বিশ্বকাপ শুরু হতে আর বেশি দেরি নেই। আগামী ১১ জুন শুরু হতে যাওয়া বৈশ্বিক এ আসর দেখার সুযোগ না–ও পেতে পারেন ভারত ও চীনের কোটি কোটি দর্শক। বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে জটিলতায় পড়েছে ভারত ও চীন। এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
ভারতে বিশ্বকাপের স্বত্ব পেতে রিলায়েন্স ও ডিজনি যৌথ উদ্যোগে ২ কোটি ডলারের প্রস্তাব দিয়েছে, যা ফিফার চাহিদার তুলনায় খুবই নগণ্য। ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এই দামে রাজি নয় বলে গতকাল সোমবার রয়টার্সকে জানিয়েছে দুটি সূত্র। সংশ্লিষ্ট আরেকটি সূত্র জানায়, জাপানি প্রতিষ্ঠান সনি এ নিয়ে আলোচনা চালালেও শেষ পর্যন্ত ভারতে বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্বের জন্য ফিফাকে কোনো প্রস্তাব না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিশ্বকাপের সম্প্রচার নিয়ে চীনের সঙ্গেও এখনো ফিফার কোনো চুক্তির ঘোষণা আসেনি। ফিফার তথ্যমতে, ২০২২ বিশ্বকাপ চলাকালে বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল ও সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে মোট যত সময় খেলা দেখা হয়েছে, তার ৪৯.৮ শতাংশই দেখেছেন চীনের দর্শক। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া বিবৃতিতে ফিফা জানিয়েছে, এ পর্যন্ত বিশ্বের ১৭৫টির বেশি অঞ্চলে বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
ফিফার বিবৃতিতে বলা হয়, ‘২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রির বিষয়ে চীন ও ভারতের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে এ পর্যায়ে এ–সংক্রান্ত তথ্য গোপন রাখা প্রয়োজন।’
ভারতের ধনকুবের মুকেশ আম্বানির মালিকানাধীন রিলায়েন্স-ডিজনির যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠান এবং সনির সঙ্গে এ বিষয়ে রয়টার্সের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও কেউ মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে বিশ্বকাপ শুরুর খুব অল্প দিন বাকি থাকতে ভারত বা চীনে সম্প্রচার চুক্তি নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়াটা বেশ অস্বাভাবিক।
২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপ শুরুর বেশ আগেভাগেই সম্প্রচার স্বত্ব নিশ্চিত করেছিল চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি। টুর্নামেন্ট শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই তারা প্রচারণামূলক অনুষ্ঠান ও পৃষ্ঠপোষকদের বিজ্ঞাপন প্রচার শুরু করে।
টিভি ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও রয়টার্স এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি সিসিটিভি।
২০২২ বিশ্বকাপে বিশ্বজুড়ে সরাসরি টেলিভিশন সম্প্রচার দেখা দর্শকদের ১৭ দশমিক ৭ শতাংশই ছিল চীনের। ভারতের ক্ষেত্রে এই হার ২ দশমিক ৯ শতাংশ। এ ছাড়া সেবার বিশ্বকাপের মোট ডিজিটাল স্ট্রিমিংয়ের ২২ দশমিক ৬ শতাংশই ছিল এই দুই দেশের দখলে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সূত্রগুলো জানিয়েছে, ২০২৬ ও ২০৩০ বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্বের জন্য ভারতের কাছে শুরুতে ১০ কোটি ডলার দাবি করেছিল ফিফা।
২০২২ বিশ্বকাপে ভারতে রিলায়েন্স প্রায় ৬ কোটি ডলারে সম্প্রচার স্বত্ব কিনেছিল। সেই চুক্তির বিষয়টি টুর্নামেন্ট শুরুর প্রায় ১৪ মাস আগে ঘোষণা করা হয়। রয়টার্সকে ফিফার একটি সূত্র বলেন, ‘এবারের আসরের জন্যও ফিফা সমপরিমাণ অর্থই চাইছে।’
রিলায়েন্স ও ডিজনি একীভূত হওয়ায় ভারতের মিডিয়া ও স্ট্রিমিং জগতে তারা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে। ফিফাকে তাদের ২ কোটি ডলারের প্রস্তাবটি মূলত ভারতের বাজারে এই গোষ্ঠীর দর-কষাকষির শক্তিশালী অবস্থানকেই তুলে ধরে। একটি সূত্র রয়টার্সকে জানান, ফিফা আগের চাওয়া ১০ কোটি ডলার থেকে সরে এসে দাবির অঙ্ক অনেক কমালেও রিলায়েন্সের দেওয়া ২ কোটি ডলারের প্রস্তাবে এখনো সায় দেয়নি।
ক্রিকেটের পেছনে কোটি কোটি ডলার খরচ করা রিলায়েন্স-ডিজনি মনে করছে, এবারের বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে হওয়ায় ভারতে দর্শকসংখ্যা কম হতে পারে। কারণ, অধিকাংশ ম্যাচই ভারতের সময় অনুযায়ী মাঝরাতের পর অনুষ্ঠিত হবে।
চীনের প্রায় ২০ কোটি ফুটবল–ভক্ত রয়েছে, যা বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি। কিন্তু বিশ্বমানের জাতীয় দল গড়তে তারা ব্যর্থ হয়েছে। এর অন্যতম কারণ দেশটির ‘টপ-ডাউন’ পদ্ধতি, যেখানে ক্লাবগুলো খেলোয়াড় বাছাইয়ের ক্ষেত্রে খুব সীমিত একটি গণ্ডির ওপর নির্ভর করে।
ভারতে ক্রিকেটের মতো ফুটবলের বাণিজ্যিক কদর নেই। এর ওপর ইরান যুদ্ধের কারণে বিজ্ঞাপনের বাজারে যে মন্দা দেখা দিয়েছে, তা আয়ের প্রত্যাশায় বড় ধাক্কা দিয়েছে। সূত্রের ভাষায়, ‘ভারতে ফুটবল এখনো নির্দিষ্ট কিছু মানুষের খেলা।’
ভারতে সনির টিভি চ্যানেল ও স্ট্রিমিং অ্যাপ রয়েছে। সূত্রের দাবি, সনিও তাদের টিভি চ্যানেল বা স্ট্রিমিং অ্যাপের জন্য ফিফার কাছ থেকে বিশ্বকাপের স্বত্ব না কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ, এই বিনিয়োগ তাদের কাছে ব্যবসায়িকভাবে লাভজনক মনে হয়নি।
বিজ্ঞাপনী সংস্থা ‘ডেন্টসু ইন্ডিয়া’র ক্রীড়া বিভাগের ম্যানেজিং পার্টনার রোহিত পোতফোড়ে বলেন, ‘সময় খুব বেশি নেই, তবে আমি একে অচল অবস্থা বলব না। পরিস্থিতিটা এখন দাবার লড়াইয়ে একদম শেষ মুহূর্তের মতো, যেখানে মাত্র কয়েক চাল বাকি আছে।’