২০২৪ সালে মিয়ানমার জান্তা সরকারের বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ আইন কার্যকরের পর গৃহযুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। জোরপূর্বক নিয়োগ করা বিপুল সেনা জান্তার শক্তি অনেক বাড়িয়েছে; পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে করা নিরাপত্তাচুক্তিও তাদের বাড়তি সুবিধা এনে দিয়েছে। অন্যদিকে চরম অর্থ ও অস্ত্রসংকটে থাকা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো এখন দেশের বেশির ভাগ অঞ্চলে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে, যার ফলে থমকে গেছে তাদের এত দিনের অগ্রযাত্রা। এ নিয়ে প্রতিবেদন করেছেন বিবিসির কুয়েন্টিন সামারভিল।
ঘন জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়ের গভীরে অবস্থিত একটি বিদ্রোহী শিবিরে লুকিয়ে থাকা চার তরুণের কেউই আর মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে অংশ নিতে চান না। তাঁরা কেউই স্বেচ্ছায় দেশটির সামরিক বাহিনীতে যোগ দেননি। তাঁদের জোর করে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে তাঁরা পালিয়ে যান।
তাঁদের একজন ছিলেন রাঁধুনি। কাজ শেষে বাড়িতে ফেরার পথে তাঁকে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর কাছে পরিচয়পত্র ছিল না, আর সামরিক বাহিনীর কাছে তাঁকে আটক করার কারণ হিসেবে সেটাই যথেষ্ট হয়ে ওঠে। এরপর তাঁকে সেনাবাহিনীতে নাম লেখাতে বাধ্য করা হয়।
আরেকজনকে গভীর রাতে কারাওকে গানের আসর থেকে ফেরার পথে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তৃতীয় ব্যক্তি গ্রেপ্তার হওয়ার সময় বন বিভাগের কর্মী ছিলেন। চতুর্থ ব্যক্তি দাবি করেন, তাঁকে গ্রেপ্তার করার সময় তাঁর জুতার মধ্যে গোপনে মাদক ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপর তাঁকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়।
বিবিসির সঙ্গে কথা বলা এই চারজনই পুরুষ, বয়স ১৯ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। তাঁদের একজন বলেন, ‘কী ঘটছে, তা ঠিকমতো বুঝে ওঠার আগেই আমাদের সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।’
‘তারা আমাদের দিয়ে এমন সব কাজ করাত, যা আমরা করতে চাইতাম না। আমরা কখনোই সত্যিকারের বিশ্রাম পাইনি না সকালে, না দিনের বেলা, এমনকি রাতেও না।’
অন্য একজন বলেন, ‘তারা আমাদের দিয়ে এমন সব কাজ করাত, যা আমরা করতে চাইতাম না। আমরা কখনোই সত্যিকারের বিশ্রাম পাইনি—না সকালে, না দিনের বেলা, এমনকি রাতেও না।’
যাঁদের জোর করে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হতো, তাঁদেরই সব কাজ করতে হতো বলে দাবি করেন লুকিয়ে থাকা এই তরুণ। তিনি বলেন, নিয়মিত সেনাদের প্রায় কোনো কাজই করতে হতো না।
পরিবারের নিরাপত্তার খাতিরে বিবিসি এই তরুণদের নাম প্রকাশ করছে না।
জোর করে নিয়োগ দেওয়ার পর তাঁরা চার মাস প্রশিক্ষণে কাটিয়েছিলেন, তারপর তাঁদের কারেন রাজ্যে যুদ্ধ করতে পাঠানো হয়। এক রাতে গোসল করতে যাওয়ার পথে তাঁরা পালানোর সিদ্ধান্ত নেন।
কিন্তু পালিয়ে যাওয়ার পর তাঁরা কাছাকাছি থাকা বিদ্রোহী পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের (পিডিএফ) টহল দলের সামনে পড়ে যান এবং আটক হন।
এই চার তরুণ আপাতত পিডিএফের সঙ্গে থাকবেন, পরে তাঁদের থাইল্যান্ড সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হবে। তাঁদের আশঙ্কা, তাঁরা যদি নিজ এলাকায় ফিরে যান, তবে সামরিক বাহিনী আবারও তাঁদের খুঁজে বের করতে পারে।
মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধে বর্তমান বাস্তবতা হলো, এই চার তরুণ সেনাবাহিনীতে ফিরে যেতে না চাইলেও সামরিক বাহিনীর বাধ্যতামূলক নিয়োগের এই নীতি যুদ্ধে জান্তা বাহিনীর অবস্থানের পরিবর্তন ঘটিয়েছে।
দেশের অনেক অংশে বিদ্রোহীরা এখন সামরিক বাহিনীর চাপে পিছু হটছে। ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যেম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে বর্তমান জান্তা বাহিনী মিয়ানমারের ক্ষমতা দখল করেছে। এর পর থেকে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ চলছে।
গৃহযুদ্ধ মিয়ানমারকে টুকরা টুকরা করে ফেলেছে। হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
এখনো মিয়ানমারের অর্ধেকের বেশি অংশের ওপর দেশটির সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নেই, তবে তারা বেশ কিছু অগ্রগতি অর্জন করেছে। এরই মধ্যে জান্তা বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ শহরতলি দখল করেছে এবং উত্তরের মান্দালয় থেকে মিয়িতকিনা পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পুনর্দখল করেছে। হাজার হাজার সেনা কাচিন, চিন, কারেন রাজ্যসহ সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
দুই বছরের বেশি আগে জাতিগত ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর একটি জোট দেশজুড়ে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছিল। জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তারা একের পর এক বিজয় পেয়েছিল। একসময় আক্রমণাত্মক অবস্থানে থাকা ওই বিদ্রোহী জোট এখন মিয়ানমারের অধিকাংশ স্থানে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে রয়েছে।
এখনো মিয়ানমারের অর্ধেকের বেশি অংশের ওপর দেশটির সামরিক জান্তার নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও তারা বেশ কিছু অগ্রগতি অর্জন করেছে। এরই মধ্যে জান্তা বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ শহরতলি দখল করেছে এবং উত্তরের মান্দালয় থেকে মিয়িতকিনা পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পুনর্দখল করেছে। হাজার হাজার সেনা কাচিন, চিন, কারেন রাজ্যসহ সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার জোর অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন।
বিবিসির প্রতিনিধিরা জান্তা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই মিয়ানমারে ভ্রমণ করেছেন। বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে সংবাদ প্রকাশ করার আর কোনো উপায় তাঁদের হাতে ছিল না। বিবিসি প্রতিনিধিরা সেখানে ১০ দিন অবস্থান করে বিদ্রোহী যোদ্ধাদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন এবং বাগো ও কারেন রাজ্যের অস্থায়ী হাসপাতাল ও যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ কীভাবে চলছে, তা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন।
পিডিএফ ব্যাটালিয়নের কমান্ডার কো কাউং বলেন, মিয়ানমারের জান্তা সরকার ২০২৪ সালে সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ আইন কার্যকর করেছে। ওই আইনে সেনাবাহিনীতে ন্যূনতম দুই বছর সেবা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জোর করে নিয়োগ দেওয়া এই সেনারাই সবচেয়ে বেশি পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন।
মিয়ানমারের জান্তা সরকার ২০২৪ সালে সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ আইন কার্যকর করে। ওই আইনে সেনাবাহিনীতে ন্যূনতম দুই বছর সেবা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জোর করে নিয়োগ দেওয়া এই সেনারাই সবচেয়ে বেশি পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন।কো কাউং, পিডিএফ ব্যাটালিয়নের কমান্ডার
কাউং বলেন, ‘সামরিক বাহিনীর বাধ্যতামূলক নিয়োগ আমাদের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। কারণ, এর ফলে সামরিক বাহিনী সীমাহীন জনবল পেয়েছে।’
নিজেদের দুর্বলতার কথা বলেতে গিয়ে এই কমান্ডার বলেন, ‘আমাদের বেলায় প্রযুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও আমাদের সম্পদ খুবই সীমিত। সীমিত অর্থের কারণে আমরা প্রয়োজনীয় উপাদান যতটা দরকার, ততটা সংগ্রহ করতে পারি না এবং সামরিক বাহিনীর মতো সহজে নতুন সেনা নিয়োগও করতে পারি না।’
কো কাউং ও তাঁর বাহিনী দুই বছর আগে কারেন রাজ্যের হপাপুন শহর এবং একটি বিস্তৃত সামরিক ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল। সেখানে চারদিকে যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন। শহরের প্রবেশমুখের স্বাগত সাইনবোর্ডটি বোমায় উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। একইভাবে শহরের স্কুল, একটি স্থানীয় মঠ এবং বর্তমানে পরিত্যক্ত অধিকাংশ বাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কিন্তু এখন কাউং সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। কারণ, জান্তার ড্রোনগুলো আকাশে ঘুরছে এবং প্রায় দুই হাজার সেনা হপাপুনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে লড়াইরত বিদ্রোহী বাহিনীর তুলনায় অনেক বেশি সশস্ত্র। পাহাড়ের ক্যাম্পে ফিরে পিডিএফ কমান্ডার দা ওয়া স্বীকার করেন, বাধ্যতামূলকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত সেনারা তাঁদের জন্য একটি সমস্যা।
দা ওয়া মিয়ানমারের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি সাড়ে চার বছর কারাগারে ছিলেন। তিনি বলেন, অনেকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীতে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও তাঁরা যোদ্ধা হিসেবে ধীরে ধীরে উন্নতি করছেন। কারণ, তাঁরা আদেশ মানতে আরও দক্ষ হয়ে উঠছেন।
কো কাউংয়ের মতো দা ওয়াও বড় ধরনের প্রতিকূলতার মুখে। তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকার আশপাশের সামরিক বাহিনী নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। প্রায় ৪০০ জন সেনা দা ওয়ায়ের দলের অবস্থানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
তবে শুধু বাধ্যতামূলকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত সেনারাই নন; দা ওয়া বলেন, জান্তা বাহিনীর যুদ্ধের কৌশলও বদলে গেছে। রাশিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তাচুক্তি স্বাক্ষর করার পর তাদের আকাশশক্তি বেড়েছে।
দা ওয়া বলেন, ‘এখন আমরা জোড়ায় জোড়ায় বিমান দেখি, আগে সাধারণত একটিই ফিক্সড-উইং বিমান দেখা যেত।’
ড্রোনের ক্ষেত্রেও এখন জান্তা বাহিনী প্রযুক্তি ও সংখ্যার দিক থেকে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করেন দা ওয়া। তাঁর সঙ্গে একমত পোষণ করেন কো কাউং।
দা ওয়া বলেন, ‘ড্রোনের (হুমকি) অবশ্যই বাড়ছে। আমাদের কাছেও যদি জ্যামার থাকত, তাহলে আমাদের জন্য কাজটা সহজ হতো...এটা নির্ভর করে আমরা তাদের ড্রোন হামলা কতটা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে পারি এবং নিজেদের কতটা ভালোভাবে রক্ষা করতে পারি, তার ওপর।’
এসবের বাইরে আরও কিছু বিষয় যুদ্ধের পরিস্থিতি বদলে দিচ্ছে। যেমন চীনের উদ্যোগে কয়েকটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি। মিয়ানমারে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে চীন। কারেন ও কাচিন রাজ্য থেকে দেশটি বিরল খনিজ আহরণ করছে। এ জন্য চীন কয়েকটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে মধ্যস্থতা করিয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিরোধ বাহিনীর কাছে অস্ত্র ও গোলাবারুদের সরবরাহও কঠোরভাবে সীমিত করেছে।
যুদ্ধে আহত প্লাটুন কমান্ডার কিয়ার সোয়ে বলেন, ‘অস্ত্রের ঘাটতি একটি বড় সমস্যা।’
জঙ্গলের গভীরে একটি অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রে কিয়ার সোয়ের চিকিৎসা চলছে। সেখান থেকে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত সবাই লড়াই করতে চায়। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনেক দুর্বলতা রয়েছে। অস্ত্র ও গোলাবারুদের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।’
কিয়ার সোয়ে একটি ল্যান্ডমাইনের ওপর পা দিয়ে মারাত্মকভাবে আহত হন। মিয়ানমার বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মাইন-দূষিত দেশগুলোর একটি। গত বছরই ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে দেশটিতে ৭৪৫ জন নিহত বা আহত হয়েছেন, যাঁদের এক-চতুর্থাংশই শিশু।
মাইন বিস্ফোরণে কিয়ার সোয়ের ডান পায়ের গোড়ালির বেশির ভাগ অংশই উড়ে গেছে। কিন্তু তিনি এখনো হাল ছেড়ে দেননি।
কিয়ার সোয়ে বলেন, ‘আমি আবার লড়াইয়ে ফিরব। যেকোনোভাবে শেষ পর্যন্ত আমি লড়াই করব। কারণ, এখন আমার জন্য আর বাড়িতে ফিরে যাওয়ার কোনো পথ নেই।’