পর্যায় সারণির ১০৩ নম্বর মৌল লরেনসিয়াম বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অনন্য স্থান দখল করে আছে। এটি একটি তেজস্ক্রিয় কৃত্রিম মৌল, যা লরেনসিয়াম অ্যাক্টিনাইড সিরিজের সর্বশেষ এবং ভারী মৌল। প্রকৃতিতে কোনো অস্তিত্ব না থাকলেও গবেষণাগারে অতিপারমাণবিক কণার সংঘর্ষের মাধ্যমে তৈরি করা যায় মৌলটি।
লরেনসিয়াম আবিষ্কার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক চলেছে। মৌলটির নামকরণ করা হয়েছে বিখ্যাত মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী আর্নেস্ট ও লরেন্সের নামানুসারে, যিনি সাইক্লোট্রন কণা ত্বরক যন্ত্র উদ্ভাবন করেছিলেন। সাইক্লোট্রন এমন একটি যন্ত্র, যা উপপারমাণবিক কণাকে একটি বৃত্তাকার পথে প্রচণ্ড গতিতে ঘুরিয়ে যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয় করে এবং পরে একটি পরমাণুকে আঘাত করে নতুন পরমাণু তৈরি করে।
১৯৫৮ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লরেন্স বার্কলে ল্যাবরেটরির একদল বিজ্ঞানী আলবার্ট ঘিওর্সোর নেতৃত্বে কুরিয়াম মৌলকে নাইট্রোজেন দিয়ে আঘাত করে ১০৩ নম্বর মৌলের ২৫৭-আইসোটোপ তৈরির দাবি করেন। ১৯৬০ সালে তারা ক্যালিফোর্নিয়ামকে বোরন দিয়ে আঘাত করে ২৫৯-আইসোটোপ পাওয়ার আশা করলেও ফলাফল ছিল অস্পষ্ট। অবশেষে ১৯৬১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তারা কুরিয়াম ও বোরনের সংঘর্ষ ঘটিয়ে ২৫৭-আইসোটোপ পাওয়ার দাবি করেন এবং মৌলটির নাম লরেনসিয়াম প্রস্তাব করেন।
তবে এই আবিষ্কার নিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় সোভিয়েত ইউনিয়নের জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ। ১৯৬৫ সালে তারা অ্যামেরিসিয়ামকে অক্সিজেন দিয়ে আঘাত করে ২৫৬-আইসোটোপ সফলভাবে তৈরি করে। তারা বার্কলে ল্যাবরেটরির আগের কাজগুলো পরীক্ষা করে সেগুলোকে ভুল বলে দাবি করে। এর প্রতিক্রিয়ায় বার্কলে ল্যাব জানায়, তাদের তৈরি করা মৌলটি আসলে ২৫৮-আইসোটোপ ছিল। দীর্ঘ বিতর্ক শেষে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব পিউর অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি শেষ পর্যন্ত বার্কলে ল্যাবরেটরিকেই এই মৌল আবিষ্কারের কৃতিত্ব প্রদান করে।
লরেনসিয়াম একটি তেজস্ক্রিয় ধাতু, যার মাত্র কয়েকটি পরমাণু এ পর্যন্ত তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। লরেনসিয়ামের সবচেয়ে স্থিতিশীল আইসোটোপের স্থায়িত্ব মাত্র ১১ ঘণ্টা। অন্য অধিকাংশ আইসোটোপের স্থায়িত্ব এক মিনিটের কম। সাধারণত ক্যালিফোর্নিয়াম মৌলকে বোরন কণা দিয়ে আঘাত করার মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয় মৌলটি। গবেষণার বাইরে এই মৌলের আর কোনো ব্যবহার নেই। এ ছাড়া এর কোনো পরিচিত জৈবিক ভূমিকাও নেই। রাসায়নিকভাবে এটি লুটেসিয়াম মৌলের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ এবং অন্যান্য অ্যাক্টিনাইড মৌলের মতো আচরণ করে।
সূত্র: রয়্যাল সোসাইটি অব কেমেস্ট্রি