সান মারিনোকে হারানোর পর ড্রেসিংরুমে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের উদ্‌যাপন
সান মারিনোকে হারানোর পর ড্রেসিংরুমে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের উদ্‌যাপন

সান মারিনোর বিপক্ষে কেমন খেলে জিতল বাংলাদেশ

‎‎সেরাভালের সান মারিনো স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে তখন ইউরোপীয় বসন্তের হাওয়া, আর মাঠে যে ৯০ মিনিটের লড়াই চলল, তার প্রতিটি সেকেন্ড ছিল বাংলাদেশ ফুটবলের জন্য দারুণ রোমাঞ্চকর।

ইউরোপের কোনো দেশের বিপক্ষে প্রথম জয় (২–১), সঙ্গে বাংলাদেশের হয়ে কোচ টমাস ডুলির প্রথমবার ডাগআউটে দাঁড়ানো—সব মিলিয়ে সান মারিনোর বিপক্ষে গত রাতের প্রীতি ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য ছিল চেনা ছক ভেঙে এক অচেনা সাহসের গল্প লেখার মঞ্চ।

কোচ ডুলির একাদশ দেখেই বোঝা গিয়েছিল, রক্ষণভাগ সামলে সমতা খোঁজার চিরাচরিত এশিয়ান মানসিকতা নিয়ে তিনি দল মাঠে নামাননি। গোলরক্ষক মিতুল মারমাকে পোস্টের নিচে রেখে দলকে দাঁড় করিয়েছিলেন ৪-৩-৩ ফরমেশনে, যার মূল লক্ষ্যই আক্রমণ।

মাঝমাঠের খেলায় তিনি ভরসা রেখেছিলেন অভিজ্ঞ জামাল ভূঁইয়ার ওপর। জামালের উপস্থিতি দলকে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে যেমন সাহায্য করেছে, তেমনি আক্রমণভাগে থাকা রফিকুল, মোরছালিন ও ফাহিম প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে রেখেছেন ব্যতিব্যস্ত।

বাংলাদেশও স্রেফ কোনো আকস্মিক প্রতি–আক্রমণের ওপর ভিত্তি করে ম্যাচ জেতেনি; বরং বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পায়েই রেখেছে। পুরো ম্যাচে ৫৪ শতাংশ বলের দখল ধরে রাখা এবং ২৪৪টি সফল পাস খেলা সেই দক্ষতারই প্রমাণ।

ভালো খেলেছেন মোরছালিনরা

ফুটবলে একটা কথা প্রচলিত আছে—ইউরোপীয় দলগুলোর সঙ্গে এশিয়ার দলগুলো ফিজিক্যালিটি বা শারীরিক শক্তিতে পেরে ওঠে না। বিশেষ করে সেট-পিস কিংবা শূন্যে ভেসে আসা বলের লড়াইয়ে তারা সব সময়ই লম্বা গড়ন আর শারীরিক শক্তির কারণে এগিয়ে থাকে।

কিন্তু কাল সান মারিনোকে তাদের নিজেদের এ সেরা অস্ত্রেই কুপোকাত করেছে বাংলাদেশ। যেখানে নায়ক ডিফেন্ডার তপু বর্মণ। ম্যাচের ১৯ মিনিটে যখন বাংলাদেশ প্রথম লিড নেয়, সেটি ছিল সেট-পিসের এক দারুণ ফসল। ডুলির দল পুরো ম্যাচে কর্নার পেয়েছিল মাত্র দুটি, কিন্তু সেই সীমিত সুযোগেরই সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছেন তপু।

৮৬ মিনিটে ম্যাচ ১-১ গোলে সমতা, ড্রয়ের দিকে যাচ্ছিল ম্যাচ, তখনই আবার ত্রাতা বনে যান তপু, প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের মাথার ওপর দিয়ে তপুর নেওয়া নিখুঁত হেডটি খুঁজে নেয় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য। সব মিলিয়ে বলা যায়, বাতাসে ভেসে আসা বলে ইউরোপীয় ডিফেন্ডারদের দারুণভাবে পরাস্ত করেছে বাংলাদেশ।

‎অবশ্য প্রথমার্ধের ৩১ মিনিটে জিয়াকোপেত্তির গোলে সান মারিনো যখন সমতায় ফেরে, তখন বাংলাদেশ ড্রেসিংরুমে ভর করেছিল দুশ্চিন্তা। বিরতির পর কোচ ডুলির পরিকল্পনায় সেই দুশ্চিন্তা আর থাকেনি। দ্বিতীয়ার্ধে একাদশে তিনি ৬টি পরিবর্তন আনেন।

বাংলাদেশ কোচ টমাস ডুলি

ফুটবলীয় পরিভাষায় এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলেও ডুলির এই কুশলী নীতি বাংলাদেশের আক্রমণকে করেছে আরও গতিশীল। বদলি নামা খেলোয়াড়েরা মাঠে হাই প্রেসিং ফুটবলটা সচল রাখেন, যার ফলে সান মারিনোর ক্লান্ত রক্ষণভাগ ক্রমাগত ভুল করতে বাধ্য হয়।

বাংলাদেশ রক্ষণভাগও এই সময় দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিল—৩৪ বার বলের পুনর্দখল নেওয়া, ১২টি সফল ট্যাকল ও ২০টি ‘ক্লিয়ারেন্স’ প্রমাণ করে যে লিড ধরে রাখতে কতটা মরিয়া ছিলেন হামজারা।

শেষ বাঁশি বাজার পর তাই খেলোয়াড়দের উল্লাসটা শুধু একটি জয়ের ছিল না, সেটি ডুলির আধুনিক ফুটবল–দর্শনের সঙ্গে বাংলাদেশের ফুটবলারদের নিখুঁত মেলবন্ধনের এক সার্থক উদ্‌যাপনও।