মঙ্গল গ্রহকে মানুষের বসবাসের উপযোগী করাকে এত দিন কয়েক হাজার বছরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে দেখা হতো। তবে নতুন এক গবেষণা এই সময়সীমা আমূল বদলে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সায়েন্স অ্যাডভান্সেস জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, মঙ্গল গ্রহের মাটিতে থাকা প্রচুর পরিমাণ আয়রন এবং অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে তৈরি ন্যানোস্কোপিক অ্যারোসল কণা ব্যবহার করে গ্রহটিকে দ্রুত উষ্ণ করা সম্ভব। মঙ্গল গ্রহের গড় তাপমাত্রা মাইনাস ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে বিজ্ঞানীদের মতে, মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডলে বিশেষভাবে তৈরি অ্যারোজেল প্রবেশ করানো হলে যে গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়া হবে তার ফলে মাত্র ১৫ বছরের মধ্যে গ্রহটির পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বৃদ্ধি পাবে।
আগে মঙ্গলে উষ্ণতা বাড়ানোর জন্য পৃথিবী থেকে বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস পাঠানোর পরিকল্পনা করা হতো, যা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং প্রায় অসম্ভব। তবে নতুন এই পদ্ধতিতে মঙ্গল গ্রহের নিজস্ব খনিজ সম্পদ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। আয়রন এবং অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে তৈরি এই কণাগুলো বালির দানার চেয়েও ছোট কিন্তু মঙ্গলের ধূলিকণার চেয়ে বড়। এই রড-আকৃতির কণা বায়ুমণ্ডলে দীর্ঘক্ষণ ভেসে থাকতে পারে এবং মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত তাপকে পুনরায় পৃষ্ঠের দিকেই প্রতিফলিত করে। ফলে একটি প্রাকৃতিক তাপ-রক্ষাকবচ তৈরি হয়।
এই পদ্ধতিটি পৃথিবী থেকে কার্গো পাঠানোর পুরোনো পদ্ধতির চেয়ে ৫ হাজার গুণ কম শক্তি ব্যয় করবে। যদিও এই বায়ুমণ্ডল এখনই শ্বাসযোগ্য হবে না, তবে এই তাপীয় পরিবর্তন মঙ্গলে তরল পানির অস্তিত্ব এবং শেষ পর্যন্ত মানব বসতি স্থাপনের প্রথম ধাপ হিসেবে কাজ করবে। মঙ্গল গ্রহকে উষ্ণ করা একটি দীর্ঘমেয়াদি বাস্তুসংস্থানগত পরিবর্তনের প্রথম ধাপ মাত্র। অ্যারোসল পদ্ধতি তাপমাত্রা বৃদ্ধি করতে পারলেও মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলের ৯৫ শতাংশই এখনো কার্বন ডাই–অক্সাইড। তাপমাত্রা বাড়লে মঙ্গলের মেরু অঞ্চলের বরফ গলতে শুরু করবে, যা সেখানে আটকে থাকা কার্বন ডাই–অক্সাইড মুক্ত করবে এবং বায়ুমণ্ডলকে আরও ঘন করবে। নাসার পরীক্ষায় ইতোমধ্যে প্রমাণ মিলেছে, মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল থেকে অক্সিজেন বের করা সম্ভব।
উষ্ণায়নের পর সেখানে সায়ানোব্যাকটেরিয়া বা জেনেটিক্যালি ইঞ্জিনিয়ার্ড উদ্ভিদ প্রবর্তন করা হবে, যা সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে শ্বাসযোগ্য অক্সিজেন তৈরি করবে।
মঙ্গল গ্রহে স্থায়ী বসতি স্থাপনের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হলো এর কোনো বৈশ্বিক চৌম্বকক্ষেত্র নেই। ফলে সূর্যের সৌর বায়ুমঙ্গলের বায়ুমণ্ডলকে অনবরত উড়িয়ে নিয়ে যায়। নাসার ম্যাভেন মিশনের তথ্য অনুযায়ী, টেরাফর্মিং প্রচেষ্টাকে সফল করতে হলে এই বায়ুমণ্ডলীয় ক্ষয়রোধ করা জরুরি। গবেষকেরা প্রস্তাব করেছেন, মঙ্গল এবং সূর্যের মাঝখানে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে একটি কৃত্রিম চৌম্বকীয় ঢাল তৈরি করা যেতে পারে। এটি মঙ্গলের ঘন হতে থাকা বায়ুমণ্ডলকে সৌরবায়ুর হাত থেকে সুরক্ষা দেবে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া