নেপালের নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলীতে আকস্মিক ঢলের পর কাদা-ধ্বংসস্তূপে ঢেকে গেছে ঘরবাড়িসহ অন্যান্য স্থাপনা। ২৭ আগস্ট
নেপালের নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলীতে আকস্মিক ঢলের পর কাদা-ধ্বংসস্তূপে ঢেকে গেছে ঘরবাড়িসহ অন্যান্য স্থাপনা। ২৭ আগস্ট

নেপালে এক প্রধান শিক্ষকের দ্রুত সিদ্ধান্তে প্রাণ বাঁচল ৯০০ শিক্ষার্থীর

নেপালে প্রলয়ংকরী পাহাড়ি ঢলের হাত থেকে ৯০০ শিক্ষার্থীর জীবন বাঁচিয়েছেন একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তাঁর নাম রাজেন্দ্র দাওয়াদি। ঢলের পানি স্কুলে আঘাত হানার মাত্র ১০ মিনিট আগে তিনি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষার্থীদের সরিয়ে নেন।

নুয়াকোট জেলার ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র বিবিসিকে বলেন, স্থানীয় সময় গত বুধবার সকাল ৯টা ১০ মিনিটের দিকে তিনি ৪টি ফোনকল পান। ফোনকলগুলোতে তাঁকে ভয়াবহ এই দুর্যোগের বিষয়ে সতর্ক করা হয়। এরপর তিনি দ্রুত শিক্ষার্থীদের উঁচু জায়গায় চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। স্কুলমুখী শিক্ষার্থীবোঝাই বাসগুলোকে দ্রুত ফিরে যেতে বলেন।

রাজেন্দ্র বলেন, ‘আমরা দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিলে কিংবা আর ১০ মিনিট দেরি হলে আমিসহ শিক্ষার্থীদের কেউই আজ আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারত না।’

রাজেন্দ্র জানান, কয়েক মিনিটের ব্যবধানে চারজন পৃথক ব্যক্তি ফোন করে তাঁকে সতর্ক করায় পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে তাঁর সুবিধা হয়েছিল।

এ বিষয়ে রাজেন্দ্র বলেন, এক অভিভাবক এসে তাঁকে বলেছিলেন, ‘বড় বন্যা ধেয়ে আসছে। আমি আমার মেয়েকে নিয়ে যেতে এসেছি।’

কোনো জোরালো কারণ ছাড়া অভিভাবকেরা এভাবে স্কুলে ছুটে আসেন না বলে উল্লেখ করেন রাজেন্দ্র। তিনি বলেন, তাই তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে শিক্ষার্থীদের সরিয়ে নেওয়া উচিত।

নেপালের নুওয়াকোট জেলার ত্রিশূলীতে দুর্যোগের পর কাদায় প্রায় ডুবে গেছে একটি স্থাপনা। ২৬ আগস্ট

রাজেন্দ্র বলেন, ‘আমি আর দেরি না করার সিদ্ধান্ত নিই। এমনকি ঢল না এলেও সর্বোচ্চ এক দিনের ক্লাসই হয়তো নষ্ট হতো। এত মানুষের জীবন বাঁচাতে পেরেছি, এর জন্য আমি গর্বিত।’

বুধবারের ভয়াবহ পাহাড়ি ঢলে নেপালের কয়েকটি এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপালে এখন পর্যন্ত অন্তত ৯০৩ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। নিখোঁজ ৪ হাজার ২৪৭ জন। বৈরী পরিস্থিতির মধ্যে উদ্ধার তৎপরতা চলছে।

ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভবনটি কাদা ও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে। রাজেন্দ্র জানান, নদী থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে থাকা বিদ্যালয়ের একটি ছাত্রাবাসও মুহূর্তের মধ্যে ঢলের পানিতে তলিয়ে যায়।

শুরুতে অনেক শিক্ষার্থীও পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পারেনি। ১৬ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইউনিশা আমাত্য বলে, ঢল আঘাত হানার ঠিক আগে সে তার বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যায়।

ইউনিশা বলে, ‘মাত্র ১০ সেকেন্ডের জন্য আমি আর আমার বন্ধুরা প্রাণে বেঁচে গেছি।’

ইউনিশা আরও বলে, ঢল আসার ঠিক আগে তারা শ্রেণিকক্ষে পড়ছিল। শিক্ষকেরা এক জায়গায় জড়ো হয়েছিলেন। শুরুতে কী ঘটছে, তা তাঁরা বুঝতে পারেননি। পাঁচ মিনিট পর শিক্ষকেরা এসে তাদের ঢলের কথা জানান। তাদের দ্রুত বাসায় চলে যেতে বলেন।

ঢলের কথা শুনে এক শিক্ষার্থী অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল বলে জানায় ইউনিশা। সে বলে, অনেক শিক্ষার্থী তখনো বিপদের মাত্রা বুঝতে পারেনি। তারা গণিতের ক্লাসে থাকা সহপাঠীদের জন্য অপেক্ষা করছিল। পরে ইউনিশা ও তাঁর বন্ধুরা বিদ্যালয়ের পেছনের একটি পথ ধরে দ্রুত পাহাড়ের দিকে উঠে যায়।

পানির তোড়ে নদীর তীরের জনবসতিগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অনেক জায়গায় আস্ত গ্রাম ভেসে গেছে

ইউনিশা বলে, ‘আমি দ্রুত হাঁটতে পারছিলাম না। বন্ধুরা আমাকে পাহাড়ের দিকে উঠতে সাহায্য করেছিল। আমরা দ্রুত নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। বিদ্যালয়ের পেছন দিকের একটি সরু সিঁড়ি দিয়ে আমরা বেরিয়ে গিয়েছিলাম। চোখের সামনে মুহূর্তের মধ্যে স্থানীয় বাজারটি পানির তোড়ে ভেসে যায়।’

শিক্ষার্থী-শিক্ষকেরা প্রথমে কয়েক শ মিটার পাহাড়ে উঠে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন। পরে পাশের একটি গ্রামে চলে যান। ঢলে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় তাঁদের অনেকেই দুই রাত সেখানে আটকে ছিলেন। পরে উদ্ধারকারী দল তাঁদের কাছে পৌঁছায়।

প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র ও শিক্ষার্থী ইউনিশা—দুজনের বাড়িই বিদ্যালয় থেকে নদীর ওপারে। শেষ পর্যন্ত তাঁদের হেলিকপ্টারে বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

এদিকে সন্তানেরা বেঁচে আছে কি না, তা জানতে উৎকণ্ঠায় ছিলেন অভিভাবকেরাও। ইউনিশার মা সাবিনা কুমারী শ্রেষ্ঠা বলেন, তিনি বারবার মেয়ের ও স্বামীর ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু কারও সঙ্গেই যোগাযোগ করতে পারছিলেন না।

ইউনিশার বাবা যুবরাজ আমাত্য খবর পেয়েই মেয়ের স্কুলের দিকে রওনা হন। তিনি বলেন, ‘ঢলের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই আমি মেয়ের ফোনে কল দিই। কিন্তু ওকে ফোনে পাচ্ছিলাম না। ভীষণ ভয় পেয়ে যাই। কয়েক মিনিটের মধ্যেই মেয়ের স্কুলের দিকে ছুটে যাই। গিয়ে দেখি, ত্রিশূলী বাজার পুরোপুরি ভেসে গেছে। তখন মনে হয়েছিল, আমার মেয়ে হয়তো আর বেঁচে নেই। আমি খুব আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। স্কুটার থামিয়ে ফেলি। চারদিকে পানি, কিন্তু মেয়েকে ছাড়া ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতেই পারছিলাম না।’

আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর লিখু নদীর তীরে বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি। গতকাল নেপালের নুয়াকোট জেলার দেবঘাটে

মেয়ে বেঁচে আছে কি না, যুবরাজ প্রায় এক ঘণ্টা ধরে সেটা জানতেন না। বারবার ফোন করেও তিনি মেয়ের সাড়া পাননি। অবশেষে ফোনটি সংযোগ পায়। ওপাশ থেকে ইউনিশা ফোন ধরে।

যুবরাজ বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত আমার মেয়ে ফোন ধরল। আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি, কেঁদে ফেলি। সঙ্গে থাকা দুজন আত্মীয়ও কাঁদতে কাঁদতে আমাকে জড়িয়ে ধরেন।’

প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র বলেন, আরও কার্যকর সতর্কীকরণ ব্যবস্থা থাকলে এলাকার বাসিন্দারা আরও আগে সাড়া দিতে পারতেন। তবে তিনি মনে করেন, তাঁর দ্রুত সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপে বড় বিপর্যয় এড়ানো গেছে।