রাঙামাটির দুর্গম পাহাড় থেকে উঠে আসা বিকেএসপির দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী খই খই মারমা এখন দেশের টেবিল টেনিসের রানি। পরশু ঢাকায় শেষ হওয়া ৪০তম জাতীয় টিটি চ্যাম্পিয়নশিপে আটটি ইভেন্টে অংশ নিয়ে আটটিতেই পদক জিতেছেন। গড়েছেন ছয়টি সোনা, একটি করে রুপা ও ব্রোঞ্জ জয়ের বিরল কীর্তি। একই প্রতিযোগিতায় জুনিয়র-সিনিয়র এককে সোনা জিতে ইতিহাস গড়া এই তরুণী নানা সংকট জয় করে পৌঁছেছেন সাফল্যের শিখরে। তাঁর বিস্ময়কর উত্থান ও আগামীর স্বপ্ন নিয়ে কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে।
একই জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে জুনিয়র ও সিনিয়র দুই বিভাগেই এককে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বিরল উদাহরণ গড়ার অনুভূতি কেমন?
খই খই মারমা: অসাধারণ অনুভূতি। ২০২৩ সালে সর্বশেষ জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে জুনিয়রে চ্যাম্পিয়ন ছিলাম। কিন্তু সিনিয়রের কোয়ার্টার ফাইনালে সাদিয়া রহমান মৌ আপুর কাছে হেরে যাই। তিনিই গতবার চ্যাম্পিয়ন হন। এবার তাঁকে হারিয়ে প্রথম চ্যাম্পিয়ন হলাম। সেটাও ৩-০ সেটে। এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
গতবার পারেননি, এবার সিনিয়রে চ্যাম্পিয়ন হবেন ভাবতে পেরেছিলেন?
খই খই: দলগত বিভাগের ফাইনালে মৌ আপুর কাছে হেরে যাওয়ায় জেদ বাড়ে। আর সেটাই আমাকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়।
রামহিম লিয়ান বম গত জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে জুনিয়র ও সিনিয়র এককে চ্যাম্পিয়ন হয়ে রেকর্ড গড়েন। একই কৃতিত্ব এবার আপনার। আপনারা দুজনই বান্দরবানের অবৈতনিক কোয়ান্টাম স্কুল থেকে উঠে আসা। এই যাত্রাটা কেমন ছিল?
খই খই: সহজ ছিল না। কোয়ান্টামে ২০১৫ সালে মাত্র আট বছর বয়সে আমাকে ভর্তি করে পরিবার। সেখানে পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলাও হয়। সেই সুবাদে কোয়ান্টামে আমার টিটির হাতেখড়ি। কিন্তু রাঙামাটির বাড়ি থেকে বান্দরবানে কোয়ান্টামে থাকার সময়গুলো জীবনে কখনো ভুলব না। মনটা যেন পড়ে থাকত বাড়িতে।
আপনি একজন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। আপনার আগে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে শীর্ষে পৌঁছান রামহিম। কখনো ভেবেছিলেন রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলার চুশাক পাড়া গ্রামের মেয়ে দেশের শীর্ষ টিটি খেলোয়াড় হবে?
খই খই: ভাবিনি। কারণ, খেলাধুলা নিয়ে তেমন চিন্তা করা হয়নি আগে। পড়ালেখা নিয়েই ভাবতে হয়েছে। তবে কোয়ান্টাম থেকে মাঝেমধ্যে ঢাকায় এলে সোমা আপু, মৌ আপুদের দেখতাম। তাঁদের মতো চ্যাম্পিয়ন হতে চাইতাম। ভাবতে পারিনি একদিন তাঁদের সঙ্গে লড়ে সেরা হয়ে যাব। এ ক্ষেত্রে খন্দকার হাসান মুনীর সুমন স্যারের অনেক অবদান, তিনি আমাদের চারজনের দায়িত্ব নেন। দীর্ঘ মেয়াদে অনুশীলন করান।
গত নভেম্বরে রিয়াদের ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে মিশ্র দ্বৈতে জাভেদ আহমেদের সঙ্গে রুপা জেতেন আপনি, যা দেশের টিটিতে দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে প্রথম পদক। সেই সাফল্য আপনাকে কতটা এগিয়ে দিয়েছে?
খই খই: অনেক এগিয়ে দিয়েছে। ওই সাফল্যটা স্বপ্নের মতো। দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে বাংলাদেশের টেবিল টেনিসে প্রথম পদক জেতাটা অভাবনীয়।
আপনার উঠে আসার পেছনে পরিবারের আর্থিক সংগ্রামের কথা জানি। সেই দিনগুলো কেমন ছিল?
খই খই: সংগ্রামের, লড়াইয়ের। আমরা দুই বোন। আমার আপুকে পড়াশোনা করাত বাবা-মা। কিন্তু দুজনকে একসঙ্গে পড়ালেখা করানো কঠিন ছিল তাঁদের জন্য। বাবা-মা কৃষক। কলার চাষ করেন, কচুর সময় কচুসহ নানা ফলের চাষ করেন। ফলে আমাকে পড়ালেখা করানো কঠিন ছিল তাঁদের জন্য। কোয়ান্টামে পড়ালেখা ফ্রি হওয়ায় আমাকে সেখানে পাঠানো হয়।
কিছুদিন আগে আপনি বলেছিলেন বাড়িতে বাবা-মাকে একটা ঘর করে দিতে চান। ঘরটা কি হয়েছে?
খই খই: হয়নি, অনেক টাকার ব্যাপার তো। আমরা থাকি পাহাড়ি ঘরে। ঘরটা সমতলে হলেও উঁচু করে বাঁশ আর কাঠ দিয়ে তৈরি। দেখি, সামনে যদি একটা ঘর করা যায়। স্বপ্ন দেখি, একটা ঘর হবে।
এই ১৮ বছরের জীবনটাকে এক লাইনে বর্ণনা করলে কী বলবেন?
খই খই: সবকিছু স্বপ্নের মতো মনে হয়। ইসলামিক সলিডারিটিতে দেশের হয়ে পদক জিতেছি, এখন সিনিয়রে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হলাম। সবকিছু মিলিয়ে ভাবি, কোথায় ছিলাম, কোথায় আছি, বিস্ময়কর লাগে। কখনো ভাবিনি এই পর্যায়ে আসব।
পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ে আপনি শূন্য থেকে সাফল্যের শিখরে। বাবা-মাকে এখন কিছু সহায়তা করতে পারেন? সামনে আপনার লক্ষ্যই-বা কী?
খই খই: বাবা-মাকে এখন কিছু সহায়তা করতে পারি। চেষ্টা করি তাঁদের পাশে থাকতে। আমি কখনো এসএ গেমস খেলিনি, দুই বছর পর এসএ গেমস হবে। এই গেমসসহ সামনে যা খেলা আসবে, সব কটিতেই ভালো করতে চাই। জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের মুকুট ধরে রাখতে চাই।