
জিয়ানি ইনফান্তিনোর কি এখন নিজেকে ফুটবলার বলে মনে হচ্ছে? যিনি মাঠে খেলছেন আর চারদিক থেকে প্রতিপক্ষ ঘিরে ধরেছে! ফিফা সভাপতি উপায় খুঁজছেন ফাঁক গলে বেরিয়ে যাওয়ার।
আসলে এখন তাঁর পরিস্থিতি অনেকটা সে রকমই। একদিকে বিতর্কিত বাণিজ্যিক উদ্যোগ, অন্যদিকে ইউরোপীয় ফুটবলের ক্ষোভ। এর মধ্যে পদত্যাগের দাবিও উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে অবশ্য কিছুটা স্বস্তির খবর পেলেন ইনফান্তিনো। আফ্রিকার পর এবার দক্ষিণ আমেরিকাও তাঁর নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
তবে বিতর্কিত প্রস্তাবটি বাতিল করার পরও তাঁর সংকট কাটেনি। বরং ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা এবং নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশন ইনফান্তিনোর ওপর আস্থা হারানোর কথা জানিয়েছে সরাসরি। তাঁর পদত্যাগের দাবিও উঠেছে জোরালভাবে।
এসবের মধ্যেই গতকাল শুক্রবার ইনফান্তিনো গিয়েছিলেন কলম্বিয়া সফরে। দেশটির কট্টর ডানপন্থী নতুন প্রেসিডেন্ট অ্যাবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েল্লার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিলেন ফিফা সভাপতি। কলম্বিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর কালিতে সেই অনুষ্ঠানে এএফপির এক সাংবাদিক ইনফান্তিনোকে প্রশ্ন করেন, ফিফার চলমান সংকট কেটে গেছে কি না। ৫৬ বছর বয়সী ইতালিয়ান-সুইস আইনজীবী অবশ্য এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে শহরটির একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্সে শিশুদের ফুটবল উৎসবে যোগ দিয়ে বেশ আনন্দিতই দেখা গেছে ইনফান্তিনোকে। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘আজ এখানে আসতে পেরে আমি আনন্দিত। ফুটবল মানেই আনন্দ, ফুটবল মানেই সুখ ও ঐক্য। কলম্বিয়ার এই অঞ্চলেই অনেক চ্যাম্পিয়নের জন্ম হয়েছে।’
২০১৬ সাল থেকে ফিফার সভাপতির দায়িত্বে থাকা ইনফান্তিনো আগামী মার্চে মরক্কোর রাবাতে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে চতুর্থ ও শেষ মেয়াদের জন্য লড়বেন। এই মুহূর্তে তিনিই একমাত্র প্রার্থী। কিন্তু উয়েফা কঠোর অবস্থান নেওয়ায় তাঁর আবার ফিফা সভাপতি হওয়া একটু কঠিন হয়ে গেছে।
নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি লিসে ক্লাভনেস তো সরাসরি বলেই দিয়েছেন, ‘আমরা ফিফা সভাপতিকে এখনই পদত্যাগ করতে বলব।’
আইনজীবী থেকে ফুটবল প্রশাসক হওয়া ৪৫ বছর বয়সী ক্লাভনেসকে অনেকে ইনফান্তিনোর সম্ভাব্য উত্তরসূরি ও ফিফার প্রথম নারী সভাপতি হিসেবে দেখছেন। তবে কোনো ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে ইনফান্তিনোর পদত্যাগ দাবি করছেন না বলে জানিয়েছেন ক্লাভনেস, ‘আমরা এখনো সে জায়গায় পৌঁছাইনি। বিষয়টি এখন নির্দিষ্ট ব্যক্তির নয়, ফুটবল পরিচালনার মূল নীতির।’
অবশ্য এই চাপের মুখে ইনফান্তিনোর জন্য একটু একটু করে স্বস্তির জায়গা তৈরি হচ্ছে অন্য মহাদেশগুলোয়। আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন (সিএএফ) নির্বাহী কমিটি সর্বসম্মতভাবে ফিফা সভাপতির প্রতি আস্থা রাখার কথা জানিয়েছে আবারও। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রীড়ামন্ত্রী গেটন ম্যাকেঞ্জিও ইনফান্তিনোর পাশে দাঁড়িয়ে বলেছেন, আফ্রিকার উচিত ফিফা সভাপতির ‘জনসমক্ষে মিডিয়া ট্রায়াল’ বা আক্রমণ প্রতিরোধ করা।
দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল কনফেডারেশন (কনমেবল) অবশ্য শুরুতে ফিফার একপাক্ষিক পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল। তবে পরে সুর কিছুটা নরম করেন কনমেবল সভাপতি আলেসান্দো দোমিঙ্গেস। ইনফান্তিনোর কাজের প্রশংসা করে তিনি বলেছেন, ‘ইনফান্তিনোর দুর্দান্ত কাজকে আপনি অস্বীকার করতে পারবেন না। সব বিষয়ে একমত হওয়া জরুরি নয়, আলোচনার মাধ্যমে আমাদের ফুটবলের উন্নয়নে কাজ করে যেতে হবে।’
এদিকে আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়ের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের পর গতকাল ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে ভেনেজুয়েলা, ইকুয়েডর ও সর্বশেষ বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ মেক্সিকোও।
বিতর্কিত বাণিজ্যিক রূপরেখা বাতিলের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে দেশগুলো। একই সঙ্গে ফিফা সভাপতির প্রতি আস্থার কথাও জানিয়েছে তারা।
অন্যদিকে উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনকাকাফ এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) এখনো স্পষ্ট অবস্থান নেয়নি। শুরুতে ইনফান্তিনোর একপাক্ষিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলেও সাম্প্রতিক দিনগুলোয় এ দুটি সংস্থা কিছুটা নীরব দর্শকের ভূমিকা নিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত তাদের এই মৌনতা যদি সমর্থনের লক্ষণ হয়, তাহলে আরও এক মেয়াদে ফিফা সভাপতি থেকে যাওয়ার কথা ভাবতেই পারেন ইনফান্তিনো।