
২০১৭ সাল। স্টকহোমের ফ্রেন্ডস অ্যারেনায় সেটা ছিল মে মাসের শীতের রাত। তার মধ্যেই ইউরোপা লিগ জিতে পরিবেশটা উঞ্চ করে তোলে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। ইউরোপে সেটাই তাদের সর্বশেষ সাফল্য। সেই ইউনাইটেডই তিন বছর বিরতির পর চ্যাম্পিয়নস লিগে ফিরবে আজ রাতে। ব্রুনো ফার্নান্দেজরা মাঠে নেমে প্রতিপক্ষ দলে তাকিয়ে একটু অবাক হতে পারেন। ৯ বছর আগে ইউরোপে ইউনাইটেডের সেই সর্বশেষ সাফল্যের সময় যে দুনিয়ার বুকে তাঁদের আজকের প্রতিপক্ষের অস্তিত্বই ছিল না!
ফার্নান্দেজ ভেবে আরও অবাক হতে পারেন যে তাঁদের প্রতিপক্ষ দলের স্কোয়াডের মোট দাম ইউনাইটেডে তাঁর বাৎসরিক বেতনের সমান! ১ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ড। মাঠের দল থেকে চোখ সরিয়ে ফার্নান্দেজ তাকাতে পারেন দলটির ডাগআউটে। সেখানে বসে থাকবেন দলটির কোচ ভালদাস দামব্রসকাস। নামটা খটমটে হলেও লোকটির ফুটবল–জীবন তা নয়। উত্থান–পতন ও রোমাঞ্চে ভরপুর। গেম মিটিংয়েই ফার্নান্দেজের নিশ্চয়ই তা জানা থাকবে? কিন্তু মাঠে অত ভাবার সময় কোথায়!
টুর্নামেন্টটির নাম চ্যাম্পিয়নস লিগ। ইউরোপের সেরা ক্লাব আসর। এখানে খেলতে আসা কোনো দলের জন্ম যদি গতকালও হয়, কুলীনতায় তারা যদি ইউনাইটেডের টাকনুর নিচেও থাকে—তবু সে প্রতিপক্ষ দলকে সিরিয়াসলি নিতে হবে। চ্যাম্পিয়নস লিগে অভিষেকে নতুন দলের রূপকথার জন্ম দেওয়ার নজির তো আর কম নেই। ঠিক এই স্বপ্ন নিয়েই চ্যাম্পিয়নস লিগে পা রেখেছে সাবাহ এফকে।
সে স্বপ্নের নাড়ি পোঁতা আজারবাইজানে। চেষ্টা, শ্রম এবং কিছুটা অর্থের সমন্বয়ে সে স্বপ্নের লালন চলেছে এই নয়টি বছর। এখন কি তবে স্বপ্নপূরণ? দাঁড়ান, দাঁড়ান—এত দ্রুত না ভেবে আরেকটু বুঝিয়ে বলা যাক। ওল্ড ট্রাফোর্ডে আজ সাবাহ এফকে মাঠে নামার আগেই এই টুর্নামেন্ট জয়ে তাদের ঘিরে বাজির দর ১৫০০/১। অর্থাৎ, সাবাহ চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতলে তাদের পক্ষে বাজি ধরা ব্যক্তি ১ হাজার ৫০০ গুণ অর্থ পাবেন। কিন্তু এটুকু পড়ে যদি মনে হয় ‘গাছে কাঁঠালের কুঁড়ি, গোঁফে তেল’—তাহলে অত দূর না ভেবে বাস্তবতাটা বলা যাক। জন্মের পর মাত্র ৯ বছর বয়সে সাবাহর ইউরোপের শীর্ষ লিগ খেলতে আসা মানে তারা তো আগেভাগেই চ্যাম্পিয়ন!
‘পেঁচার দলে’র ‘চ্যাম্পিয়ন’ হওয়ার গল্পটা বলা যাক। ওহ, বলাই হয়নি আজারবাইজানের দলটিকে লোকে ভালোবেসে ডাকে ‘দ্য আউলস’—পেঁচার দল। কিন্তু সাবাহর উঠে আসার গল্পটা মোটেও আমাবস্যার রাতে পেঁচার মতো কিম্ভূতকিমাকার নয়; বরং এই গল্প প্রেরণা হতে পারে সেই সব মানুষের, যাঁরা বিন্দু থেকে সিন্ধু গড়ার স্বপ্ন দেখেন।
২০১৭ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে জন্ম সাবাহর। ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা আজারবাইজানি উদ্যোক্তা ইয়াকুব হুসেইনভ, যিনি আবাসন, আতিথেয়তা ও বিনিয়োগ খাতের শীর্ষস্থানীয় কনগ্লোমারেট ব্রিজেস গ্রুপ অব কোম্পানিজের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান। তিনি তাঁর এই ব্রিজেস গ্রুপ অব কোম্পানিজের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্লাবটি গঠন করেন এবং এর প্রশাসনিক পর্ষদে অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন ইগর পনোপারেভসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ করপোরেট ব্যক্তিত্বকে যুক্ত করেন।
আজারবাইজানের প্রথম বিভাগে (দ্বিতীয় স্তর) পঞ্চম হয়ে প্রথম মৌসুম শেষ করে সাবাহ। মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে প্রিমিয়ার লিগে উঠতে এই ফল যথেষ্ট ছিল না। কিন্তু ভাগ্যদেবী হেসেছিলেন অন্যভাবে।
আজারবাইজান ফুটবল ফেডারেশনের (এএফএফএ) নিয়ম অনুযায়ী, প্রিমিয়ার লিগে উন্নীত হতে আর্থিক, প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত লাইসেন্সিং শর্ত পূরণ করা বাধ্যতামূলক। তৎকালীন লিগ টেবিলের শীর্ষ চার দল—খাজার বাকু, কারাদাগ লোকবাতান, শুভালান ও এমওআইকে বাকু এসব শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে প্রশাসনিক ও আর্থিক যাচাই-বাছাইয়ে সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়ে লাইসেন্স নিশ্চিত করে সাবাহ। ফলে প্রথম বিভাগে খেলা সত্ত্বেও ভাগ্যের জোরে সরাসরি আজারবাইজানের শীর্ষ লিগে খেলার সুযোগ পেয়ে যায় ক্লাবটি।
পরের তিন বছরে দলটির ধীরে ধীরে উন্নতি হতে থাকে। সপ্তম, ষষ্ঠ ও পঞ্চম হয়ে শেষ করে মৌসুম। এর মধ্যে বাণিজ্যিক দরজাও খুলতে শুরু করে সাবাহর। ‘ব্যাংক রিপাবলিকা’র সঙ্গে স্পনসরশিপ চুক্তি সই করে ক্লাবটি। বড় ধরনের বিনিয়োগের পথ খুলে যায়। চুক্তির অংশ হিসেবে ক্লাবের হোম ভেন্যু ‘আলিনজা অ্যারেনা’র নাম বদলে রাখা হয় ‘ব্যাংক রিপাবলিকা অ্যারেনা’। সেখানকার ধারণক্ষমতা কত জানেন? ওল্ড ট্রাফোর্ড দূরে থাক, সম্ভবত মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের গ্যালারির এক পাশের আসনসংখ্যারও কম—৮,৯৬৯।
২০২২-২৩ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে দ্বিতীয় হয় সাবাহ। আজারবাইজান থেকে চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলা প্রথম ক্লাব কারাবাগের চেয়ে মাত্র ৯ পয়েন্ট পিছিয়ে ছিল। সে সাফল্যে প্রথমবারের মতো ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় খেলার যোগ্যতা অর্জন করে সাবাহ।
সেটা উয়েফা কনফারেন্স লিগে। বিদায় নেয় তৃতীয় রাউন্ড থেকে। পরের মৌসুমেও প্রিমিয়ার লিগে তৃতীয় হয়ে কনফারেন্স লিগে উঠে আবারও বাদ পড়ে তৃতীয় রাউন্ড থেকে। কিন্তু সে মৌসুমে আজারবাইজান কাপ জিতে ইউরোপা লিগে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে সাবাহ। এরপর গত গ্রীষ্মে ক্লাবটিতে অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন ঘটে। কোচের দায়িত্ব ছাড়েন ভাসিলি বেরেজুতস্কি। দায়িত্ব পান লিথুয়ানিয়ান ভালদাস দামব্রসকাস।
দামব্রসকাস কখনো পেশাদার হিসেবে ফুটবল খেলেননি। লিথুয়ানিয়ান ফুটবলে তৃতীয় বিভাগে খেলেছেন। লুদোগোরেৎসকে বুলগেরিয়ান লিগ এবং স্প্লিতকে ক্রোয়েশিয়ান কাপ জেতালেও একটি টিভি অনুষ্ঠানে পারফর্ম করে দামব্রসকাস বেশি পরিচিতি পেয়েছিলেন।
সেটা সাবাহর মতোই আরেক বিপ্লবের গল্প।
দামব্রসকাস ২৩ বছর বয়সে বুট তুলে রাখেন। ২০০২ সালে ‘কে হতে চায় কোটিপতি’র টিভি শোর লিথুয়ানিয়ান সংস্করণ ‘শেসি নুলিয়াই - মিলিয়োনাসে’ অংশ নেন দামব্রসকাস। মূল পুরস্কার জিততে পারেননি। তবে প্রায় ২ হাজার ৫০০ পাউন্ড জেতেন। সেই অর্থ দিয়ে দামব্রসকাস ও তাঁর তৎকালীন হবু স্ত্রী লন্ডনের ট্রেনের টিকিট কাটেন এবং প্রথম মাসের থাকার বন্দোবস্ত করেন। কারণ? কোচ হওয়ার প্রবল বাসনা।
লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনার পাশাপাশি উয়েফা কোচিং ব্যাজ অর্জন করেন দামব্রসকাস। পড়ার খরচ ও জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হকারি (পত্রিকা ফেরি), বাচ্চাকাচ্চা দেখাশোনা ও রঙের কাজ করেছেন। মজার ব্যাপার হলো, ২০০৪ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড সকার স্কুলের কোচিং পদে সাক্ষাৎকারের জন্য ওল্ড ট্রাফোর্ডে এসেছিলেন দামব্রসকাস। পাঁচ বছরের সেই চাকরি তাঁর জানাশোনা ও বড় কিছুর দ্বার খুলে দেয়। শুধু কি তাই, দামব্রসকাসের অধীনে ২০২৫–২৬ মৌসুমে আজারবাইজান প্রিমিয়ার লিগ ও কাপ জেতে সাবাহ। এরপর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। দামব্রসকাসের হাত ধরে প্লে-অফ পর্বে ইসরায়েলি ক্লাব হ্যাপোয়েলকে দুই লেগ মিলিয়ে ৬-৪ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়নস লিগের লিগ পর্বে জায়গা করে নেয় সাবাহ।
হ্যাপোয়েলের মাঠে প্রথম লেগে সাবাহকে হোটেলে অভ্যর্থনা জানাতে উপস্থিত ছিলেন ক্লাবটির একজন সমর্থক। ঘরের মাঠে ফিরতি লেগের চিত্রটা ছিল ভিন্ন। ঐতিহাসিক সেই অর্জনে উল্লাস করেছিল পুরো বাকু শহরই। জন্মের মাত্র ৯ বছরের মাথায় এক মৌসুমে লিগ, কাপ জেতার সঙ্গে চ্যাম্পিয়নস লিগে জায়গা করে নেওয়া তো আর চাট্টিখানি কথা নয়!
দামব্রসকাস তাই আজ রাতে যখন ওল্ড ট্রাফোর্ডের ডাগআউটে বসবেন, তখন আসলে তাঁর ২২ বছর আগের সেই চক্র পূরণ হবে। সেটাও কার বিপক্ষে? মাইকেল ক্যারিকের ৭৫ কোটি ইউরো মূল্যের বিপক্ষে সাবাহর খেলোয়াড়েরা যখন মাঠে দাঁড়াবেন, চ্যাম্পিয়নস লিগের সংগীত বেজে উঠবে, তখন অনুচ্চারে কেউ কেউ একটি প্রশ্নও হয়তো তুলবেন। কিসের শক্তি বেশি? অর্থের নাকি তথ্য বিশ্লেষণের?
অঢেল অর্থ দিয়ে খেলোয়াড় কেনার সামর্থ্য নেই সাবাহর। তাদের স্কোয়াডের মূল্য মাত্র ১ কোটি ৭৫ লাখ ৫০ হাজার ইউরো। প্রতিপক্ষ এবং নিজেদের ডেটা অ্যানালাইসিস (তথ্য বিশ্লেষণ) সাবাহর শক্তির জায়গা। আর এই দর্শনে চলার অনুপ্রেরণা তারা পেয়েছে হলিউডের বিখ্যাত ‘মানিবল’ সিনেমা থেকে।
সাবাহর সভাপতি মাকসুদ আদিগোজালভের ভাষায়, ‘আর্থিকভাবে ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী ক্লাবগুলোর সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার সাধ্য আমাদের ছিল না। তাই আমাদের নিজস্ব শক্তি খুঁজে বের করতে হয়েছে। আমরা “মানিবল” থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছি, যা দেখিয়ে দিয়েছে—বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ডেটা বিশ্লেষণ ও খেলোয়াড় নির্বাচন করতে পারলে ক্লাবের আর্থিক সামর্থ্যের চেয়েও অনেক বড় সাফল্য অর্জন সম্ভব।’
সেই সাফল্য এখন চোখের সামনে। এবারের চ্যাম্পিয়নস লিগে সাবাহ মাঠের খেলায় যা–ই করুক না কেন, দলটি তো এরই মধ্যে চ্যাম্পিয়ন! আজারবাইজানের বিন্দু থেকে ইউরোপের সিন্ধুতে নামতে যাওয়া দলটিকে দেখতে টিভিতে চোখ রাখুন আজ বাংলাদেশ সময় রাত ১টায়। কে জানে, তাদের দেখে আপনিও বিন্দু থেকে সিন্ধু গড়ার প্রেরণা পেতে পারেন!