ইংল্যান্ড জাতীয় ফুটবল দলের কোচ টমাস টুখেল
ইংল্যান্ড জাতীয় ফুটবল দলের কোচ টমাস টুখেল

বিশ্বকাপ জিতলে দলের সবাইকে ট্যাটু করাবেন ইংল্যান্ড কোচ টুখেল

৬০ বছর তো কম সময় নয়! একটা গোটা জীবন কেটে যায়। কান পাতলে এখনো থ্রি লায়ন্স শিবিরে ১৯৬৬ সালের সেই রূপকথা আর তারপরের অনন্ত হাহাকার শোনা যায়। সেই দীর্ঘতম খরা ঘোচাতে এবার এক অভিনব দাওয়াই নিয়ে এসেছেন ইংল্যান্ডের নতুন মাস্টারমাইন্ড টমাস টুখেল। ফুটবলারদের পায়ে জাদু জাগানোর জন্য সাধারণত কোচরা কৌশলের ঝাঁপি খোলেন, তাতানো বক্তৃতা দেন। কিন্তু জার্মান চাণক্য টুখেল এবার যা করলেন, তা এককথায় অবিশ্বাস্য। বিশ্বজয়ের মঞ্চে দলকে একসূত্রে গাঁথতে তিনি বেছে নিয়েছেন ‘ট্যাটু’ কৌশল!

হ্যাঁ, ঠিকই শুনছেন। আগামী মাসে শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপে যদি ইংল্যান্ড শেষ পর্যন্ত ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে পারে, তবে দলের প্রত্যেকে গায়ে জড়াবেন বিশেষ এক স্মারক ট্যাটু। এই ‘ফোর-ফোর-ট্যাটু’ পরিকল্পনা শুধু মাঠের ১১ জনের জন্য নয়। ডাগআউটের কোচিং স্টাফ, পর্দার আড়ালের সাপোর্ট স্টাফ থেকে শুরু করে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এফএ) বড় কর্তারাও আছেন এই তালিকায়। এমনকি ইংল্যান্ড দলের বিশ্বকাপ ক্যাম্পের দেখভালের দায়িত্বে থাকা কানসাস সিটির এক ফিফা কর্মকর্তাও এই ঐতিহাসিক উদ্‌যাপনে নিজের নাম লিখিয়ে ফেলেছেন!

টুখেলের এই অদ্ভুত কিন্তু রোমাঞ্চকর পরিকল্পনার খবরটি প্রথম ফাঁস করেছেন অ্যালান ডিট্রিখ। ৬৪ বছর বয়সী এই ভদ্রলোক স্পোর্টিং কানসাস সিটির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা এবং এবার ইংল্যান্ড দলের বিশ্বকাপ পরামর্শক। গত বছর ইংল্যান্ড যখন যুক্তরাষ্ট্রে প্রস্তুতিমূলক সফরে যায়, তখনই টুখেল তাঁর এই মাস্টারপ্ল্যান ভাগ করে নেন অ্যালান এবং স্পোর্টিং কানসাস সিটির প্রধান নির্বাহী জেক রিডের সঙ্গে।

সেই আড্ডার স্মৃতি রোমন্থন করে অ্যালান বলছিলেন, ‘কোচ টুখেল ভীষণ প্রতিযোগিতাপ্রবণ মানুষ, আবার মনেপ্রাণে একজন খাঁটি ভদ্রলোক। তিনি আমাদের হুট করে বলে বসলেন—দল যখন টুর্নামেন্ট জিতবে, তখন সবাই একটা ট্যাটু করাবে। এরপর আমাদের দিকে ঘুরে জিজ্ঞেস করলেন—তোমরা এখন আমাদের পার্টনার, তোমরাও কি করবে? আমি আর জেক জীবনে কোনো দিন ট্যাটু করাইনি। কিন্তু টুখেলের চোখের সেই আগুন দেখে আমরা মুহূর্তেই বলে উঠলাম—হ্যাঁ, অবশ্যই করব! বাড়ি ফিরে যখন বাচ্চাদের এই গল্প শোনালাম, ওরা তো শুনে অবাক!’

ট্যাটুটির নকশাও হবে রাজকীয়। সোনালি বিশ্বকাপ ট্রফির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হবে ইংল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী কিছু বিশেষ প্রতীক। নিজের খালি হাতটি দেখিয়ে অ্যালান হেসে বললেন, ‘আমি ঠিক এই জায়গাটায় করাব। বুড়ো বয়সে চামড়া কুঁচকে গেলেও আশা করি দেখতে মন্দ লাগবে না!’

ইংল্যান্ড ফুটবল দল

ক্লাব ফুটবলে অবশ্য এমন কাণ্ড নতুন নয়। কোনো বড় শিরোপা জিতলে বা গভীর বন্ধুত্বের স্মৃতি ধরে রাখতে ফুটবলাররা দল বেঁধে ট্যাটু করান। ২০২৩ সালের নারী বিশ্বকাপেই তো ইংল্যান্ডের দুই সতীর্থ ব্রাইট ও র‍্যাচেল ড্যালি নিজেদের হাতে ‘১/২’ চিহ্নের ট্যাটু করিয়েছিলেন। যার গভীর অর্থ ছিল—তাঁরা একে অপরকে ছাড়া অপূর্ণ। কিন্তু কোনো আন্তর্জাতিক দল পুরো স্কোয়াড জুড়ে, এমনকি কর্মকর্তাদের নিয়ে এমন গণ-ট্যাটু করানোর অঙ্গীকার করছে, ফুটবল ইতিহাসে এমন নজির মেলা ভার।

আসলে চেলসির হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ, উয়েফা সুপার কাপ আর ক্লাব বিশ্বকাপ জেতা টুখেল খুব ভালো করেই জানেন ফুটবল নামক খেলাটার মনস্তত্ত্ব। ক্লাব আর জাতীয় দলের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফারাকটা কোথায়? জাতীয় দলে ফুটবলাররা আসেন ঘরোয়া ফুটবলের চিরবৈরী সব ক্লাব থেকে। কেউ আর্সেনালের, কেউ টটেনহামের, কেউবা ম্যানচেস্টারের। ড্রেসিংরুমে সেই অদৃশ্য দেয়ালটা ভাঙাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

টুখেল তাই এমন এক পারিবারিক আবহ তৈরি করতে চান, যেখানে কিটম্যান থেকে শুরু করে হোটেলের বেলবয়—সবাই নিজেকে এই মহাযজ্ঞের সমান অংশীদার ভাববেন। ট্যাটুর এই সুইয়ের খোঁচাই যেন সবাইকে এক অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে ফেলেছে। দলের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর দাবি, টুখেলের এই টোটকা মাঠের নামার আগেই ইংল্যান্ড শিবিরের ঐক্যকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

কৌতূহলের বিষয় হলো, এবারের বিশ্বকাপে কানসাস সিটিতে ইংল্যান্ডের কোনো ম্যাচ নেই। তবু টুখেল তাঁর দলের ঘাঁটি হিসেবে বেছে নিয়েছেন এই শহরকেই। এর প্রধান কারণ, এখানকার চমৎকার ভৌগোলিক অবস্থান, অত্যাধুনিক ক্রীড়া-সুবিধা এবং আমেরিকার অন্যতম নিরাপদ শহর হিসেবে কানসাসের সুনাম।

থ্রি লায়ন্সরা অনুশীলন করবে সোয়োপ পার্কের মাঠে, যা একসময় চারবারের সুপার বলজয়ী কানসাস সিটির দুর্গ ছিল। এখানকার নিখুঁত বারমুডা ঘাসেই অভ্যস্ত হতে চান হ্যারি কেইনরা, কারণ বিশ্বকাপের মূল ম্যাচগুলোও খেলা হবে একই ধরনের ঘাসের মাঠে।