মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদের গন্ধ। মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তেহরানের পাল্টা জবাবে উত্তাল পৃথিবী।
ঠিক এমনই এক সময়ে তেহরান থেকে হাজার মাইল দূরে অস্ট্রেলিয়ার গোল্ড কোস্টে ইরানের নারী ফুটবল দল নিচ্ছে অন্য এক লড়াইয়ের প্রস্তুতি। লক্ষ্য—এশিয়ান কাপ এবং এই টুর্নামেন্টে দারুণ কিছু করে ২০২৭ নারী বিশ্বকাপের টিকিট কাটা।
এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো এশিয়ান কাপে খেলছে ইরান। ২০২২ সালে বিদায় নিয়েছিল গ্রুপ পর্ব থেকেই। এবার গ্রুপ পর্বে ইরানের প্রথম ম্যাচ আজ, দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে। একদিকে রণকৌশল নিয়ে ভাবনা, অন্যদিকে স্বদেশ থেকে ভেসে আসা এক চরম অস্থিরতার খবর। ফুটবল-উৎসবের আড়ালে যে বারুদগন্ধ, তা উপেক্ষা করার সাধ্য কার!
ঠিক এই আবহে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে এলেন ইরান নারী ফুটবল দলের কোচ মারজিয়া জাফরি এবং অধিনায়ক জাহরা গানবারি। প্রত্যাশিতভাবেই ফুটবল ছাপিয়ে সেখানে বড় হয়ে উঠল রাজনীতি। প্রশ্ন ধেয়ে এল—আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর আপনাদের মানসিক অবস্থা কী, এই সংকটময় মুহূর্তে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামার আগে আপনারা ঠিক কী ভাবছেন?
প্রশ্নটা প্রথমে ফারসিতে হলো, তারপর ইংরেজিতে। মুহূর্তেই যেন সংবাদ সম্মেলনকক্ষের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি নেমে গেল। একটু দম নিয়ে কোচ মারজিয়া জাফরি ফারসিতে কিছু একটা উত্তরও দিতে যাচ্ছিলেন; কিন্তু এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) প্রতিনিধি মাঝপথে তাঁকে থামিয়ে দিলেন। অনেকটা গোললাইন থেকে বল ক্লিয়ার করার মতো করেই বললেন, ‘পরের প্রশ্নে যাই চলুন। শুধু খেলাতেই মন দিই।’
বাকিটা সময় আলোচনা চলল শুধুই ফুটবল নিয়ে। তবে তেহরানে রেখে আসা পরিবার-পরিজন এখন যে যুদ্ধ–পরিস্থিতিতে আছেন, সেই উৎকন্ঠা থেকে ইরানের এই খেলোয়াড়েরা কতটা মুক্ত, সেই প্রশ্নটা থেকেই গেল।
কোচ মারজিয়া জাফরি ও অধিনায়ক জাহরা গানবারি যখন দল নিয়ে দেশ ছাড়েন, তখনো ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ জোরালো হচ্ছিল। তবে ইরানের মেয়েদের প্রস্তুতির গল্পটা বলতে গিয়ে অধিনায়ক আর কোচ যেন কোনো এক ‘আদর্শ পৃথিবী’র ছবি আঁকলেন। কোচ জাফরির কথায়, ‘দেশের লিগে খেলে মেয়েরা প্রস্তুত হয়েছে। তারপর কয়েকটা ক্যাম্প করে আমরা অস্ট্রেলিয়ায় এসেছি। আশা করি, কাল একটা দারুণ ম্যাচ উপহার দিতে পারব।’
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৬৮ নম্বরে থাকা ইরানের গ্রুপে এবার দক্ষিণ কোরিয়া (র্যাঙ্কিং ২১) ছাড়াও আছে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়া (১৫) ও ফিলিপাইন (৪১)। অধিনায়ক গানবারিও কোচের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বললেন, ‘আমাদের প্রস্তুতি খুব ভালো। দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া বা ফিলিপাইন—সবাই শক্তিশালী ঠিকই, তবে আমরা বিশ্বকাপে যাওয়ার লক্ষ্যেই লড়ব।’
সংবাদ সম্মেলন শেষে ইরানের মেয়েরা যখন গোল্ড কোস্ট স্টেডিয়ামের মাঠটা পরখ করতে নামলেন, তখন তাঁদের চেহারায় কোনো উদ্বেগের ছাপ নেই। একে অপরের ছবি তুলছেন, হাসছেন।
কিন্তু সেই হাসির আড়ালে কি দেশের জন্য দীর্ঘশ্বাস লুকানো ছিল না? কাল যখন দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে তাঁরা নামবেন, গ্যালারির গর্জন ছাপিয়ে তাঁদের কানে কি বাজবে তেহরানে একের পর বিস্ফোরণের শব্দ।
কিংবা হয়তো ফুটবলই এখন তাঁদের একমাত্র আশ্রয়, দমবন্ধ পরিস্থিতিতে একটুখানি নিশ্বাস নেওয়ার খোলা জানালা!