
পার্লামেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে মরক্কো, ভোট আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর। দেশজুড়ে নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে, তবে এবার মরক্কোর রাজনৈতিক বিতর্কে আদর্শিক অবস্থান বা দলগুলোর নির্বাচনী কর্মসূচির চেয়ে অন্য একটি বিষয় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সেটি হচ্ছে, প্রভাবশালী এক সরকারি কর্মকর্তার দলীয় রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত। ওই ব্যক্তি হলেন মরক্কোর বাজেটবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফাউজি লেকজা। তবে বিশ্বজুড়ে তিনি রয়্যাল মরোক্কান ফুটবল ফেডারেশনের (এফআরএমএফ) সভাপতি হিসেবে অধিক পরিচিত।
সম্প্রতি লেকজা অথেনটিসিটি অ্যান্ড মডার্নিটি পার্টিতে (পিএএম) যোগ দিয়েছেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ফাউজি লেকজার হাত ধরেই মরক্কোর ফুটবলে আজকের রূপান্তর ঘটেছে। ২০২২ ও ২০২৬ সালে পরপর দুটি বিশ্বকাপে মরক্কো কোয়ার্টার ফাইনালে খেলেছে। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনেও ফাউজি লেকজা নিজের সুনাম গড়ে তুলেছেন।
এখানে সময়টাও গুরুত্বপূর্ণ। এবারের নির্বাচনে যে দল সরকার গঠন করবে, তাদের তদারকিতে মরক্কো ২০৩০ সালের ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য প্রস্তুত হবে। মরক্কো, স্পেন ও পর্তুগাল যৌথভাবে বিশ্বকাপ ফুটবলের ওই আসরের আয়োজক দেশ।
এবার লেকজা সরাসরি রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন, যা সাধারণ কোনো ঘটনা নয়। বরং এটি মরক্কোর রাজনীতিতে বৃহত্তর এক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়; যেখানে প্রশাসনিক দক্ষতা, রাষ্ট্র–নেতৃত্বাধীন উন্নয়ন এবং জাতীয় মর্যাদা ক্রমশ রাজনৈতিক বৈধতার গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠছে।
মরক্কোর উপকূলীয় শহর আগাদিরের ইবনে জোহর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবিধানিক আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান গবেষক মুস্তাফা আহদার আল-জাজিরাকে বলেন, নির্বাচনের তিন মাসেরও কম সময় আগে ফাউজি লেকজার পিএএম পার্টিতে যোগদান রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আহদার আরও বলেন, ২০১১ সালের সংবিধান অনুযায়ী মরক্কোর প্রত্যেক নাগরিকের যেকোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার স্বাধীনতা রয়েছে। কিন্তু যিনি একই সঙ্গে জাতীয় ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান এবং সরকারের একজন মন্ত্রী পর্যায়ের কর্মকর্তা, তাঁর রাজনীতিতে প্রবেশ একজন সাধারণ নাগরিকের মতো করে দেখার সুযোগ নেই।
‘পিএএম বর্তমান ক্ষমতাসীন জোট সরকারের অংশ এবং সরকারের কার্যক্রম নিয়ে দলটি সমালোচনার মুখে রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে দলটির রাজনৈতিক কর্মসূচি বা অর্জন নয়, বরং আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে লেকজারের দলটিতে যোগদান।’
এখানে সময়টাও গুরুত্বপূর্ণ। এবারের নির্বাচনে যে দল সরকার গঠন করবে, তাদের তদারকিতে মরক্কো ২০৩০ সালের ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য প্রস্তুত হবে। মরক্কো, স্পেন ও পর্তুগাল যৌথভাবে বিশ্বকাপ ফুটবলের ওই আসরের আয়োজক দেশ।
বিশ্বকাপের আয়োজন ঘিরে এ সময়ে অবকাঠামো, পরিবহন ও পর্যটন খাতে লাখ লাখ কোটি ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বিশ্লেষকেরা দেশটির পরবর্তী সরকারকে মরক্কোর ‘বিশ্বকাপ সরকার’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। তাঁদের মতে, এই সরকারের সাফল্য শুধু প্রচলিত অর্থনৈতিক সূচক দিয়ে নয়, বরং ২০৩০ বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতি ও বাস্তবায়নে কতটা সফল হয়, তার ভিত্তিতেও মূল্যায়ন করা হবে।
লেকজার উত্থান মরক্কোসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা যাওয়া একটি বৃহত্তর প্রবণতার প্রতিফলন। সেখানে সফল সরকারি কর্মকর্তারা ক্রমেই নিজেদের যোগ্যতা ও সাফল্যের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সম্পদে পরিণত হচ্ছেন।
বাজেট–বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে লেকজা বড় বড় অবকাঠামো ও বিনিয়োগ প্রকল্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। একই সঙ্গে মরক্কোর ফুটবলের পুনর্জাগরণের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবেও তিনি আত্মপ্রকাশ করেন।
২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপে ‘আটলাস লায়নদের’ সেমিফাইনালে পৌঁছানো মরক্কোর আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। এর ফলে আফ্রিকা ও আরব বিশ্বজুড়ে দেশটির ‘সফট পাওয়ার’ বা প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হয় এবং ফুটবল জাতীয় আকাঙ্ক্ষা, উন্নয়নের স্বপ্ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার প্রতীকে পরিণত হয়।
মরক্কোর রাজনৈতিক পরিবর্তন দেশটির ভোটারদের আচরণগত পরিবর্তনেরও প্রতিফলন। দেশটিতে ২০২১ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ৫০ শতাংশের বেশি ছিল। তবে এরপরও ভোট দেওয়ার যোগ্য প্রায় অর্ধেক নাগরিক ভোটদান থেকে বিরত ছিলেন।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই চিত্র রাজনৈতিক বিষয়ে অনাগ্রহের নয়; বরং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনগণের, বিশেষ করে তরুণ মরোক্কানদের ক্রমবর্ধমান সংশয়ের প্রতিফলন। তাঁরা বেকারত্ব, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং জনসেবার মান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশে ক্রমেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক আন্দোলন ও প্রতিবাদের পথ বেছে নিচ্ছেন।
আহদারের মতে, লেকজাকে ঘিরে চলমান বিতর্ক এই পরিবর্তনেরই একটি উদাহরণ।
আহদার বলেন, ‘পিএএম বর্তমান ক্ষমতাসীন জোট সরকারের অংশ এবং সরকারের কার্যক্রম নিয়ে দলটি সমালোচনার মুখে রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে দলটির রাজনৈতিক কর্মসূচি বা অর্জন নয়, বরং আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে লেকজারের দলটিতে যোগদান।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ মজা করে বলছেন, পিএএম লেকজাকে আকৃষ্ট করেনি, বরং লেকজাই পিএএমকে আকৃষ্ট করেছেন।
আহদারের মতে, এই মন্তব্য রাজনীতিতে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার ক্রমবর্ধমান প্রবণতাকেই প্রতিফলিত করে।