কয়েক দিন ধরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছে বাংলাদেশে। শুকনা মাটিতে বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা পড়ার পর বাতাসে একধরনের সোঁদা গন্ধ পাওয়া যায়। প্রাকৃতিক এই গন্ধ বিশ্বজুড়ে অনেক মানুষের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। মানুষ সাধারণত একে বৃষ্টির তাজা সুবাস বলে মনে করে। তবে বিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম পেট্রিকোর। মজার বিষয় হলো, বৃষ্টির পানির নিজের কোনো গন্ধ নেই। মানুষের নাক আসলে মাটির নিচে থাকা এক বিশেষ রাসায়নিকের উপস্থিতি শনাক্ত করে। এই রাসায়নিকের নাম জিওস্মিন। এটি তৈরি করে মাটিতে বসবাসকারী এক বিশেষ ব্যাকটেরিয়া। এই অণুজীবগুলো কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীর পুরো বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখছে।
জিওস্মিন তৈরির মূল কারিগর হলো একধরনের সুতার মতো ব্যাকটেরিয়ার দল। এদের বৈজ্ঞানিক নাম স্ট্রেপটোমাইসিস। এসব অণুজীব মাটির নিচে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠে। তারা মৃত উদ্ভিদ ও অন্যান্য জৈব পদার্থ ভেঙে মাটিতে পুষ্টি ফিরিয়ে দিতে সাহায্য করে। পৃথিবীতে আজ থেকে প্রায় ২৩ কোটি বছর আগে ডাইনোসর বসবাস করত। এ ব্যাকটেরিয়ার পূর্বপুরুষেরা তারও অনেক আগে থেকে পৃথিবীতে বাসবাস করছে। প্রতিটি বৃষ্টির ফোঁটা মাটিতে পড়লে তাদের তৈরি এ যৌগগুলো বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এভাবেই সৃষ্টি হয় প্রকৃতির অন্যতম চেনা সুবাস।
১৯৬৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার দুই গবেষক ইসাবেল জয় বেয়ার এবং রিচার্ড জি থমাস এই সুবাসের নাম দেন পেট্রিকোর। তাঁদের গবেষণা থেকে জানা যায়, শুষ্ক আবহাওয়ায় গাছপালা থেকে একধরনের তেল নির্গত হয়। এই তেল আশপাশের শিলা ও মাটিতে জমা হতে থাকে। আকাশে মেঘ জমার পর যখন বৃষ্টি নামে, তখন এই তেলগুলো মাটির জিওস্মিন এবং অন্যান্য জৈব যৌগের সঙ্গে মিশে যায়। এ মিশ্রণই বৃষ্টির চিরচেনা সুবাস তৈরি করে। বৃষ্টির ফোঁটা যখন মাটির ছিদ্রযুক্ত উপরিভাগে আঘাত করে, তখন সেখানে বাতাসের ছোট ছোট বুদ্বুদ তৈরি হয়। এই বুদ্বুদগুলো বায়ুমণ্ডলে ফেটে গিয়ে অ্যারোসল নামের অতি ক্ষুদ্র কণা তৈরি করে। এই কণাগুলোর মধ্যে জিওস্মিন এবং উদ্ভিদের তেল মিশে থাকে। অদৃশ্য এই কণাগুলো বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে অনেক সময় মূল বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগেই মানুষ দূর থেকে বৃষ্টির সুবাস পেয়ে যায়।
পেট্রিকোরের তীব্রতা কেমন হবে, তা নির্ভর করে বৃষ্টির অবস্থার ওপর। দীর্ঘ খরা বা শুষ্ক আবহাওয়ার পর হালকা বৃষ্টি হলে এই গন্ধ সবচেয়ে তীব্র হয়। এর কারণ হলো দীর্ঘ সময় ধরে মাটির উপরিভাগে প্রচুর পরিমাণে জিওস্মিন এবং উদ্ভিদ থেকে আসা যৌগ জমা থাকে।
সাধারণত ব্যাকটেরিয়ার নাম শুনলে মানুষ রোগের কথা ভাবে। তবে স্ট্রেপটোমাইসিস হলো পৃথিবীর সবচেয়ে উপকারী অণুজীবগুলোর একটি। এরা অ্যাকটিনোব্যাকটেরিয়া নামের একটি দলের অন্তর্ভুক্ত। বিশ্বের প্রতিটি মহাদেশের মাটিতে এদের সন্ধান পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রের রটগার্স ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব মাইক্রোবায়োলজির গবেষকদের মতে, এই ব্যাকটেরিয়ার প্রধান কাজ জটিল জৈব উপাদানগুলোকে পচানো। গাছের পাতা, কাঠ ও শিকড় সহজে অন্য কোনো জীব হজম করতে পারে না। এই ব্যাকটেরিয়া সেগুলোকে সহজে ভেঙে ফেলে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা মাটির পুষ্টি উপাদান বৃদ্ধি করে। এটি উদ্ভিদের সুস্থ বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখে।
১৯৬৫ সালে গবেষকেরা মাটি থেকে জিওস্মিন নামের যৌগটি আলাদা করতে সক্ষম হন। তাঁদের মতে, স্ট্রেপটোমাইসিস প্রাকৃতিকভাবে তাদের বিপাকীয় প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জিওস্মিন তৈরি করে। এই যুগান্তকারী আবিষ্কার প্রমাণ করে যে ভেজা মাটির পরিচিত গন্ধ বৃষ্টি থেকে আসে না। এটি মাটির নিচে বাস করা লাখ লাখ আণুবীক্ষণিক জীব থেকে আসে। এই ব্যাকটেরিয়ার আরেকটি অসাধারণ গুণ রয়েছে। আধুনিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত বেশির ভাগ অ্যান্টিবায়োটিক এদের থেকেই তৈরি হয়। মানুষের জীবন রক্ষাকারী প্রাকৃতিক অ্যান্টিবায়োটিকের দুই-তৃতীয়াংশই আসে স্ট্রেপটোমাইসিস প্রজাতি থেকে। এর মধ্যে স্ট্রেপটোমাইসিন, টেট্রাসাইক্লিন, ক্লোরামফেনিকল এবং এরিথ্রোমাইসিনের মতো জরুরি ওষুধ রয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য বিজ্ঞানীরা এখনো এদের নিয়ে নতুন গবেষণা চালাচ্ছেন। ব্যাকটেরিয়ার জীবনচক্রের অংশ হিসেবে জিওস্মিন তৈরি হয়। বিশেষ করে যখন তারা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার জন্য স্পোর বা রেণু তৈরি করে, তখন এই গন্ধের সৃষ্টি হয়।
বৃষ্টির গন্ধ মানুষের কাছে এত তীব্র মনে হওয়ার একটি বিশেষ কারণ আছে। মানুষের নাক জিওস্মিনের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। গবেষকেরা দেখিয়েছেন, মানুষ প্রতি ট্রিলিয়নে মাত্র কয়েক ভাগ জিওস্মিনের উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারে। এটি একটি অলিম্পিক আকারের সুইমিং পুলে এক ফোঁটা তরল মিশ্রিত করার মতো অতি ক্ষুদ্র পরিমাপ। মানুষ জিওস্মিনের গন্ধ পছন্দ করলেও কিছু কীটপতঙ্গ ও প্রাণী একে পরিবেশগত সংকেত হিসেবে ব্যবহার করে। কিছু পোকা আর্দ্র পরিবেশের দিকে আকৃষ্ট হয়; কারণ, সেখানে ডিম পাড়া সহজ। আবার কিছু জীব ইচ্ছাকৃতভাবে এই গন্ধ এড়িয়ে চলে।
সূত্র: দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া