
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেম ক্রমে দুর্বল হতে থাকে। ফলে সহজেই বিভিন্ন রোগের আক্রান্ত হতে হয়। তাই দীর্ঘদিন ধরেই বার্ধক্যে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর কৌশল আবিষ্কারের জন্য কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা। এবার বার্ধক্যকে জয় করার এক অভাবনীয় কৌশল আবিষ্কারের দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) বিজ্ঞানীরা। তাঁদের দাবি, এমআরএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার করে শরীরের যকৃৎ বা লিভারকে ইমিউন বুস্টার কারখানায় রূপান্তরের কৌশল খুঁজে পাওয়া গেছে। এই কৌশল বৃদ্ধ বয়সেও তরুণদের মতো বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করবে।
বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতার মূল কারিগর হলো টি-সেল। এই কোষ মূলত হৃৎপিণ্ডের ঠিক সামনে অবস্থিত থাইমাস নামের একটি ছোট অঙ্গে পরিপক্ব হয়। থাইমাস থেকে নিঃসৃত বিভিন্ন গ্রোথ ফ্যাক্টর ও সিগন্যাল টি-সেলকে বেঁচে থাকতে ও শক্তিশালী হতে সাহায্য করে। সমস্যা হলো প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর থেকেই থাইমাস সংকুচিত হতে শুরু করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে থাইমিক ইভলুশন বলা হয়। ৭৫ বছর বয়সের মধ্যে এই অঙ্গ প্রায় অকেজো হয়ে পড়ে। ফলে নতুন টি-সেল তৈরি কমে যায়। তখন শরীর ইনফেকশন বা ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা হারায়।
এমআইটির নিউরোসায়েন্সের অধ্যাপক ফেং ঝাংয়ের নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী থাইমাসের ওপর নির্ভর না করে শরীরকে কৃত্রিমভাবে টি-সেল উদ্দীপক সংকেত তৈরির নির্দেশ দেন। এ জন্য তাঁরা বেছে নেন লিভারকে। বার্ধক্যেও লিভার প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন তৈরি করতে পারে। আবার লিভারে এমআরএনএ পৌঁছে দেওয়া অন্যান্য অঙ্গের তুলনায় সহজ। শরীরের সব রক্ত লিভারের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয় বলে এখান থেকে নিঃসৃত ইমিউন সিগন্যালগুলো সহজেই পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিজ্ঞানীরা ডিএলএল১, এলএলটি ৩ ও আইএল ৭ নামের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ইমিউন ফ্যাক্টরকে এমআরএনএর মাধ্যমে লিপিড ন্যানো পার্টিকেলে প্যাকেটজাত করেন। এরপর তা ১৮ মাস বয়সী ইঁদুরের রক্তে ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রবেশ করানো হয়। লিভারের কোষ এই এমআরএনএ গ্রহণ করে সেই প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরি করতে শুরু করে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, চিকিৎসা পাওয়া বয়স্ক ইঁদুরগুলোতে টিকার প্রতি সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এদের শরীরে তরুণ ইঁদুরের মতো কার্যকর টি-সেল তৈরি হয়েছে। যেসব ইঁদুরকে এই এমআরএনএ ট্রিটমেন্ট ও ক্যানসারের ইমিউনোথেরাপি ওষুধ দেওয়া হয়েছিল, তাদের বেঁচে থাকার হার নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে। এটি প্রমাণ করে, এই পদ্ধতি ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শরীরের নিজস্ব ক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এ বিষয়ে বিজ্ঞানী ফেং ঝাং বলেন, এই আবিষ্কার কেবল বার্ধক্য নয়; বরং ইমিউন সিস্টেমের অন্যান্য জটিল রোগের চিকিৎসাতেও বিপ্লব আনতে পারে। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানী মিরকো ফ্রেডরিখ বলেন, এই পদ্ধতিটি সফল হলে মানুষ দীর্ঘকাল রোগমুক্ত জীবন কাটাতে পারবে।
সূত্র: সায়েন্স ডেইলি