
রোজারিও শহরের উত্তরে পেরদ্রিয়েল স্ট্রিট। খুবই সাধারণ এই রাস্তাটাই ছিল আনহেল দি মারিয়ার প্রথম খেলার মাঠ! ইটের টুকরা দিয়ে বানানো হতো গোলপোস্ট। সূর্য ডুবলেই খেলা শেষ। সেই রাস্তা দিয়েই ১৭ বছর পর ঘরের ছেলের ফেরার উৎসবটা হয়েছিল দেখার মতো। ব্যাগভর্তি স্বপ্ন নিয়ে যে কিশোর বেরিয়েছিল, সে ফিরেছে বিশ্বজয়ী তারকা হয়ে। ঝুলিতে বিশ্ব ফুটবলের প্রায় সব বড় ট্রফি। কিন্তু রয়ে গেছে সেই শিকড়ের টান, সেই একই বিনয়, একই মূল্যবোধ। বাবার সেই কঠিন শর্ত আজও তাঁর কানে বাজে, ‘কয়েক মাস সময়, ফুটবলে কিছু করতে পারলে করো, না পারলে কয়লা তুলতে হবে আমার সঙ্গে।’ ‘কিছু করেই’ রোজারিওতে ফিরেছেন আনহেল দি মারিয়া। আর্জেন্টিনাকে ১৯৭৮ বিশ্বকাপ জেতানো কোচ প্রয়াত সিজার লুইস মেনোত্তি তাঁকে রেখেছিলেন ম্যারাডোনা ও মেসির কাতারে। সেই ‘এল ফিদেও’ সম্প্রতি স্প্যানিশ ক্রীড়া দৈনিক এএসকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন রোজারিওর নিজের বাড়িতে বসে। সেই সাক্ষাৎকারটির বাংলায় ভাষান্তর প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য—
রোজারিওতে ফিরে আপনার তো একটা চক্র পূরণ হলো। নস্টালজিক লাগছে?
দি মারিয়া: নস্টালজিয়া নয়, আমি আসলে আনন্দিত। আমার যে পথচলা, যে ক্যারিয়ার, সারা পৃথিবী ঘুরে দেখার সুযোগ—সবকিছুর জন্য আনন্দই অনুভব করছি।
ছয়টি ক্লাব, ১৪৫টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ, ৩৭টি ট্রফি। একের পর এক ফাইনালে গোল, শিরোপা এনে দেওয়া পারফরম্যান্স। বাস্তব কি স্বপ্নকেও ছাড়িয়ে গেছে?
দি মারিয়া: পুরোপুরি। আমি কখনোই এমন কিছু কল্পনা করিনি। আমার স্বপ্ন ছিল, রোজারিও সেন্ট্রালের মূল দলে খেলা। এরপর যা হয়েছে, সবই ত্যাগ আর সুযোগ নেওয়ার গল্প। যতবার ট্রেন এসেছে, উঠেছি। সেই ট্রেনই আমাকে নিয়ে গেছে পৃথিবীর দারুণ দারুণ জায়গায়।
ঘরে ফিরে সবচেয়ে বড় ডার্বিতে নিউয়েলসের বিপক্ষে দুর্দান্ত গোল, তারপর শিরোপা। খেলোয়াড়ের চেয়ে নিজেকে নায়ক বেশি মনে হচ্ছে?
দি মারিয়া: নিজের মানুষদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতে পারাটা সম্মানের। সব সময় সবকিছু এত সুন্দরভাবে মেলে না। তাই সমর্থকদের, আমার ওপর বিশ্বাস রাখা মানুষদের এই আনন্দ দিতে পেরে খুব খুশি। ওরা আমাকে কখনোই বাইরের মানুষ মনে করেনি। মনে হয়েছে, আমি কখনো যাইনি। বাস্তব আমার প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিটা ম্যাচ উপভোগ করা, মাঠে আনন্দ পাওয়া—এটাই আমাকে সবকিছু জিততে সাহায্য করেছে।
আপনি খুব সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসেছেন। এ জন্যই গর্বটা আরও বেশি, তাই না?
দি মারিয়া: অবশ্যই। মা–বাবার কাছ থেকেই শিখেছি ত্যাগ, হাল না ছাড়া, থেমে না যাওয়া। অনেকবার দেয়ালে ধাক্কা খেয়েছি। তবু ছাড়িনি। ছোটবেলায় যা শিখেছি, সেটাই করে গেছি।
আপনার বাবা তো কয়লা তোলার কাজ করতেন। শোনা যায়, ১৬ বছর বয়সে তিনি আপনাকে একটা চূড়ান্ত শর্ত দিয়েছিলেন। মনে পড়ে?
দি মারিয়া: হ্যাঁ। সংসার চালাতে আমার সাহায্য দরকার ছিল বাবার। মা অনুরোধ করায় বাবা শেষ একটা সুযোগ দেন। বলেন, আরেকবার চেষ্টা করো। জানুয়ারিতে রোজারিও সেন্ট্রালের যুব দলের প্রাক্–মৌসুম শুরু হলো। বছরের শেষেই আমার প্রথম বিভাগে অভিষেক হলো। সেখান থেকেই শুরু।
পেরদ্রিয়েল স্ট্রিট—যেটা আপনার শরীরেও ট্যাটু করা—আপনার কাছে এর মানে কী?
দি মারিয়া: সবকিছু। ওখানেই তো ফুটবলের আনন্দ খুঁজে পাওয়া। খালি পায়ে খেলা আর ইটের গোলপোস্ট—এটাই তো আর্জেন্টাইনদের ফুটবল–সত্তা। আমরা যা ভালোবাসি, তা নিয়েই বাঁচতে চাই। রাস্তার সেই ফুটবলই আমার আত্মা।
ছোটবেলায় নাকি গোলকিপার হতে চেয়েছিলেন?
দি মারিয়া: হ্যাঁ, ভালোই লাগত। কিন্তু আমার বাঁ পা হাতের চেয়ে শক্তিশালী ছিল। তাই গোলপোস্ট ছেড়ে সামনে চলে এলাম।
৩৭টি ট্রফির মধ্যে কোনটা সবচেয়ে আনন্দের?
দি মারিয়া: সব কটিই। আলাদা করে বেছে নিতে পারি না। বিশ্বকাপের মতো কিছু বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রতিটাই একেকটা ত্যাগের পুরস্কার। কোনোটাকেই ছোট করে দেখতে পারি না।
বিশ্বকাপ, অনূর্ধ্ব–২০ বিশ্বকাপ, অলিম্পিক, কোপা আমেরিকা, চ্যাম্পিয়নস লিগ—কোনটা সবচেয়ে আবেগপ্রবণ করে?
দি মারিয়া: ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা। ২৮ বছর পর জাতীয় দলের শিরোপা। ওটা আমার জন্য সবকিছু বদলে দিয়েছিল। ক্লাবে ভালো করছিলাম, কিন্তু জাতীয় দলে হচ্ছিল না। এত ভার নিয়ে ব্রাজিলের বিপক্ষে ফাইনালে আমার গোল—ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলোর একটি।
মেসি ৩৮, মদরিচ ৪০, ক্রিস্টিয়ানো ৪১ ছোঁবেন—তাঁরাও বিশ্বকাপে যাচ্ছেন। আপনার ইচ্ছা করে না?
দি মারিয়া: ইচ্ছা নেই, এমন নয়। তবে আমি মনে করি, আমার অধ্যায় শেষ। যা চেয়েছি, সব পেয়েছি। নতুন প্রজন্ম আসছে। কাতারের পরই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। বন্ধুরা রাজি করাল শেষ একটা কোপা আমেরিকা খেলতে। সিনেমার মতো শেষ হলো—চ্যাম্পিয়ন হয়ে। ওটা আমার সময় ছিল, এখন অন্যদের পালা।
লিসবনে খেলতে গিয়ে তিন বছরের মধ্যে রিয়াল মাদ্রিদে। সেটা কি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল?
দি মারিয়া: পর্তুগালে আমার তৃতীয় বছরে যখন ছন্দে ছিলাম, তখন ইউরোপের বড় ক্লাবগুলো থেকে প্রস্তাব আসতে শুরু করে। রিয়াল মাদ্রিদ যখন ডাকল, তখন না বলার প্রশ্নই আসে না। বিশ্বের সেরা ক্লাব। ক্লাব পর্যায়ে একজন খেলোয়াড় সর্বোচ্চ যেখানে পৌঁছাতে পারে, ওটাই ছিল সেই চূড়া।
জোসে মরিনিওর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিল?
দি মারিয়া: মরিনিও আমার কাছে ‘নাম্বার ওয়ান’। কোচ হিসেবে এবং মানুষ হিসেবেও। ২০১০ বিশ্বকাপের পর আমার সময়টা ভালো যাচ্ছিল না, কিন্তু তিনি আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি আমাকে আগলে রেখেছিলেন, আমি তাঁর কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ।
বার্সেলোনার বিপক্ষে সেই উত্তপ্ত ক্লাসিকোগুলোর কথা মনে পড়ে?
দি মারিয়া: অসাধারণ। প্রতিটি আলাদা। বিশ্বকাপ ফাইনালের পর সবচেয়ে বেশি দেখা ম্যাচ—মাদ্রিদ বনাম বার্সা। বিশ্বমঞ্চে খেলতে ভালো লাগে। সেখানে আমি স্বচ্ছন্দ। প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র ছিল। অনেক কিছু হয়েছে। তবু এমন ম্যাচ খেলতে পারার আনন্দই আলাদা।
রিয়ালের লা দেসিমা (দশম চ্যাম্পিয়নস লিগ ট্রফি) জয়ে সবাই রামোসের গোলের কথা বলে, কিন্তু আপনি যে সেই ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় ছিলেন, সেটা অনেকেই মনে রাখে না।
দি মারিয়া: গোল বা অ্যাসিস্টই তো লোকে মনে রাখে বেশি! তবে আমি কিছু মনে করি না। ক্লাবের ইতিহাসের ওই জয়ে অবদান রাখতে পেরেছি, এটাই আমার বড় তৃপ্তি।
মাদ্রিদ ছাড়ার কি কষ্ট আজও আছে?
দি মারিয়া: হ্যাঁ। কারণ, আমি ছেড়ে যেতে চাইনি। রটেছিল যে আমি ক্রিস্টিয়ানোর (রোনালদোর) সমান বেতন চেয়েছি, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা। চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার পর আমি বেশ খুশি ছিলাম। কোচ আনচেলত্তিও চেয়েছিলেন আমি থাকি। কিন্তু হামেস রদ্রিগেজ আসায় আমাকে দলবদলের বাজারে তোলা হলো। আমি শেষ দিন পর্যন্ত থাকতে চেয়েছিলাম। এমনকি সুপার কাপের পর আমাকে আর ডাকা হয়নি। কারণ, পর্দার আড়ালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সঙ্গে চুক্তি হয়ে গিয়েছিল। অথচ আমি তার কিছুই জানতাম না।
আনচেলত্তি আপনার পজিশন বদলে উইঙ্গার থেকে মিডফিল্ডার করে দিয়েছিলেন...
দি মারিয়া: তিনি একজন দুর্দান্ত কোচ ও অসাধারণ মানুষ। আমার ক্লাব ছাড়ার গুঞ্জন যখন তুঙ্গে, তখন তিনিই বলেছিলেন যে আমার জন্য মাঠে তিনি জায়গা খুঁজে নেবেন। ওসাসুনার বিপক্ষে তিনি আমাকে মাঝমাঠে নামালেন, আমি গোল করলাম। এরপর থেকেই সব বদলে গেল।
মেসি না রোনালদো—কে সেরা?
দি মারিয়া: রোনালদো এক নম্বর হওয়ার জন্য অনেক পরিশ্রম আর চেষ্টা করেছে। কিন্তু মেসির ব্যাপারটা আলাদা। ও হয়তো ড্রেসিংরুমে বসে আয়েশ করে মাতে (আর্জেন্টাইন চা) খাচ্ছে, কিন্তু মাঠে নামার পর ও বুঝিয়ে দেয় যে সে ঈশ্বরের আশীর্বাদ পাওয়া এক জাদুকর। পরিশ্রম দিয়ে হয়তো সেরা হওয়া যায়, কিন্তু মেসি যেটা করে সেটা স্রেফ প্রতিভা।
সিজার লুইস মেনোত্তি আপনাকে মেসি–ম্যারাডোনার কাতারে রাখতেন...
দি মারিয়া: দারুণ প্রশংসা। কিন্তু বাস্তব নয়। ওরা অন্য জগতের।
ম্যারাডোনার কাছ থেকে কী শিখেছেন?
দি মারিয়া: অনেক কিছু। ডিয়েগো সব সময় বলতেন—মাঠটাকে নিজের বাড়ির আঙিনা মনে করবে। তাহলে আর কোনো চাপ থাকবে না। এ কথাটা আমাকে খুব শান্ত রাখত। তিনি বলতেন, মাঠে নেমে নিজের সেরাটা দাও এবং খেলাটা উপভোগ করো।
রিয়াল মাদ্রিদে আপনার উত্তরসূরি হিসেবে মাস্তানতুয়োনোকে নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে।
দি মারিয়া: মানুষ ওকে আমার সঙ্গে তুলনা করে, কিন্তু ওর প্রতিভা আমার চেয়েও বেশি। ওর ড্রিবলিং দুর্দান্ত। ওর সামনে দীর্ঘ ক্যারিয়ার পড়ে আছে, ও অনেক বড় হবে।
ম্যানচেস্টারে এক বছর কাটিয়ে পিএসজিতে গেলেন। এমবাপ্পের সঙ্গে খেলেছেন। এই মুহূর্তে কি সে-ই সেরা?
দি মারিয়া: হ্যাঁ। কিলিয়ান কয়েক বছর ধরেই বিশ্বসেরাদের একজন। ব্যক্তিগত পুরস্কারের ক্ষেত্রে দলগত শিরোপার একটা প্রভাব থাকে ঠিকই, কিন্তু ও প্রতিদিন মাঠে যা করে, তাতে বোঝা যায়, ও অনন্য। আমার মতে আজকের ফুটবল বিশ্বে সে-ই সেরা। ও যখন নিজের ছন্দে থাকে, একাই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিতে পারে।
খুব শিগগিরই ‘লা ফিনালিসিমা’য় মুখোমুখি হবে স্পেন ও আর্জেন্টিনা। কী মনে হচ্ছে?
দি মারিয়া: এই মুহূর্তে এ দুটিই বিশ্বের সেরা দল। আমি চাই অবশ্যই আর্জেন্টিনা জিতুক। ম্যাচটা দারুণ উপভোগ্য হবে। কারণ, দুই দলের খেলার ধরন এবং ছন্দ প্রায় একই রকম। বলের দখল নিয়ে দুই দলের লড়াইটা হবে দেখার মতো।
নতুন খেলোয়াড়দের মধ্যে কেউ কি আপনাকে মুগ্ধ করেছে?
দি মারিয়া: মাস্তানতুয়োনো ছাড়াও নিকো পাজ আমার নজর কেড়েছে। ওর অনেক সম্ভাবনা। আমি নিয়মিত ওর খেলা দেখি। ও অনেক উঁচু মানের খেলোয়াড়। যেভাবে খেলছে, তাতে এটা নিশ্চিত যে ও আর্জেন্টিনাকে অনেক আনন্দ দেবে, অনেক সাফল্য এনে দেবে।
রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাবে খেলার সামর্থ্য কি ওর আছে?
দি মারিয়া: হ্যাঁ, খুব সহজেই। সমস্যা হলো মাদ্রিদে এখন অনেক ভালো খেলোয়াড়। ওকে নিয়ে বেঞ্চে বসিয়ে রাখাটা ভালো হবে না। কোমোতে থাকাটাই ওর জন্য ভালো হয়েছে। এতে ওর আত্মবিশ্বাস বাড়ছে, গত মৌসুমের চেয়েও ও এখন অনেক ভালো খেলছে। আমি ওর জন্য খুব খুশি। বড় কোনো ক্লাবে খেলার সুযোগ ওর ঠিকই আসবে।
অবসরের পর কী পরিকল্পনা? আপনাকে কি ডাগআউটে দেখা যাবে?
দি মারিয়া: অবশ্যই। লিয়ান্দ্রো পারেদেস আর আমি মিলে একটা জুটি গড়ার কথা ভাবছি। ও অবসর নেওয়ার পর আমরা কোচিং শুরু করব।
আপনি কি মরিনিওর মতো কোচ হতে চান?
দি মারিয়া: আমি নিজের মতো হতে চাই। খেলোয়াড় হিসেবেও যেমন কারও অনুকরণ করিনি, কোচ হিসেবেও আমি নিজের দর্শন কাজে লাগাতে চাই।