টিটি ফেডারেশন আয়োজিত অনুষ্ঠানে জোবেরা রহমান লিনুকে ‘প্রাইড অব বাংলাদেশ টেবিল টেনিস’ সম্মাননায় ভূষিত করা হয়
টিটি ফেডারেশন আয়োজিত অনুষ্ঠানে জোবেরা রহমান লিনুকে ‘প্রাইড অব বাংলাদেশ টেবিল টেনিস’ সম্মাননায় ভূষিত করা হয়

‘পদকগুলো আমার সন্তান, সেগুলো আঁকড়ে ধরে আছি’, সংবর্ধনায় আপ্লুত লিনু

‘জীবনে অনেক পদক জিতেছি। পদকগুলো আমার সন্তান, সেগুলো আঁকড়ে ধরে আছি।’

টেবিল টেনিসের টানে ব্যক্তিগত জীবনকে এক পাশে সরিয়ে রাখা কিংবদন্তি জোবেরা রহমান লিনুর কণ্ঠে যখন এই কথাগুলো শোনা যায়, তখন সেখানে যেমন গর্ব থাকে, তেমনি দীর্ঘ ক্যারিয়ারের একাকিত্বের সুরও বাজে। ১৬ বার জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে শিরোপাজয়ী এবং গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লেখানো এই কিংবদন্তি আজ সন্ধ্যায় বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের ডাচ্-বাংলা ব্যাংক অডিটোরিয়ামে ছিলেন অনুষ্ঠানের মধ্যমণি।

আন্তর্জাতিক টেবিল টেনিস ফেডারেশএর (আইটিটিএফ) শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এই বিশেষ অনুষ্ঠানে টেবিল টেনিসের ঐতিহ্যকে সম্মান জানানো এবং খেলাটির প্রসারে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করাই ছিল মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশ টেবিল টেনিস ফেডারেশন আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুব-উল-আলম। সাম্প্রতিক স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত জোবেরা রহমান লিনুকে এই আয়োজনে ‘প্রাইড অব বাংলাদেশ টেবিল টেনিস’ সম্মাননায় ভূষিত করা হয়।

৬২ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে নিজের ফেলে আসা দিনগুলোর কথা স্মরণ করেন লিনু। তিনি বলেন, ‘৯ বছর বয়সে খেলা শুরু করি। তখন টিটির অবকাঠামো বলতে তেমন কিছুই ছিল না। আমার বড় বোন মুনিরা মোর্শেদ হেলেন প্রথম জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হন। বাবা বলেছিলেন শৃঙ্খলবদ্ধ হতে হবে, আমি সেটা মেনে চলেছি। তবে আমি খুব ডানপিটে ছিলাম। আমার জন্ম কাপ্তাইয়ে, কিন্তু বেড়ে উঠেছি সিলেটের শাহজীবাজারে।’

১৯৭৩ সালে বাবার সঙ্গে বোনকে খেলতে যেতে দেখতেন লিনু। কৌতূহল থেকেই খেলায় আসা। ১৯৭৭ সালে মাত্র ১২ বছর ৩ মাস বয়সে তিনি প্রথম জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হন, এরপর খেলেছেন টানা ৩৭ বছর। লিনু বলেন, ‘টিটির টানে বিয়ে পর্যন্ত করিনি। জীবনে অনেক পদক জিতেছি। সেগুলোই আমার সন্তান।’

অনুষ্ঠানে উপস্থিত তরুণ টেবিল টেনিস খেলোয়াড়দের উদ্দেশে লিনুর বার্তা, ‘আজ তোমরা সৌভাগ্যবান। কোচ, বিদেশ সফর, সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছ। তবে যতই বলি আমরা টিটিতে এগিয়েছি, আসলে আগাইনি। এশিয়ান পর্যায়ে এখনো আমাদের কোনো পদক নেই।’ অনুষ্ঠানে উপস্থিত বাংলাদেশ টিটি দলের জাপানি কোচের উদ্দেশে ইংরেজিতে বক্তব্য রেখে তাঁর সফলতা কামনা করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে সম্প্রতি ভারতের সিমলায় অনুষ্ঠিত সাউথ এশিয়ান ইয়ুথ টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপে পদকজয়ীদের পুরস্কৃত করা হয়। লিনুর হাত থেকে পুরস্কার নেন উদীয়মান তারকারা। অনূর্ধ্ব-১৯ দল দলগত ইভেন্টে সোনা জয়সহ দ্বৈতে রুপা ও অন্যান্য বিভাগে মোট আটটি পদক জেতে। সোনাজয়ীরা পেয়েছেন ২০ হাজার টাকা করে। রুপাজয়ীরা ১৫ হাজার টাকা, ব্রোঞ্জজয়ী ৫ হাজার টাকা। অনূর্ধ্ব-১৯ দলের অধিনায়ক নাফিজ ইকবালকে এক লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হয়। ১১ জন খেলোয়াড় সর্বমোট ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা পুরস্কার পেয়েছেন।

তবে সাফল্যের এই মঞ্চেও আক্ষেপের সুর ছিল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ক্যাপ্টেন এ এম মাকসুদ আহমেদের কণ্ঠে। তিনি জানান, সাউথ এশিয়ান ইয়ুথ টিটিতে সাফল্য পাওয়া নাফিজ ইকবাল, আবুল হাসেম হাসিব, জয় ইসলাম ও তাহমিদুর রহমান সাকিব এখনো জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা ও ‘জাতীয় ক্রীড়া কার্ড’ থেকে বঞ্চিত। তিনি দ্রুত এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।

খেলোয়াড় তৈরির কারখানা হিসেবে স্কুল টুর্নামেন্টের কোনো বিকল্প নেই। একসময় বাটা স্কুলসহ নানা টুর্নামেন্ট নিয়মিত হতো। সর্বশেষ ২০১৭ সালে হয়েছে। দীর্ঘ বিরতির পর আবারও ফেডারেশন স্কুল টুর্নামেন্ট আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে শুরুর চিত্রটা খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। ৩০০ জনের নিবন্ধনের লক্ষ্য থাকলেও ১৪ এপ্রিল সময়সীমা শেষে মাত্র ১৪-১৫টি স্কুলের ৬৭ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছে।

ঢাকায় সানিডেল, আগা খান, সেন্ট যোসেফ, সেন্ট গ্রেগরী, ধানমন্ডি টিউটোরিয়াল, স্কলাস্টিকা, লালবাগ মডেল স্কুল, শাহীন স্কুল, বারিধারা স্কলারস ইনস্টিটিউশন, শহীদ আনোয়ারা স্কুলসহ কয়েকটি স্কুলে টিটি চর্চা হয়। ঢাকার বাইরে নড়াইল, রংপুর, গাইবান্ধা, রাজশাহী, ঠাকুরগাঁও, যশোর, জয়পুরহাট, লালমনিরহাট, রাঙামাটি, বরিশাল, সাতক্ষীরা, খুলনা, পঞ্চগড় ও কুষ্টিয়ায় খেলাটির চর্চা রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় রংপুর।

টেবিল টেনিসের প্রসারে খেলাটিকে ‘নতুন কুঁড়ি’ স্পোর্টস কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য যুব ও ক্রীড়াসচিবের কাছে জোর দাবি জানান ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক। লিনুর অনুপ্রেরণা আর নতুন প্রজন্মের চেষ্টায় টেবিল টেনিস দেশে আরও ছড়াবে, এমনটাই আশা ফেডারেশনের।