বেলিংহাম, এমবাপ্পে, মুসিয়ালা ও ইয়ামাল
বেলিংহাম, এমবাপ্পে, মুসিয়ালা ও ইয়ামাল

বিশ্বকাপের ভিনদেশি ‘আফ্রিকান’দের গল্প

বিশ্ব ফুটবলের বড় মঞ্চে এবারও চোখে পড়ছে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের উজ্জ্বল উপস্থিতি। ২০২৬ বিশ্বকাপে কেউ খেলছেন নিজ দেশের হয়ে, কেউ প্রতিনিধিত্ব করছেন ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার দলকে। গতি, শক্তি, কৌশল আর সৃজনশীলতায় তাঁরা হয়ে উঠেছেন দলের ভরসা।

আফ্রিকার ফুটবলের ইতিহাসে কয়েকটি নাম যেন আলাদা দীপ্তিতে জ্বলজ্বল করে। ১৯৯০ বিশ্বকাপে ৩৮ বছর বয়সে ক্যামেরুনকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলে দিয়ে আফ্রিকার ফুটবল–স্বপ্নকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেন রজার মিলা। কর্নার ফ্ল্যাগের পাশে তাঁর সেই উদ্‌যাপন হয়ে আছে বিশ্বকাপের স্মরণীয় প্রতীক।

আফ্রিকার একমাত্র ব্যালন ডি’অরজয়ী জর্জ উইয়াহ গতি, শক্তি ও ড্রিবলিংয়ে ইউরোপীয় ফুটবলে নিজের স্বাক্ষর রাখেন। পরে তিনি লাইবেরিয়ার রাষ্ট্রপতিও হন।
চারবারের আফ্রিকান বর্ষসেরা ফুটবলার স্যামুয়েল ইতো বড় ম্যাচের নির্ভরতার প্রতীক। ক্লাব ফুটবলে ধারাবাহিক সাফল্যের কারণে তিনি আফ্রিকার অন্যতম সেরা স্ট্রাইকারদের কাতারে জায়গা করে নেন।

শক্তিমত্তা, দাপট ও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গোল করার ক্ষমতায় দিদিয়ের দ্রগবা হয়ে ওঠেন আইভরি কোস্টের জাতীয় আইকন। এঁরা শুধু গোল বা জয়ই এনে দেননি, আফ্রিকান ফুটবলের মর্যাদা বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁদের ইচ্ছাশক্তি পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছে।

শিকড় আফ্রিকায়, আলো বিশ্বমঞ্চে

চোখ রাখা যাক ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপে। কিলিয়ান এমবাপ্পে বর্তমান বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম উজ্জ্বল তারকা এবং ফ্রান্স জাতীয় দলের অধিনায়ক। ক্যামেরুনীয় বাবা ও আলজেরিয়ান মায়ের সন্তান এমবাপ্পে অসাধারণ গতি, ঠান্ডা মাথার ফিনিশিং এবং বড় ম্যাচের নেতৃত্ব ফুটবল বিশ্বকে মুগ্ধ করে চলেছে।

কেবল এমবাপ্পে নন, আফ্রিকার রক্ত যাঁদের শিরায় বইছে, সেই আউরেলিয়েন চুয়ামেনি, ইব্রাহিমা কোনাতে, উসমান দেম্বেলে, দায়োত উপামেকানো ও উইলিয়াম সালিবা—এই পাঁচ তারকা রয়েছেন এবারের বিশ্বকাপের ফ্রান্স দলে। চুয়ামেনি থাকছেন মিডফিল্ডের দুর্গ হয়ে। রক্ষণভাগ সামলাবেন কোনাতে, উপামেকানো ও সালিবা। আর বিদ্যুৎ–গতি ও সৃজনশীলতা দিয়ে আক্রমণভাগকে প্রাণ দেবেন দেম্বেলে।

ফ্রান্সের বড় তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে

জামাল মুসিয়ালা জার্মানির তারকা প্লেমেকার এবং বায়ার্ন মিউনিখের অন্যতম সেরা প্রতিভা, যাঁর শরীরে নাইজেরিয়ান রক্ত। এই তরুণ মিডফিল্ডার তাঁর অনবদ্য ড্রিবলিং, বল নিয়ন্ত্রণ এবং পুরো মাঠে খেলার সামর্থ্যের জন্য পরিচিত। আফ্রিকান শিকড়ের সঙ্গে জার্মান শৃঙ্খলা মিলিয়ে তিনি তৈরি করেছেন এক অনন্য ধরন।

জার্মানির স্কোয়াডে আরও রয়েছেন সিয়েরা লিওনীয় শিকড়ের অ্যান্টোনিও রুডিগার, আইভরি কোস্টীয় ঐতিহ্যের জোনাথন তাহ, সেনেগালীয় শিকড়ের লেরয় সানে এবং সেনেগালীয়-ফিনিশ মিশ্র ঐতিহ্যের মালিক থিয়াও। এঁরা যেন জার্মানির দলে বৈচিত্র্য ও বৈশ্বিক সংযোগের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছেন।

লামিনে ইয়ামাল স্প্যানিশ ফুটবলের সাম্প্রতিক বিস্ময় এবং বার্সেলোনার উদীয়মান সুপারস্টার। নিরক্ষীয় গিনির মা ও মরক্কোর বাবার সন্তান এই তরুণ উইঙ্গার তাঁর অসাধারণ ড্রিবলিং, দুঃসাহসিকতা এবং পরিপক্বতায় অল্প বয়সেই ইউরোপের সেরা প্রতিভাদের একজন হয়ে উঠেছেন। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট তাঁর বিশ্বকাপ স্বপ্নকে হুমকিতে ফেলে দিয়েছিল। তবে প্রথম কয়েকটা ম্যাচে হয়তো তিনি নামবেন বদলি হিসেবে, এমনই ইঙ্গিত দিয়েছেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে।

২৬ সদস্যের বেলজিয়াম দলের ৮ জনই আফ্রিকার বংশোদ্ভূত। এর মধ্যে আমাদু ওনানা প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম শক্তিশালী মিডফিল্ডার। সেনেগাল ও ক্যামেরুনীয় বংশোদ্ভূত এই খেলোয়াড় তাঁর অসাধারণ শারীরিক শক্তি, বল কাড়ার দক্ষতা এবং মাঠে আধিপত্য বিস্তারের জন্য পরিচিত। তিনি আধুনিক ফুটবলের আদর্শ বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডারের উদাহরণ। আফ্রিকার রক্তের ধারা নিয়ে বেলজিয়াম দলে আরও আছেন রোমেলু লুকাকুসহ ৬ ফুটবলার।

ইংল্যান্ড দলে জুড বেলিংহাম, বুকায়ো সাকাসহ ১২ জনের শরীরে বইছে আফ্রিকার রক্ত। এই বিশ্বকাপে কানাডা দলে যে বড় তারকা আছেন, তাঁর জন্ম ঘানার শরণার্থীশিবিরে। সেই আলফন্সো ডেভিস এই মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম দ্রুততম লেফটব্যাক এবং বায়ার্ন মিউনিখের তারকা।

নিজ দেশের জার্সিতে ভরসা

মাতৃভূমির হয়ে খেলছেন—এমন আফ্রিকার তারকাদের মধ্যে শুরুতেই আসবে মোহাম্মদ সালাহর নাম। লিভারপুলে দীর্ঘ ৯ মৌসুম কাটিয়ে ক্লাবটির ইতিহাসের সর্বকালের সেরাদের কাতারে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সালাহ। ২০১৯ সালের উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ জয় থেকে শুরু করে দুটি প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা এবং চারবার লিগের গোল্ডেন বুট আছে তাঁর অর্জনের খাতায়।

বিশ্বকাপে মিসর জাতীয় দলে আক্রমণভাগের মূল দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেবেন ৩৩ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। বিশ্বকাপ মঞ্চে মিসরীয় সমর্থকদের সব আশা তাঁর কাছেই।

মিসরের আক্রমণভাগের আস্থার নাম সালাহ

এরপরই আছেন সেনেগালের বড় তারকা সাদিও মানে। একসময় ইউরোপীয় ফুটবলে দাপট দেখিয়েছেন, পরে যোগ দেন সৌদি ক্লাব আল নাসরে। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে তিনি পাঁচটি গোল করে ‘তেরঙ্গা লায়ন্স’কে টানা চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপে পৌঁছাতে বড় ভূমিকা রাখেন।

দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে কত দূর যেতে পারবে, তা অনিশ্চিত। তবে এই দলে আছেন একজন লাইল ফস্টার। বার্নলি ক্লাবের এই ফরোয়ার্ড জায়গা কাজে লাগিয়ে সুযোগ তৈরি করা ও ঠান্ডা মাথায় গোল করার দক্ষতায়ও পারদর্শী। ২৫ বছর বয়সী এই ফুটবলার বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকার আক্রমণভাগের প্রধান ভরসা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

মরক্কোর সঙ্গে স্পেনের রয়েছে ঐতিহাসিক সম্পর্ক। স্পেনে জন্ম ব্রাহিম দিয়াজ মরক্কোর হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেন একটু দেরিতে। তিনি দ্রুতই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন মরক্কো জাতীয় দলের আক্রমণভাগের নির্ভরযোগ্য এক অস্ত্র হিসেবে। আক্রমণে তাঁর বহুমুখী দক্ষতা এবং বল নিয়ন্ত্রণের গুণাবলির কারণে তিনি অল্প সময়েই ‘আটলাস লায়ন্স’-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছেন।

আইভরি কোস্টের আমাদ দিয়ালো নিখুঁত বাঁ পা আর ডান প্রান্ত থেকে ক্ষিপ্রগতির দৌড়ের জন্য পরিচিত। ২৩ বছর বয়সী এই উইঙ্গারের বড় বৈশিষ্ট্য হলো গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা। ২০২৫ সালে আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে তাঁর তিন গোল সেই দক্ষতারই প্রমাণ। আইভরি কোস্ট জাতীয় দলের আক্রমণভাগে তিনিই গুরুত্বপূর্ণ ভরসা। গোল ও গোলে সহায়তার পাশাপাশি ডিফেন্সে তাঁর পরিশ্রম আলাদা করেই চোখে পড়ে।

মাঝমাঠে বল ধরে রাখার অসাধারণ ক্ষমতা তিউনিসিয়ার হ্যানিবল মেজব্রির। চাপের মধ্যেও নিয়ন্ত্রণ না হারানোর দক্ষতার জন্য আলাদা করে নজর কেড়েছেন। ২৩ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার মূলত প্লেমেকার হিসেবে খেলেন এবং নিখুঁত পাসে ফরোয়ার্ডদের গোলের সুযোগ তৈরি করে দেন।

আফ্রিকার ছোট দেশ কেপ ভার্দের বড় তারকা ২৩ বছর বয়সী সিডনি লোপেস ক্যাব্রালের বড় শক্তি হলো দুই পায়ে সমান দক্ষতা, যা তাঁকে মাঠের দুই প্রান্তেই সমান কার্যকর করে তোলে। তিনি ফুলব্যাক, উইঙ্গার কিংবা তিন ডিফেন্ডারের ফরমেশনে উইংব্যাক—সব ভূমিকাতেই স্বচ্ছন্দে খেলতে পারেন। পর্তুগিজ ক্লাব এস্ত্রেলা আমাদোরার হয়ে মৌসুমের প্রথমার্ধে পাঁচ গোল ও তিন অ্যাসিস্ট করে দারুণ পারফরম্যান্স দেখানোর পর জানুয়ারিতে তাঁকে দলে ভেড়ায় পর্তুগালের শীর্ষ ক্লাব বেনফিকা।

আফ্রিকার রক্তের ধারা নিয়ে বেলজিয়াম দলেআছেন রোমেলু লুকাকু

আলজেরিয়ার জাতীয় দলে একজন ‘জুনিয়র করিম বেনজেমা’ আছেন, নাম তাঁর আমিন গুইরি। ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান খুব বড় বিষয় নয় তাঁর কাছে। ফিফাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, তাঁর আদর্শ করিম বেনজেমা, যিনি গোলের সংখ্যার পেছনে না ছুটে আক্রমণ গড়ায় বেশি গুরুত্ব দেন। আমিন গুইরিও সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে নিজের খেলার অংশ করে নিয়েছেন। মাত্র আড়াই বছরে জাতীয় দলে ২১ ম্যাচে ১২টি গোল ও অ্যাসিস্টে সরাসরি অবদান আক্রমণভাগে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকে স্পষ্ট করেছে।

ঘানা জাতীয় ফুটবল দল বিশ্বমঞ্চে অন্তত গ্রুপ পর্ব পেরোনোর লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। সেই পরিকল্পনায় অ্যান্টোইন সেমেনিওকে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবেই দেখা হচ্ছে। একাধিক পজিশনে খেলতে পারায় দলে তিনি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন।

আফ্রিকা-বন্দনার শেষটা হোক সেড্রিক বাকাম্বুকে দিয়ে। বয়স হয়েছে ৩৫। গোল করার জন্য তাঁর বেশি জায়গার প্রয়োজন হয় না। রিয়াল বেটিসের এই ফরোয়ার্ড জানেন, ঠিক কোথায় দাঁড়াতে হবে। কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের হয়ে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে করেছেন চার গোল এবং সহায়তা করেছেন তিনটিতে। কঙ্গোকে বিশ্বমঞ্চে স্মরণীয় কিছু উপহার দেওয়ার স্বপ্নই দেখছেন ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া বাকাম্বু।

আফ্রিকার মাটি থেকে উঠে আসা কিংবা আফ্রিকান শিকড় নিয়ে অন্য ভূখণ্ডে বড় হওয়া এই ফুটবলারদের গল্প প্রায় একই রকম। প্রতিভার কোনো সীমান্ত নেই। জার্সি আলাদা, ভাষা আলাদা, পতাকা আলাদা; কিন্তু বিশ্বকাপের আলোয় তাঁদের দেখলে মনে পড়ে, খেলার শিকড় ছড়িয়ে থাকে বহু ভূখণ্ডে, তবে ভাষা একটাই—ফুটবল।