
স্বপ্ন ছিল পাইলট হওয়ার, কিন্তু ইসমাইল হোসেন মাহিনের নিয়তি লেখা ছিল সবুজ গালিচায়। বাবা-মায়ের দেখা সেই স্বপ্নের আকাশ এখন ইসমাইল জয় করছেন গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে। সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের শিরোপা ধরে রাখার পথে এই তরুণ গোলরক্ষক দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছেন। পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র ১ গোল হজম করা আর ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে টাইব্রেকারে প্রথম শটই সেভ—ইসমাইলকে রাতারাতি বসিয়ে দিয়েছে নায়কের আসনে। ঢাকা মোহামেডানের রিজার্ভ বেঞ্চ থেকে সাফের শিরোপা মঞ্চ, ইসমাইলের এই অবিশ্বাস্য উত্থান আর আগামীর লক্ষ্য নিয়ে মালে থেকে কাল সকালে মুঠোফোনে কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে।
ফাইনালের টাইব্রেকারে ভারতের প্রথম শটটি ঠেকালেন। পুরো টুর্নামেন্টে ৪ ম্যাচে মাত্র ১ গোল হজম। এতটা ভালো করবেন বিশ্বাস ছিল?
ইসমাইল হোসেন: আত্মবিশ্বাস ছিল যে পারব। টাইব্রেকারের শুরু থেকেই মনকে এটাই বলেছি, দলকে জেতাতে হবে। যেভাবেই হোক শট রুখতে হবে। আমি ডান দিকে ঝাঁপিয়েছি এবং নিচু হয়ে আসা বলটা পেয়ে গেছি নাগালে। ভারতের প্রথম শটটা ফেরানোয় উজ্জীবিত হয়েছে দল। এটা আমার জন্যও বিশেষ মুহূর্ত। ফাইনালে কোনো চাপ নিইনি, স্বাভাবিক খেলেছি। আল্লাহ আর বাবা-মায়ের দোয়ায় জিতেছি।
এই সাফল্যের রহস্য কী?
ইসমাইল: আলহামদুলিল্লাহ, আমরা দল হিসেবে খুব ভালো খেলেছি। আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল টিম বন্ডিং। অনেক দিন একসঙ্গে ক্যাম্প করেছি, একসঙ্গে অনুশীলন করেছি। এই বোঝাপড়াই মাঠে কাজে দিয়েছে।
গোলকিপার হিসেবে নিজের শক্তির জায়গা কী মনে হয়?
ইসমাইল: সব সময় চেষ্টা করি ভুল কম করতে এবং নিজের সেরাটা দিতে। আমার উচ্চতা ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি। উচ্চতা একটা বাড়তি পাওনা। আর গোলকিপার হিসেবে আমার ভিত্তিটা গড়ে দিয়েছে বিকেএসপি, এখন বিকেএসপিতে উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছি। ২০১৯ সালে ট্রায়াল দিয়ে এখানে ভর্তি হই। বিকেএসপিই আমাকে গড়ে তুলেছে।
মালদ্বীপে মাঠের বাইরের সময়টা কেমন কেটেছে?
ইসমাইল: সময়টা অসাধারণ ছিল। তবে আমরা ঘুরতে যাইনি, পুরো মনোযোগ ছিল খেলায়। শৃঙ্খলা মেনে চলেছি, খাবারদাবার নিয়ন্ত্রণে রেখেছি। আমাদের একটাই লক্ষ্য ছিল—ট্রফি নিয়ে দেশে ফেরা। আর সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পেরে আমরা সবাই গর্বিত।
দলে দুই সুলিভান ভাইকে কেমন লাগল?
ইসমাইল: তারা ভালো খেলোয়াড় বলেই দলে এসেছে। দলের জন্য অবদান রেখেছে।
আপনার ফুটবলে উঠে আসার গল্পটা কেমন?
ইসমাইল: বিকেএসপিতেই আমার ফুটবলের শুরু। পরে বাফুফের এলিট একাডেমিতে সুযোগ পাই। সেখান থেকেই মূলত পেশাদার ফুটবল শুরু। এলিট একাডেমি থেকে দুটি বিসিএল খেলেছি। গত মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে ছিলাম এবং আমাদের দল মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। সেবার আমি একটা ম্যাচ বদলি হিসেবে খেলার সুযোগ পেয়েছিলাম চট্টগ্রাম আবাহনীর বিপক্ষে। তবে এবার এখনো মোহামেডানের হয়ে খেলার সুযোগ পাইনি।
গোলকিপার হলেন কীভাবে?
ইসমাইল: শুরুতে ফরোয়ার্ডে খেলতাম। কিন্তু একবার আন্তস্কুল ম্যাচে স্যার জোর করে গোলকিপার বানিয়ে দেন। তারপর থেকেই এই পজিশনে খেলছি।
বাড়ি ও পরিবার সম্পর্কে বলুন।
ইসমাইল: কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় আমার বাড়ি। আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। বাবা কাতারে থাকেন। আমরা দুই ভাই—আমি বড়। ছোট ভাই পড়াশোনা করে। পরিবারে খেলাধুলার সঙ্গে আর কেউ যুক্ত নয়।
ছোটবেলার স্বপ্ন?
ইসমাইল: পড়াশোনায় ভালোই ছিলাম। বাবা-মা চাইতেন পাইলট হই। তবে বাবা শুরুতে খেলাধুলা পছন্দ করতেন না। তিনি চাইতেন আমি পড়াশোনা নিয়েই থাকি। পরে এলাকার দুই সিনিয়র ভাইয়ের অনুরোধে অনুমতি দেন। এখন যখন আব্বু দেখেন যে আমি ভালো করছি, তখন তিনি আমাকে অনেক সমর্থন দেন।
ফুটবল থেকে প্রথম আয়?
ইসমাইল: স্কুলের হয়ে খেলতে গিয়ে স্কুল থেকে যাতায়াত ভাড়া হিসেবে পাওয়া ৫০ টাকাই আমার প্রথম আয়।
ফুটবলের বাইরে কী ভালো লাগে?
ইসমাইল: ব্যাডমিন্টন খেলতে ভালো লাগে। আর অবসরে ভ্রমণ। বিশেষ করে পাহাড় খুব পছন্দ।
কুষ্টিয়া থেকে অনুপ্রেরণা?
ইসমাইল: জাতীয় দলে আমার এলাকার কেউ না খেললেও বয়সভিত্তিক দল ও প্রিমিয়ার লিগে খেলেছেন কয়েকজন। রাব্বি আহমেদ ভাই অনূর্ধ্ব-১৬ জাতীয় দলের অধিনায়ক ছিলেন। তিনি আমাকে অনেক অনুপ্রাণিত করেছেন, সাহস জুগিয়েছেন এবং খেলাধুলা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছেন।
আগেও ট্রফি জিতেছেন?
ইসমাইল: ২০২৪ সালে নেপালের সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপজয়ী দলেও ছিলাম। কিন্তু জ্বরে ভুগে কোনো ম্যাচ খেলতে পারিনি। এমনকি অনুশীলনও করতে পারিনি। এটা আমার জন্য কষ্টের ছিল। তখন শ্রাবণ (বসুন্ধরা কিংসের গোলকিপার মেহেদি হাসান) ভাই খেলেছিলেন পোস্টের নিচে।
সামনে লক্ষ্য কী?
ইসমাইল: আমার বয়স এখন ২০ বছর চলছে। সামনে অনেকটা সময়। চাইব নিজেকে আরও তৈরি করতে। বাংলাদেশ জাতীয় দলে সুযোগ পেতে আর লম্বা সময় টিকে থাকতে। বাংলাদেশকে বিশ্বকাপের মতো বড় জায়গায় নিয়ে যাওয়ার স্বপ্নও দেখি।