
ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন হামলায় সহায়তা করার জন্য ব্রিটিশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি বলে জানতে পেরেছে বিবিসি।
এর আগে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে হামলা চালানোর জন্য যুক্তরাজ্যের গ্লুচেস্টারশায়ারের ‘আরএএফ (রয়্যাল এয়ারফোর্স) ফেয়ারফোর্ড’ বিমানঘাঁটি এবং ভারত মহাসাগরে অবস্থিত যুক্তরাজ্যের ভূখণ্ড দিয়েগো গার্সিয়াও ব্যবহার করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চাগোস দ্বীপপুঞ্জ মরিশাসকে হস্তান্তর এবং সেখানে থাকা যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক ঘাঁটি লিজ নেওয়ার চুক্তি করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। কিন্তু যুক্তরাজ্য তাদের সামরিক ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় সম্প্রতি এ চুক্তির সমালোচনা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এ প্রসঙ্গে যুক্তরাজ্য সরকারের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ‘নিয়মানুসারে আমরা সামরিক অভিযানসংক্রান্ত কোনো বিষয়ে মন্তব্য করি না।’
পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে রাজি হওয়ার জন্য ইরানের ওপর বেশ কিছুদিন ধরেই চাপ দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র।
এ নিয়ে চুক্তি করতে ব্যর্থ হলে ইরানে হামলার হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সম্ভাব্য এ হামলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম সম্প্রতি মোতায়েন করেছে তারা।
ট্রাম্প গতকাল বৃহস্পতিবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাবে নাকি সামরিক ব্যবস্থা নেবে, তা বিশ্ববাসী ‘সম্ভবত আগামী ১০ দিনের মধ্যে’ জানতে পারবে।
একই সময় সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে চলা আলোচনায় কিছু অগ্রগতির খবরও পাওয়া গেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাবে নাকি সামরিক ব্যবস্থা নেবে, তা বিশ্ববাসী ‘সম্ভবত আগামী ১০ দিনের মধ্যে’ জানতে পারবে।
ব্রিটিশ সরকারের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া চলমান, যা যুক্তরাজ্য সমর্থন করে।’
‘ইরান যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, আর এই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার।’
চাগোস চুক্তিতে মার্কিন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন দেওয়ার পর গত মঙ্গলবার ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন কিয়ার স্টারমার।
দ্য টাইমস জানায়, এ দুই নেতার মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ট্রাম্পের আলটিমেটাম সম্পর্কে আলোচনা হয়েছিল। এর ঠিক পরের দিনই চাগোস চুক্তির কড়া সমালোচনা করে বিবৃতি দেন ট্রাম্প।
কিয়ার স্টারমারকে এখন শক্ত অবস্থানে থাকতে হবে। মার্কিন বাহিনীর যুক্তরাজ্যের ঘাঁটি ব্যবহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পার্লামেন্টে ভোটাভুটি আয়োজন করতে হবে।এড ডেভি, যুক্তরাজ্যের লিবারেল ডেমোক্র্যাট নেতা
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, চাগোস দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে বড় দ্বীপ দিয়েগো গার্সিয়া থেকে ইরানে সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন। এ কারণেই হয়তো দ্বীপটির কৌশলগত গুরুত্ব নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বোঝাপড়ায় পরিবর্তন এসেছে।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এ বিষয় উল্লেখ করে বলেন, ‘ইরান যদি চুক্তিতে না আসার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে একটি অত্যন্ত অস্থিতিশীল ও বিপজ্জনক শাসকগোষ্ঠীর সম্ভাব্য হামলা রুখতে যুক্তরাষ্ট্রের দিয়েগো গার্সিয়া এবং ফেয়ারফোর্ডের বিমানঘাঁটি ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে।’
গত বছর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের চালানো হামলায় আরএএফ ফেয়ারফোর্ড বা দিয়েগো গার্সিয়া কোনোটিই ব্যবহার করা হয়নি।
ওই সময় যুক্তরাজ্যের এক জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা সূত্র জানিয়েছিল, ওয়াশিংটন এ ব্যাপারে কোনো অনুমতি চায়নি।
চলতি বছরের শুরুর দিকে ‘বেলা ১’ নামের একটি নিবন্ধিত ট্যাংকার জব্দ করার সামরিক অভিযানে সহায়তা করতে যুক্তরাষ্ট্র সর্বশেষ আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ও অন্যান্য ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করেছিল।
তবে সেই অভিযানটি যুক্তরাজ্যের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে পরিচালিত হয়েছিল। সে সময় ব্রিটিশ মন্ত্রীরা বলেছিলেন, অভিযানটি আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে যৌক্তিক ছিল।
ইরানে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপে সমর্থন দেওয়ার যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে যুক্তরাজ্য সরকারকে সম্ভবত আন্তর্জাতিক আইনের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে।
এক দীর্ঘস্থায়ী চুক্তি অনুযায়ী, সামরিক অভিযান পরিচালনার আগে যুক্তরাজ্যের যেকোনো সার্বভৌম সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে অনুরোধ জানাতে হবে।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, হামলাকারী রাষ্ট্র এবং তাদের সমর্থনকারী রাষ্ট্রের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। বিশেষ করে সমর্থনকারী রাষ্ট্র যদি ‘আন্তর্জাতিকভাবে বেআইনি কাজের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত থাকে’।
গত জানুয়ারিতে বিবিসির রাজনীতিবিষয়ক সম্পাদক ক্রিস মেসন কিয়ার স্টারমারকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন হামলা সমর্থন করেন কি না।
সে সময় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উত্তর দিয়েছিলেন, কীভাবে ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি এবং বিক্ষোভকারী হত্যা থেকে বিরত রাখা যায়, তা নিয়ে মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা করছেন তিনি।
স্টারমার আরও বলেছিলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো, ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অবশ্যই তাদের (ইরানের) বিক্ষোভকারীদের দমন ও হত্যার বিষয়ও আমাদের মোকাবিলা করতে হবে। যা ঘটছে তা ভয়াবহ। তাই সেখানে আমাদের মনোযোগ নিবদ্ধ রয়েছে। আমরা সে লক্ষ্যে মিত্রদের সঙ্গে একজোট হয়ে কাজ করছি।’
সর্বশেষ পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের সমালোচক ও লিবারেল ডেমোক্র্যাট নেতা এড ডেভি বলেন, ‘এটি এখন স্পষ্ট যে একতরফা সামরিক পদক্ষেপ নিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প দিয়েগো গার্সিয়ার মতো যুক্তরাজ্যের ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করতে ব্রিটিশ সরকারকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছেন।’
‘কিয়ার স্টারমারকে এখন শক্ত অবস্থানে থাকতে হবে। মার্কিন বাহিনীর যুক্তরাজ্যের ঘাঁটি ব্যবহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পার্লামেন্টে ভোটাভুটি আয়োজন করতে হবে।’