মেসি–রোনালদো–নেইমার: শেষ নাচে তিন জোড়া বুট

২০১৮ বিশ্বকাপেই ‘চুন খেয়ে মুখ পুড়েছে’, আট বছর পর তাই ‘দই দেখে ভয় লাগে!’

চুন খাওয়ার গল্পটা বললেই বুঝবেন।

সেই বিশ্বকাপেও গুঞ্জন ছিল, এটাই হয়তো তাঁদের শেষ বিশ্বকাপ; অন্তত মেসি-রোনালদোর। আর নেইমারকে নিয়ে কথা বলাটা সব সময় ফিটনেসের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু হলো কী, পরের বিশ্বকাপে লোকের মুখ পুড়ল। কাতারে খেললেন তিনজনই।

রোনালদোর এখন ৪১, মেসি ৩৮ ও নেইমারের ৩৪ বছর। সংখ্যাগুলোর চাহনি বলছে, ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত কেউ টিকবেন না। নিশ্চয়ই ভাবছেন, তাহলে ‘দই’ দেখে ভয় পাওয়ার কী আছে? বটে! চার বছর আগে কাতারে বিশ্ব জয়ের পর মেসির কোনো অপূর্ণতা ছিল? তবু এবার খেলছেন কোন দুঃখে? রোনালদো-নেইমারের সেই অপূর্ণতা আছে বিধায় এবারও নাহয় আছেন, কিন্তু মেসি? মানুষের মনের এ এক অদ্ভুত ‘প্যারাডক্স’। না, একবার বিশ্বকাপ জিতলে পরেরবার খেলা যে অপরাধ, তা নয়, বরং তাঁরা থাকলেই সবার লাভ। তবু প্রশ্নটা তোলা অন্য কারণে।

এবার রোনালদো-নেইমারের মধ্যে কেউ জিতে যদি ২০২২–এর মেসির মতো ফুটবলটা ‘আরও কিছুদিন উপভোগ’ করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন? আর রোনালদো যেমন রেকর্ড-পাগল, কে জানে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বয়সী খেলোয়াড়ের রেকর্ডও তাঁর দরকার হতে পারে।

তাই ঝুঁকি থাকে। অবশ্যই ২০২৬ আসরই মেসি, রোনালদো ও নেইমারের শেষ বিশ্বকাপ—এই কথা পরে ভুল প্রমাণের ভয় আছে।

আশ্চর্যের বিষয়, এই তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে ছোটজন অর্থাৎ নেইমারকেই পরের বিশ্বকাপে না দেখার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। তাঁর স্পষ্ট ইঙ্গিতও আছে, কিন্তু বাকি দুজন? বয়স যেখানেই ঠেকুক, এসব বিষয়ে তাঁদের বিশ্বাস নেই। ইতিহাসের পাতায় কিংবা সবুজ ঘাসের ডগায়, তাঁরা চিরসবুজ।

সাক্ষী মানতে পারেন রবার্তো মার্তিনেজকে। চার বছর পরের বিশ্বকাপে রোনালদোর খেলার সম্ভাবনা নিয়ে গত মে মাসে পর্তুগাল কোচের ভাষ্য ছিল, ‘এটা নিয়ে কারও সন্দেহে ভোগা উচিত নয়।’ কয়েক দিন আগেও বিশ্বকাপ শিবির থেকে বলেছেন, ‘সে (২০৩০ বিশ্বকাপে খেলতে) লড়বে।’

এক মাসের মধ্যে মার্তিনেজের ‘সন্দেহে ভোগা উচিত নয়’ থেকে ‘লড়াই’য়ে নেমে আসা কিন্তু অন্য চোখে উল্টো কিছুর ইঙ্গিতও। নক্ষত্রেরও তো একদিন মরে যেতে হয়।

আপাতত বিশ্বকাপের আকাশ থেকে এবং সেই সময়ও আসলে এবারই। সবার মনের ইচ্ছাও অস্তগামী সূর্যের মতোই স্পষ্ট। অপেক্ষা শুধু ডোবার। এই বিশ্বকাপেই সেটা হয়ে গেলে কত লাখে, কোটিতে শৈশবও যে মরে যাবে, কে জানে!

আর্জেন্টিনা দলের হয়ে অনুশীলনে মেসি

জীবনের সেই সেরা সময়ে মাঠের ভেতরে-বাইরে একসঙ্গে বিশ্ব জয়ের অভিযাত্রা শুরু করে তাঁরা ডাঙা পাবেন, বাকিদের থাকতে হবে বিশ্বকাপের তরিতেই; প্রকৃতি শূন্যতা পছন্দ করে না তাই।

কিন্তু ইতিহাস করে, করতে হয়। স্মৃতিও ভালোবাসে। তাই অমরত্ব নিয়ে ভাবনা নেই। ভাবনাটা মানে চমৎকৃত হতে হয় তাঁদের স্থায়িত্বে, গুণে-মানে। পৃথিবী তাঁদের একসঙ্গে বিশ্বকাপে দেখছে এক যুগ ধরে, তিনটি বিশ্বকাপ। শুধু মেসি-রোনালদোর পাঁচটি বিশ্বকাপ (এবার রেকর্ড হবে)। পেশাদার ফুটবল বিবেচনায় যা আরও আগে।

এ তো শুধু শিরোপা ও সংখ্যার বাহাদুরি নয়, দুই দশক ধরে তাঁরা মানুষের রোজনামচার জীবনের সঙ্গী। চার বছর পরপর এত দিন সেই সঙ্গীর সঙ্গে যেন নতুন করে ‘প্রণয়’ হয়েছে, সাফল্যে আনন্দ, বিদায়ে কষ্ট, না পারলে অভিমান; এ তো প্রেমই! মানুষের প্যাশন ফুঁস করে নাই হয়ে যাবে, আর মানুষ ভেতরে ভেতরে কাঁদবে না, ছোটবেলা থেকে কতগুলো বিশ্বকাপে চোখের তারায় ও টিভি পর্দায় কত শত স্মৃতি, এসব ভেবে রাতের বালিশে চুপিসারে আরও বুড়িয়ে যাওয়ার পথে মনটা খারাপ করবে না, তা হয় না।

মানুষ যে ভালোবাসতে জানে, বিশ্বকাপ তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। রিও ডি জেনিরো থেকে নিউ জার্সি, ক্যানবেরা, ইয়োকোহামা, কলকাতা কিংবা বাংলাদেশের অজপাড়াগাঁয়ে আমগাছের শিখরে ওড়ে তাদের দেশের পতাকা। গায়ে গায়ে জার্সিতে তিনটি মুখ গুনে শেষ করা যায় না।

পর্তুগাল দলের অনুশীলনে রোনালদো

ঘরে ঘরে একেকজন মেসি, রোনালদো, নেইমার! এই ত্রিমাত্রিক ফ্রেমেই পৃথিবী বড় হয়েছে প্রজন্মান্তর। চার বছর পর কিংবা এবার বিশ্বকাপের পরই সেই ফ্রেমটা ভেঙে গেলে?

প্রতিদিনের সেই চর্চা, মনে মনে বলে লাথি মেরে চলা জীবনটা; না, এই মানুষগুলো না থাকলেই বরং মানুষ কখনো কখনো একা।

একটা সময় হয়তো হতো, কিন্তু এখন তিনজনকে নিয়ে কথা উঠলে বেশির ভাগ সময় শিরোপার ব্যাপারটা ওঠে সবার পর, কিংবা ওঠেই না। নেইমার ও রোনালদো বিশ্বকাপে সেমিফাইনালের ওপাশে যেতে পারেননি। শুধু মেসি ছাপিয়ে গেছেন সবকিছু। লোকে আসলে এভাবে মনে রাখে না। লোকে মনে রাখে প্রথম বিশ্বকাপ, প্রথম সেই মুহূর্ত, প্রথম প্রেম…। তার পর থেকে একসঙ্গে পথচলা। কী পেলাম, না পেলাম, সেই হিসাব মেলানোর আগেই কয়েক প্রজন্ম আবিষ্কার করছে, চুল-দাড়ি পেকেছে!

ক্রীড়াবিজ্ঞান পাখা মেলেছে তাঁদের সময়ে। মাঠে মানুষের সামর্থ্যকে দিনের পর দিন কীভাবে আরও অবিশ্বাস্য করে তোলা যায়, সেটা দেখিয়েছেন তাঁরা, আর স্পোর্টস সায়েন্স কিংবা ফিজিওলজির দায়িত্ব ছিল চোটমুক্ত রেখে তাঁদের টিকিয়ে রাখা। কিংবা চোটপ্রবণ কাউকেও; নেইমার!

এ আসলে সভ্যতার এক অপূর্ব টাইমিং। এখন সময়টা যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের। আমজনতার হৃৎস্পন্দনটা বোঝা যায় সেখানে। এই বেতার যোগাযোগ যখন শুরু হয়, তাঁরা সেই সময়ের সারথি। বলতে পারেন, দিনে দিনে তাঁদের উৎকর্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মানুষের আগ্রহ আরও বেড়েছে। মেসি-রোনালদোর শুরু ২০০৬ বিশ্বকাপে। ফেসবুক এসেছে ২০০৪ সালে, এক্স (টুইটার) ও ইনস্টাগ্রাম ২০০৬ সালে। এই তিন যোগাযোগমাধ্যম যখন থেকে বিশ্বজনতার জড়ো হওয়ার সেরা তিন প্ল্যাটফর্ম, তখন এলেন নেইমার; ২০১৪ বিশ্বকাপ।

ব্রাজিল তারকা নেইমার

বিশ্বকাপ অনেক কিংবদন্তির জন্ম দিয়েছে। কিন্তু সভ্যতার এই অপূর্ব টাইমিংয়ে তাঁদের মতো আর কোনো কিংবদন্তি হয়তো মানুষের এতটা কাছে পৌঁছাতে পারেননি। এখন বয়স তাঁদের শেষ দেখিয়ে দিলেও পরেরবারও খেলতে দেখার যে আশার উদ্‌গিরণ ঘটছে, সেটা আসলে মানুষের বুকে সুখের ব্যথা।

কারণ, অজপাড়াগাঁওয়ের মানুষটি হয়তো ক্লাব ফুটবল দেখেন না, কিন্তু বিশ্বকাপে মেসি, রোনালদো কিংবা নেইমারের জার্সি কেনেন। বিশ্বকাপ এলে ঘরে ঘরে জার্সি কেনার এই যে সংস্কৃতি, সেটা ২০০২ আসরেও গ্রামগঞ্জে ছিল না। শহরেও বেশ কম। মেসি-রোনালদোয় শুরু, নেইমার আসার পর ঘটল ত্রিমাত্রিক বিস্ফোরণ।

বিশ্বকাপ সেই আলোয় আলোকিত হতে হতে কয়েক প্রজন্ম পেরিয়ে গেল। এখন তিন জোড়া বুটের ‘লাস্ট ড্যান্স’–এর পর আলো নেভার অপেক্ষা। অর্জন আর সংখ্যা নিয়ে টানাটানির সময়টা তাই এখন নয়। চোখের সামনে নিজের শৈশব-কৈশোর-যৌবনের নায়কেরা পর্দা থেকে হারিয়ে যাবেন। জন্ম হবে নতুন কারও। কারণ, প্রকৃতি শূন্যতা মানে না। কিন্তু কারও কারও জেদ ও সামর্থ্যের জেরে ইতিহাসকে তা মানতে হয়।

আলো নেভার চার বছর পরপর তাই এমন লগ্নে, মানুষ স্মৃতি হাতড়াতে হাতড়াতে নিজেকেই বলতে পারে, ‘মা, খেলতে যাব। আমার সেই তিন জোড়া বুট কোথায়?’