
যশোরের দিগন্তজোড়া মাঠ আর শিল্প-সংস্কৃতির ঐতিহ্যের মধ্যে ১২ একর জায়গাজুড়ে দাঁড়িয়ে আছে ‘সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, যশোর’। ২০১৭ সালে প্রায় ৩০৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই পার্ক যখন যাত্রা শুরু করে, তখন মানুষের মনে ছিল পাহাড়সম প্রত্যাশা। লক্ষ্য ছিল জ্ঞানভিত্তিক শিল্পায়ন আর হাজারো তরুণের কর্মসংস্থানের। কিন্তু উদ্বোধনের পর দীর্ঘ পাঁচ বছর সেই প্রত্যাশার পারদ কেবল নিচেই নেমেছে। বিশেষ করে বিনিয়োগকারী ও কর্মীদের জন্য তৈরি করা আবাসন সুবিধা বা ডরমিটরি ও ক্যাফেটেরিয়া ভবনটি অব্যবস্থাপনার কারণে হয়ে পড়েছিল প্রায় পরিত্যক্ত। ২০২৩ সালে ডরমিটরি ভবনটি রূপ নেয় এক রিসোর্টে, যার নাম ‘যশোর আইটি পার্ক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট’। যদিও আইটি পার্কে রিসোর্ট হওয়ার কথা নয়। তবে ভবন পরিত্যক্ত না রেখে রিসোর্ট করা হয়েছে।
পার্কটি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পদচারণে মুখর হওয়ার কথা থাকলেও ২০২৩ সাল পর্যন্ত তা ছিল প্রাণহীন। এই অচলাবস্থা কাটাতে হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ ডরমিটরিটিকে রিসোর্টে রূপান্তরের পরিকল্পনা করে। পার্কের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ‘টেকসিটি’ ভবনটি ১০ বছরের জন্য সাব-লিজ দেয় খান প্রপার্টিজকে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাজ শুরু হয়।
খান প্রপার্টিজ গ্রুপের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মাসুদুর রহমান খান নিজস্ব পরিকল্পনায় প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে ভবনটিকে সংস্কার করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল কেবল ব্যবসায়িক মুনাফা নয়, বরং যশোরের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে পর্যটকদের সামনে তুলে ধরা।
১২ তলাবিশিষ্ট এই রিসোর্টের প্রতিটি তলায় আধুনিকতার সঙ্গে মিশে আছে মাটির টান। দর্শনার্থীরা যখন নিচতলা থেকে ১২ তলায় ওঠার জন্য সিঁড়ি ব্যবহার করেন, তখন তাঁদের চোখে পড়ে গ্রামবাংলার মানুষের ব্যবহৃত পুরোনো দিনের সরঞ্জাম এবং যশোরের কৃষ্টি।
রিসোর্টটির প্রতিটি তলার নামকরণ করা হয়েছে যশোরের বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ও ঐতিহ্যের স্মরণে। এখানে রয়েছে মাইকেল মধুসূদন দত্ত গ্যালারি, লালন শাহ গ্যালারি, এস এম সুলতান গ্যালারি, মুক্তিযুদ্ধে যশোর ও গদখালি ফ্লোর, নকশিকাঁথা ও বিউটি অব সুন্দরবন গ্যালারি, দেয়ালে দেয়ালে শোভা পাচ্ছে টেরাকোটা, বিখ্যাত শিল্পীদের চিত্রকর্ম এবং নিপুণ হাতের নকশিকাঁথা। এটি এখন কেবল একটি আবাসনকেন্দ্র নয়, বরং যশোরের শিল্প-সংস্কৃতির এক মিলনমেলা।
অতিথিদের বিনোদন ও আরাম নিশ্চিত করতে রিসোর্টটিতে যুক্ত করা হয়েছে লেক ভিউ রেস্টুরেন্ট, জিমনেসিয়াম, স্পা, বিউটি পারলার ও গেম জোন। শিশুদের জন্য রয়েছে কিডস জোন ও দোলনা। এমনকি শীতের সন্ধ্যায় আড্ডা জমানোর জন্য রাখা হয়েছে আধুনিক ‘ফায়ার প্লেস’। ব্যবসার কাজে আসা ব্যক্তিদের জন্য আছে বিজনেস সেন্টার ও কনফারেন্স হল। ভবনের সামনের বাগানটিতে রোপণ করা হয়েছে বিভিন্ন ফলদ ও ঔষধি গাছ, যা পুরো পরিবেশকে করেছে মনোমুগ্ধকর।
পরিত্যক্ত ভবনটি প্রাণ ফিরে পাওয়ার পরপরই অর্থনৈতিক সাফল্যের মুখ দেখতে শুরু করেছে। খান প্রপার্টিজ দায়িত্ব নেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই এটি প্রায় অর্ধকোটি টাকা রাজস্ব আয় করতে সক্ষম হয়েছে। সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো কর্মসংস্থান। শুরুতে এখানে প্রায় ১০০ জন মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রকৌশলী মাসুদুর রহমান খান জানান, খুব শিগগিরই এখানে আরও ১০০ জনের কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।