ভয়ে এমন করেছি। এগুলো আমার নামে লেখা অসংখ্য মিথ্যের একটা।’
আসলে ব্রাজিলের ক্রীড়া ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রহস্যের জন্ম হয়েছিল ওই রাতে!