ভ্যাঙ্কুবারের গতকাল শেষ হওয়া ফিফা কংগ্রেসে বক্তব্য রাখছেন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।
ভ্যাঙ্কুবারের গতকাল শেষ হওয়া ফিফা কংগ্রেসে বক্তব্য রাখছেন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।

ইনফান্তিনোর ‘আমেরিকান ড্রিম’: ২০৩৮ বিশ্বকাপও কি যুক্তরাষ্ট্রেই হবে

ওয়ার্ল্ড সকার সাময়িকী থেকে প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য বাংলায় ভাষান্তর

টাকার পেছনে ছোটো। যাঁর মুখ থেকে কথাটা প্রথম বের হয়েছিল, তিনি যেন জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ফিফার জন্যই পথ দেখিয়ে গেছেন।

এই বছর ৪৮ দলের বিশ্বকাপ, তিন দেশের আয়োজন—বিশাল কলেবর দেখে এখনই যাঁদের নানা শঙ্কা কাজ করছে, তাঁরা হয়তো এখনো জানেন না, সামনে আরও বড় ধাক্কা অপেক্ষা করছে। বিশ্বকাপ যত দ্রুত সম্ভব আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরতে পারে। মানে, ২০৩৮ সালে।

শুনতে খটকা লাগতে পারে, কিন্তু ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোর দাবার চালগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, সব সমীকরণই গিয়ে মিলছে স্ট্যাচু অব লিবার্টির দেশে।

ইনফান্তিনোকে নিয়ে সমালোচনার শেষ নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি তাঁর অতিরিক্ত অনুরাগ নিয়ে বিশ্বজুড়ে সমালোচনা আছে। তবে একজন ফিফা বসের জন্য আয়োজক দেশের সরকারপ্রধানকে তুষ্ট রাখাটা পুরোনো রেওয়াজ। কিন্তু ইনফান্তিনোর লক্ষ্য আরও গভীরে। ২০২৬ থেকে ২০৩৮—মাঝের এই ১২ বছরে তিনি ফিফাকে এমন এক আর্থিক পাহাড়ের চূড়ায় বসাতে চান, যেখানে ট্রাম্পরা আসবেন-যাবেন, কিন্তু তাঁর সিংহাসন থাকবে অটল।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, সঙ্গে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো

২০১৬ সালে সেপ ব্ল্যাটারের চার বছরের মেয়াদ শেষ করতে নির্বাচিত হয়েছিলেন ইনফান্তিনো। তাই ২০১৯ সালের নির্বাচন ছিল তাঁর প্রথম পূর্ণ মেয়াদ। ফিফার এখনকার নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ তিন মেয়াদ সভাপতি হিসেবে থাকা যায়। সামনে কোনো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় ২০২৩ সালে ইনফান্তিনো আবার জিতেছেন, ২০২৭ সালেও জেতার পথ মসৃণ। আর ঠিক সেই বছরই ২০৩৮ বিশ্বকাপের আয়োজক নির্বাচন হবে।

ফিফার বিশ্বকাপ আয়োজক নির্ধারণ পদ্ধতি একসময় ব্ল্যাটার বানিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২০১০ দেওয়ার জন্য। আর ইনফান্তিনো সেই প্রথাকেই বানিয়েছেন নিজের প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার। দেখুন কীভাবে ছকটা সাজানো হয়েছে—২০২৬ কনকাকাফে (যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো), বিশ্বকাপের শতবর্ষে ২০৩০ সালে ইউরোপ-আফ্রিকা-দক্ষিণ আমেরিকার ছয় দেশে (ইউরোপে স্পেন-পর্তুগাল, আফ্রিকায় মরক্কো, দক্ষিণ আমেরিকায় আর্জেন্টিনা-প্যারাগুয়ে-উরুগুয়ে), ২০৩৪ সালে এশিয়ার সৌদি আরবে, আর তারপর ২০৩৮-এ আবার উত্তর আমেরিকায়। হয়তো ওশেনিয়াকে সান্ত্বনা দিতে নিউজিল্যান্ডে একটা উদ্বোধনী ম্যাচ হতেও পারে।

ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো

মাথায় রাখুন আরও একটা তথ্য। ইনফান্তিনো ফিফার আইন বিভাগ সরিয়ে নিয়ে গেছেন ফ্লোরিডার কোরাল গেবলসে। ফিফা+ ডিজিটাল স্ট্রিমিং ও ই-স্পোর্টসের কাজও সেখান থেকেই চলে। জুরিখ এখনো সদর দপ্তর হিসেবে আছে বটে, কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্র সরে যাচ্ছে পশ্চিমে। মনে হতে পারে, ফ্লোরিডার সমুদ্রসৈকত আর রোদের হাতছানি কি তবে ফুটবলকে চিরতরে জুরিখের ঠান্ডা থেকে সরিয়ে নিচ্ছে?

কারণটা কেবল আবহাওয়া নয়, কারণটা ওয়াল স্ট্রিট। জুরিখ যা দিতে পারে না, সিলিকন ভ্যালি আর মার্কিন মিডিয়া মোগলরা তা অনায়াসেই দেয়। বিপুল বিনিয়োগ ও মিডিয়া বাজার মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটা বাণিজ্যিক পরিবেশ দিতে পারে, যার ধারেকাছেও নেই জুরিখ। স্টেডিয়ামের অভাব নেই, আতিথেয়তার ক্ষুধাও অসীম।

কাতার ২০২২ বিশ্বকাপে ফিফা আয় করেছিল ৭৫০ কোটি ডলার।

২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে ফিফা আনুমানিক ১ হাজার ১০০ কোটি ডলার আয় করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কাতার ২০২২ বিশ্বকাপে এসেছিল ৭৫০ কোটি ডলার। ইনফান্তিনো ডেভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সঙ্গে যৌথ গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করেছেন, ২০২৬ বিশ্বকাপ বিশ্বজুড়ে ৮ হাজার ১০ কোটি ডলারের মোট উৎপাদন তৈরি করতে পারে, যোগ করতে পারে ৪ হাজার ৯০ কোটি ডলারের জিডিপি এবং সৃষ্টি করতে পারে ৮ লাখ ২৪ হাজার কর্মসংস্থান।

কেকের আকার বাড়াও—এটাই ইনফান্তিনোর মন্ত্র। আর সেই কেক বাড়ানোর জায়গা একটাই—আমেরিকা।

জোয়াও আভেলাঞ্জে ফিফার রাজনৈতিক ও আর্থিক বিস্তার ঘটিয়েছিলেন, ব্ল্যাটার মানচিত্র বড় করেছিলেন। ইনফান্তিনো চাইছেন নিজের উত্তরাধিকার। তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকতে চান এমন একজন সভাপতি হিসেবে, যিনি ফিফাকে আর্থিকভাবে অস্পৃশ্য করে দিয়েছেন। একটা অলাভজনক সংস্থাকে পরিণত করেছেন বৈশ্বিক বাণিজ্যিক দানবে। তাঁর কাছে যুক্তরাষ্ট্র কেবল দক্ষ আয়োজক নয়, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার এই যুগে একটা নিরাপত্তাবলয়ও।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো

এতে সমস্যা কী? অনেক কিছু। বিশ্বকাপের এই বিশাল ফোলা–ফাঁপা রূপের কারণে আয়োজনের সুযোগ এখন ফিফার বেশির ভাগ সদস্যের নাগালের বাইরে। তাদের ভাগ্যে জুটছে বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট আর আঞ্চলিক ক্লাব প্রতিযোগিতার টুকরা। তবে এটা নতুন কিছু নয়। বছরের পর বছর ধরে সদস্য সংস্থাগুলো মাথা নত করেছে, বিনিময়ে পেয়েছে বিশ্বকাপের আয় থেকে চুইয়ে আসা বার্ষিক অনুদান।

একমাত্র যে সংগঠন নিজের পথে হাঁটতে পারে, সে হলো উয়েফা। ধারণা করা হয়, বিশ্ব ফুটবলের মোট সম্পদের ৯০ শতাংশ ইউরোপে। চ্যাম্পিয়নস লিগ আগামী চার বছরে দুই হাজার কোটি ডলারের বেশি আয় করবে বলে পূর্বাভাস, যা বিশ্বকাপের অনেক বেশি।

২০৩৮-এ আবার আমেরিকায় বিশ্বকাপ আয়োজন করতে চান ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।

কিন্তু যখন ২০২৬-এর আয় ভাগ হবে, ইংল্যান্ড এফএ থেকে জার্মানির ডিএফবি—সবার অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি ডলার ঢুকবে, তখন তাদের সব সংশয় কর্পূরের মতো উড়ে যাবে। ইনফান্তিনো যদি প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন ২০৩৮-এ আমেরিকান বিশ্বকাপ ২০২৬-এর আয় দ্বিগুণ করবে, তাহলে দূরত্ব আর টাইম জোনের বিষয়ে কিছু বিড়বিড়ানো ছাড়া ইউরোপীয় বিরোধিতা বলতে আর কিছু থাকবে না। সেটাও মিলিয়ে যাবে অদৃশ্য ক্যাশ রেজিস্ট্রারের শব্দে।

ইনফান্তিনো জানেন, তাঁর পুরোনো ইউরোপীয় নিয়োগকর্তারা হয়তো তাঁকে পছন্দ করেন না, তাঁর ক্ষমতার চালকে অবিশ্বাস করেন। কিন্তু তাঁর দেওয়া ডলারকে ঠিকই ভালোবাসেন। তাই ১২ বছরের মধ্যে দুইবার আটলান্টিক পেরোনোর মূল্য হিসেবে তাঁর দেওয়া দামটা সবাই সানন্দে মেনে নেবেন।

শেষমেশ সব পথ আসলে এক জায়গায় গিয়েই মেলে।

টাকার কাছে।