বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের দায়িত্ব নিতে একসময় বড় প্রোফাইলের কোচরা খুব একটা আগ্রহ দেখাতেন না। তবে গত এক বছরে বদলে গেছে দৃশ্যপট। জাতীয় দলের কোচ চেয়ে বাফুফের এক বিজ্ঞপ্তিতে নামীদামি কোচদের আবেদনের হিড়িক পড়েছে। গত ৯ এপ্রিল বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর কাল বিকেল পর্যন্ত মাত্র সাত দিনেই জমা পড়েছে ১২৮টি আবেদন।
৩০ এপ্রিল পর্যন্ত আবেদন করা যাবে বলে এই সংখ্যা যে আরও বাড়বে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, হঠাৎ করে বাংলাদেশের কোচ হতে আগ্রহ বেড়ে গেল কেন বিদেশি কোচদের! হামজা চৌধুরী-শমিত সোমদের সৌজন্যেই কি বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন তাঁরা?
বাফুফের টেকনিক্যাল কমিটির চেয়ারম্যান কামরুল হাসান সে রকমই মনে করছেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশ দলের ক্রমবর্ধমান ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’ এবং হামজা–শমিতদের মতো খেলোয়াড়দের অন্তর্ভুক্তির কারণেই কোচদের এই আগ্রহ, ‘আমাদের ফুটবল আগের অবস্থায় নেই। হামজা–শমিতরা আসার পর ব্র্যান্ড ভ্যালু অনেক বেড়েছে। সবাই যে এখন বাংলাদেশের ফুটবল ফলো করেন, কোচদের এই আগ্রহ তারই প্রমাণ। আপনার হাতে যখন হামজার মতো ফুটবলার থাকবে তখন মাঠে অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সহজ হয়ে যাবে।’
হাভিয়ের কাবরেরার সঙ্গে বাফুফের চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ৩০ এপ্রিল। তার আগে গত ৯ এপ্রিল বাফুফে তাদের ফেসবুক পেজে নতুন কোচ চেয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। অতীতে কোচ নিয়োগে বেশির ভাগ সময় বাফুফে দুটি পদ্ধতি অনুসরণ করত। তারা নিজেরাই সংশ্লিষ্ট কোচের সঙ্গে সরাসরি অথবা তাদের এজেন্টের মাধ্যমে যোগাযোগ করত। এবার বিজ্ঞপ্তি দিয়ে কোচ চেয়ে ব্যপক সাড়া পাচ্ছে বাফুফে।
বাংলাদেশের কোচ হতে আগ্রহীদের মধ্যে আছেন অনেক হাই প্রোফাইল কোচও। যাঁদের মধ্যে আছেন ‘ক্রোয়েশিয়ান আইনস্টাইন’খ্যাত পিটার সেগ্রেট। তাঁর অধীনে ২০১৮ সালে মালদ্বীপ সাফ শিরোপা জিতেছিল। তাজিকিস্তান, আফগানিস্তান, জর্জিয়ার জাতীয় দলের ডাগআউট সামলানোর অভিজ্ঞতাও আছে তাঁর।
বসুন্ধরা কিংসের সাবেক কোচ থাকা ভ্যালেরি তিতাও আবেদন করেছেন। ছোট–বড় মিলিয়ে এই রোমানিয়ান ২০টির বেশি ক্লাবের দায়িত্বে ছিলেন। বর্তমানে ওমানের ক্লাব আল সিবের কোচ তিনি। ভারতের সাবেক কোচ ইগর স্টিমাচও জীবনবৃত্তান্ত পাঠিয়েছেন বাফুফেতে। তাঁর সময়ে দুটি সাফ জিতেছে ভারত। স্টিমাচ কোচ ছিলেন ক্রোয়েশিয়া জাতীয় দলেরও।
আবেদনকারীদের মধ্যে আরও আছেন গাম্বিয়া, লাইবেরিয়া, কেনিয়া ও মিয়ানমার জাতীয় দলে কাজ করা জার্মানির অ্যান্টেইন হেই। লেবানন জাতীয় দলে কাজ করা মন্টেনেগ্রোর মিওদ্রাগ রাদলোভিচের মতো অভিজ্ঞ কোচও আছেন তালিকায়।
বাফুফে জীবনবৃত্তান্ত পেয়েছে ফরাসি ক্লাব নিস ও পিএসজির নারী দলের সাবেক কোচ দিদিয়ের ওলের কাছ থেকেও। আবেদনকারীদের তালিকায় আছেন দুই স্থানীয় কোচ মারুফুল হক এবং জুলফিকার মাহমুদ মিন্টু। মারুফুল বর্তমানে আবাহনীর কোচ।
বর্তমান কোচ কাবরেরাকে মাসে ১৩ হাজার ডলার বেতন দেয় বাফুফে। এবার সেটা বেড়ে প্রাথমিকভাবে সাড়ে ১৩ হাজার ডলার (প্রায় ১৬ লাখ টাকা) হতে পারে বলে জানিয়েছে বাফুফের একটি সূত্র। দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বিবেচনায় অঙ্কটা আরও এক হাজার ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। কোচের যোগ্যতার ক্ষেত্রে এএফসি বা উয়েফা প্রো লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে সাফল্যের পাশাপাশি থাকতে হবে স্পোর্টস সায়েন্স ও ডেটা অ্যানালিসিসে আধুনিক জ্ঞান।
আবেদনের সময়সীমা পার হলে বাফুফের টেকনিক্যাল কমিটি যাচাই–বাছাই করে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করবে। সে তালিকা হতে পারে ১০ থেকে ১২ জনের। স্থানীয় আবেদনকারীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে সশরীর, বিদেশিদের সাক্ষাৎকার হবে অনলাইনে। কোচ নির্বাচনপ্রক্রিয়া শেষে বেতন ও চুক্তি নিয়ে কথা বলবে জাতীয় দল কমিটি।
আগামী ৫ জুন সান মারিনোর বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ দল। বাফুফে চায় সেই ম্যাচের আগে এমন কাউকে নতুন কোচ হিসেবে নিয়োগ দিতে, যিনি হামজা–শমিতদের মতো আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলারদের নিয়ে বাংলাদেশের ফুটবলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবেন।