
১৯৮৮ সালে মাত্র চার বছর বয়সে অপহরণের শিকার হয়েছিলেন চীনা নাগরিক লি জিংওয়ে। অপহৃত হন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইয়ুনান প্রদেশে নিজের গ্রাম থেকে। অপহরণকারী ব্যক্তি ছিলেন লির পরিবারের পূর্বপরিচিত। তিসি নামের ওই ব্যক্তি অন্য এক পরিবারের কাছে লিকে হস্তান্তর করেন। তখন থেকেই হেনান প্রদেশের মধ্যাঞ্চলীয় একটি এলাকায় সেই পরিবারের সঙ্গে থাকতে শুরু করেন লি। তবে তাঁর মন পড়ে থাকত ফেলে আসা নিজের গ্রামে। সেখানকার স্মৃতি হাতড়ে ৩০ বছরের বেশি সময় পার হয়ে যায়। অবশেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্রচার এবং নিজের স্মৃতি থেকে আঁকা খসড়া মানচিত্রের বদৌলতে সম্প্রতি নিজের মা-বাবার সঙ্গে দেখা হয়েছে লির। চীনা একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে লির সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা ছাপিয়েছে মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন।
অপহরণের সময় বয়সে ছোট থাকলেও লি বুঝতে পেরেছিলেন তাঁকে পরিবার থেকে অনেক দূরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বড় হওয়ার পরও নিজ গ্রামে ফেরার উপায় ছিল না তাঁর। কারণ, জন্মের সময় দেওয়া নাম, নিজের মা-বাবার নাম, গ্রামের নাম—কিছুই মনে করতে পারছিলেন না লি। তবে গ্রামের বাড়ি দেখতে কেমন ছিল, তা মনে করতে পারতেন তিনি। সেখানে গাছপালা ছিল, গরু চরত, আঁকাবাঁকা রাস্তা ছিল, বহমান নদী ছিল। তাঁর মনে আছে, বাড়ির পাশে ধানখেত ও পুকুর ছিল। পাশের পাহাড়েই জন্মাত বাঁশকোরল। ছোটবেলায় যখনই নিজের বাড়ির কথা মনে পড়ত, তখনই তিনি তাঁর গ্রামের ছবি আঁকতেন। দিনে অন্তত একবার হলেও ছবি আঁকতেন তিনি।
চীনে শিশু অপহরণের ঘটনা দীর্ঘদিনের সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে চীনে চালু থাকা এক সন্তান নীতির কারণে এ সংকট তৈরি হয়। এ নীতির আওতায় চীনে একাধিক সন্তান জন্ম দিলে ওই দম্পতিকে বিপুল জরিমানা গুনতে হতো। দ্বিতীয় সন্তান ধারণ করলে গর্ভপাতে বাধ্য হতেন তাঁরা। তবে এখন সে নীতি শিথিল করা হয়েছে।
অনেক চীনা পরিবার, বিশেষ করে গ্রাম এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলো প্রথাগতভাবে ছেলেসন্তানকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তারা মনে করে, ছেলেরাই পারিবারিক ধারা টেনে নিয়ে যায়। একদিকে কম জন্মহার, অন্যদিকে ছেলেশিশুদের চাহিদা থাকায় তাদের অবৈধভাবে বেচাবিক্রির বাজার শুরু হয়ে যায়। আবার অনেক পরিবার তাদের মেয়েশিশুদের দত্তক দিতে শুরু করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও পুলিশ বিভাগের তৎপরতার বদৌলতে বেশ কয়েকজন অপহৃত ব্যক্তি তাঁদের পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলিত হয়েছেন। শৈশবে অপহরণের শিকার হওয়া এসব ব্যক্তি এখন প্রাপ্তবয়স্ক। গত গ্রীষ্মে গুয়ো জিনজেন নামের এক ব্যক্তিকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি ১৯৯৭ সালে দুই বছর বয়সে অপহরণের শিকার হয়েছিলেন। তাঁকে দেশজুড়ে মরিয়া হয়ে খুঁজে বেড়িয়েছেন জন্মদাতা মা-বাবা। গুয়োর অপহরণ, তাঁর মা-বাবার তৎপরতা এবং তাঁদের পুনর্মিলিত হওয়ার এ গল্প অবলম্বনে চীনে একটি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে।
এ ঘটনার পর লি নিজেও তাঁর মা-বাবাকে খুঁজতে অনুপ্রাণিত হন। শৈশবের স্মৃতি মনে করে নিজের গ্রামের একটি খসড়া মানচিত্র আঁকেন তিনি। সেখানে স্কেচ করে গ্রামের পথঘাট, কোথায় কী ছিল, তা দেখিয়েছেন তিনি। এরপর সে ছবি সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করেন।
চীনা ভিডিও প্ল্যাটফর্ম দয়িনে লির বক্তব্যের একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। সেখানে লি বলেন, ‘অনেক বছর কেটে গেছে। আমি জানি না পরিবারের কেউ আমাকে খুঁজছে কি না।’ ওই ভিডিওতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার প্রবল ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করেন লি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর আঁকা ছবি ব্যাপক শেয়ার হয়। তা জননিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। শৈশবে অপহৃত হওয়া মানুষকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে এ মন্ত্রণালয় তদন্তের কাজ করে থাকে। দ্রুতই কর্তৃপক্ষ ইয়ুনান প্রদেশের ঝাওতংয়ে লির সম্ভাব্য জন্মদাত্রী মাকে চিহ্নিত করে। তাঁদের সম্পর্ক নিশ্চিত হতে দুজনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়। গত ২৮ ডিসেম্বর প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায় তাঁদের ডিএনএ মিলে গেছে।
ডিএনএ মিলে যাওয়ার পর লি তাঁর মায়ের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেন। সঙ্গে সঙ্গেই মাকে চিনতে পারেন তিনি। লি বলেন, ‘আমার মা আর আমার ঠোঁটগুলো একই রকমের। এমনকি আমাদের দাঁতও একই।’
সেই ভিডিও রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে শেয়ার করা হয়। সেখানে দেখা যায়, লি তাঁর মায়ের পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ নিচ্ছেন এবং তাঁরা কাঁদতে কাঁদতে একে অপরকে জড়িয়ে ধরছেন। তখন লির পরিবারের অন্য সদস্য ও সমর্থকদের সেখানে দেখা গেছে। দ্য পেপারকে দেওযা সাক্ষাৎকারে তাঁর মা বলেন, ‘অবশেষে আমি আমার সন্তানকে খুঁজে পেয়েছি।’
ভিডিও কলে কথা বলার বেশ কিছুদিন পর ১ জানুয়ারি সকালে হেনান প্রদেশের একটি পুলিশ স্টেশনে মা-ছেলে পুনর্মিলিত হন। তদন্ত চালানোর কারণে জননিরাপত্তা দপ্তরকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তাঁরা। লির আঁকা মানচিত্র দেখে গ্রাম খুঁজতে সহযোগিতা করেছেন স্বেচ্ছাসেবী ও অনলাইন ব্যবহারকারীরা।
লি আগামী ফেব্রুয়ারিতে মায়ের সঙ্গে লুনার নববর্ষ উদ্যাপনের পরিকল্পনা করছেন। বাবার সমাধি দেখতে ইয়ুনানে ফিরতে চান তিনি।