ভিটামিন নিয়ে আমাদের ধারণা সাধারণত খুব সহজ-সরল। ভিটামিন সঠিক পরিমাণে গ্রহণ করলেই শরীর সুস্থ থাকে। কিন্তু বাস্তবে মানুষের শরীরের রসায়ন অনেক বেশি সূক্ষ্ম ও জটিল। আর তাই খাদ্যতালিকায় নির্দিষ্ট কিছু ভিটামিন বা খনিজের আধিক্য অথবা ঘাটতি বড় ধরনের সমস্যার কারণ হতে পারে। ভিটামিন বি১২ আমাদের শরীরের স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। শরীরে এই ভিটামিনের অভাব হলে তীব্র ক্লান্তি ও মানসিক জড়তা বা ধীরগতি দেখা দেয়। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় রক্তে বি১২ ভিটামিনের অস্বাভাবিক মাত্রার সঙ্গে ফুসফুস, স্তন, খাদ্যনালি ও কোলন ক্যানসারের সম্পর্ক রয়েছে বলে দাবি করেছেন ফ্রান্সের প্যারিসে অবস্থিত ল্যাবরেটরি অব এমব্রাইওলজি অ্যান্ড জেনেটিক অব হিউমেন মেইলফরমেশন ইমাজিন ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা।
ভিটামিন বি১২ বা কোবালামিন এমন একটি উপাদান, যা ছাড়া কোনো প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে না। এটি ডিএনএ তৈরিতে এবং আমাদের স্নায়ুকে সুরক্ষিত রাখা মাইলিন গঠনে সহায়তা করে। লোহিত রক্তকণিকার পরিপক্বতা এবং ফ্যাটি অ্যাসিড ও অ্যামিনো অ্যাসিডের বিপাক প্রক্রিয়ায় এটি অপরিহার্য। যেহেতু উদ্ভিদের বি১২-এর প্রয়োজন নেই এবং তারা এটি তৈরিও করে না, তাই এই ভিটামিন প্রাকৃতিকভাবে কেবল প্রাণিজ খাবারে পাওয়া যায়। ফলে যাঁরা সম্পূর্ণ নিরামিষাশী বা যাঁদের শরীরে পুষ্টি শোষণে সমস্যা রয়েছে, তাঁরা প্রায়ই এই ভিটামিনের ঘাটতিতে ভোগেন। ডিএনএ সংশ্লেষণ এবং একে স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে বি১২ ভিটামিনের ভূমিকার কারণেই বিজ্ঞানীরা ক্যানসারের সঙ্গে এর সংযোগ খুঁজতে আগ্রহী হন।
বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, ক্যানসার মূলত ডিএনএর ক্ষতির মাধ্যমেই শুরু হয়। ধারণা করা হয়, বি১২-এর চরম অভাব পরোক্ষভাবে কোষের ডিএনএ কপি এবং মেরামতের প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে। এই সূত্র ধরে অনেকেই প্রস্তাব করেছিলেন, বি১২-এর সঠিক মাত্রা কোষের জেনেটিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে পারে, যা ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়ক। তবে গবেষণা যতই এগিয়েছে, বিষয়টি ততই ধোঁয়াশাপূর্ণ হয়েছে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, রক্তে বি১২ ভিটামিনের অস্বাভাবিক উচ্চমাত্রার সঙ্গে ফুসফুসের ক্যানসারের সংযোগ রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে করা একাধিক গবেষণায়ও দেখা গেছে, ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে বি১২ ভিটামিনের মাত্রা হয় খুব কম অথবা খুব বেশি থাকে।
রক্তে বি১২ ভিটামিনের মাত্রা খাদ্যের ওপর নয়; শরীর এটি কীভাবে জমা রাখে, ব্যবহার করে ও পরিবহন করে তার ওপরও নির্ভর করে। আমাদের লিভার প্রচুর পরিমাণে বি১২ ভিটামিন জমা রাখে। বেশ কিছু ক্যানসার, বিশেষ করে লিভার ক্যানসার এবং ক্যানসার শরীরে দ্রুত ছড়িয়ে তারা শরীরের এই ভিটামিন জমা রাখা বা পরিবহনের প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। কিছু টিউমার আবার রক্তে বি১২ বহনকারী প্রোটিনের উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়। এর অর্থ বলা যায়, রক্ত পরীক্ষায় বি১২ ভিটামিনের উচ্চমাত্রা অনেক সময় রোগের কারণ না হয়ে; বরং রোগের উপসর্গ বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে।
সম্প্রতি অন্য এক গবেষণায় ৩৭ হাজারের বেশি কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীকে পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, যাঁদের রক্তে বি১২ ভিটামিনের মাত্রা খুব বেশি, তাদের বাঁচার হার ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম। তবে গবেষকেরা একে সরাসরি কারণ হিসেবে চিহ্নিত না করে নির্দেশক হিসেবে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। ২০২৪ সালে ভিয়েতনামের ৩ হাজার ৭৫৮ জন ক্যানসার রোগীর ওপর পরিচালিত একটি গবেষণা বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সেখানে দেখা গেছে, যাঁদের বি১২ গ্রহণের মাত্রা অস্বাভাবিক কম এবং যাঁদের খুব বেশি, উভয় পক্ষই মাঝারিপন্থীদের তুলনায় বেশি ক্যানসারের ঝুঁকিতে রয়েছে।
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট