ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে মূল লড়াই হচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে মূল লড়াই হচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল না বিজেপি, ভোটের জরিপ কী বলছে

ব্যাপক ধরপাকড়, পুলিশ ও প্রশাসনে ঢালাও বদলি, জেলায় জেলায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর রুট মার্চ ও যুযুধান দুই শিবিরের মারদাঙ্গা ভাষণ—এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের ভোটচিত্র এমনই। যেখানে যাচ্ছি, যার সঙ্গে কথা বলছি, একটাই প্রশ্ন শুনতে হচ্ছে, ‘কী বুঝছেন বলুন তো? কী মনে হচ্ছে এবার? আরও একবার দিদি, নাকি দিল্লি?’

সত্যি বলতে কী, কলকাতা শহরের দীর্ঘস্থায়ী বাসিন্দাদের কারও কাছেই এই প্রশ্নের সদুত্তর নেই। তৃণমূল ও বিজেপির ঘোর আশাবাদীরা ছাড়া কেউ বুক ঠুকে বলতে পারছেন না শেষ হাসি কে হাসবেন। নরেন্দ্র মোদি–অমিত শাহ নাকি মমতা–অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

গ্রামবাংলার মাঠঘাটে মাঘের শীতে ঝুলে থাকা কুয়াশার আস্তরণের মতো রাজ্যজুড়ে অনিশ্চয়তার এই চাদর বিছিয়েছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমার। এবারের ভোটে শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান চ্যালেঞ্জার তিনিই। শুধু বিজেপি নয়, চতুর্থবারের মতো ক্ষমতাসীন হতে গেলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারাতে হবে ইসিকেও। এবারের ভোটে তিনিই সবচেয়ে জটিল হেঁয়ালি।

এই অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে ভোটের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। আগামী বুধবার প্রথম দফার ভোটের আগে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের মানুষকে অভয় দিতে রাজ্য দাপাচ্ছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। জ্ঞানেশ কুমারের হুকুমে গোটা রাজ্যে মোতায়েন রয়েছে ২ হাজার ৫৫০ কোম্পানি। একেক কোম্পানির বহর ১০০ থেকে ১২০ জন জওয়ান। পাটিগণিতের সহজ হিসাবে, তার মানে, নয় নয় করেও পৌনে তিন লাখ জওয়ান রাজ্যে হাজির। ভয় ধরানো সাঁজোয়া গাড়ি হাঁকিয়ে ধীরগতিতে যাচ্ছি–যাব ঢংয়ে পথপরিক্রমার মধ্য দিয়ে নিরুচ্চারে তাঁরা যেন বলছেন, ভয় নেই। আমরা আছি। আগামী বুধবার উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের ১৬ জেলার ১৫২ আসনে প্রথম দফার ভোট। কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, দুই চব্বিশ পরগণা, নদিয়া ও পূর্ব বর্ধমান জেলার ১৪২ আসনে দ্বিতীয় দফার ভোট ২৯ এপ্রিল। ৪ মে যাবতীয় আগ্রহ, অপেক্ষা, উত্তেজনা ও উৎকণ্ঠার অবসান। ফলাফল ওই দিনই।

এই অনিশ্চিত আবহের চিত্র ধরা পড়েছে বিভিন্ন জরিপের ফলাফলেও। ভোট গ্রহণের দুই দিন আগেও কেউ নিশ্চিত নয় কে জিতবে কে হারবে। আজ মঙ্গলবার টাইমস অব ইন্ডিয়া বিভিন্ন জরিপ দলের এমন একটা কোলাজ প্রকাশ করেছে, যা সেই হেঁয়ালি ও রহস্য আরও প্রকট করেছে। কারও সমীক্ষায় তৃণমূল এগিয়ে, কারও মতে বিজেপি, কেউবা গায়ে গায়ে রেখেছে দুই শিবিরকেই।

যেমন সি ভোটারকে সঙ্গে নিয়ে টাইমস নাউ ও এবিপি দুই গণমাধ্যম গোষ্ঠীই সমীক্ষা চালিয়েছে। দুজনেরই ফল এক রকম। ২৯৪ আসনের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস পাচ্ছে ১৫৮, বিজেপি ১১৫, সিপিএম–কংগ্রেস ১৯। পি মার্কের সমীক্ষাও প্রায় সি ভোটারের জলছবি। তাদের সমীক্ষা দেখাচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস ১৫৮, বিজেপি একটু বেড়ে ১২০, সিপিএম, কংগ্রেস সামান্য কমে ১৪। সরকার গড়তে প্রয়োজন ১৪৮ জনের সমর্থন।

ইন্ডিয়া টুডে–অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়ার সমীক্ষা অনুযায়ী লড়াই এবার ক্ষুরধার। যাকে বলে কিনা ‘কাঁটে কি টক্কর’ (ক্ষুরধার লড়াই)। এদের হিসাবে বিজেপি ১৪৭, তৃণমূল কংগ্রেস ১৪৩, সিপিএম–কংগ্রেস মাত্র ২। রিপাবলিক–সিএনএক্সের ছবিও মোটামুটি ওই রকম। বিজেপি ১৪৩, তৃণমূল কংগ্রেস ১৩৩, সিপিএম+১৬। ইটিজি রিসার্চ নামে এক সংস্থা তৃণমূলের হাসি চওড়া করার পক্ষে যথেষ্ট। তাদের মতে, মমতার দল পাচ্ছে ১৬৯, মোদির দল ১১০। ইপসোস সংস্থা তৃণমূলকে ১৫০ দিয়েছে, বিজেপিকে ১১৫, সিপিএম+ ১৯। পোলস্টার্ট সংস্থার হিসেবে তৃণমূলের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে বিজেপি। প্রথম জন ১৪৭, দ্বিতীয় জন ১৩০, সিপিএম+ ১৫।

তবে দুঃসাহসী ফল দেখিয়েছে ইন্ডিয়া টিভি গোষ্ঠী। তাদের সমীক্ষা অনুযায়ী বিজেপি পাচ্ছে ১৯২, তৃণমূল কংগ্রেস ৮৮, সিপিএম+ ১২টি। মনে রাখতে হবে, কিছুদিন আগেই রাজ্য নেতৃত্বকে অমিত শাহ বলেছিলেন, তাঁর হিসাবে জয় হবে ১৭৬ আসনে। সে জায়গায় ১৯২ অতিরিক্ত বোনাস পাওয়ার শামিল। ফল এমন হলে বিহারের এসআইআরকেও হার মানাবে পশ্চিমবঙ্গ। সে ক্ষেত্রে মোদি–শাহ নন, কলার তুলে হাঁটবেন একজনই। জ্ঞানেশ কুমার।

এসব সমীক্ষার গড় করে পোল অব পোলস ত্রিশঙ্কু বা ঝুলন্ত বিধানসভার ছবি এঁকেছে। তৃণমূল ১৪১, বিজেপি ১৩৮, সিপিএম+ ১৩। ফল এমন হলে ইদানীং চালু হওয়া এক রসিকতা, যা কিনা প্রায় বিশ্বাসের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, তা প্রাধান্য পাবে। ‘ভোটে যারাই জিতুক সরকার গড়বে বিজেপি।’ অমিত শাহ এই প্রবাদকে বারবার সত্য প্রতিপন্ন করেছেন।

অমিত শাহ প্রতিটি জনসভায় নিয়ম করে বলছেন, ভোটে যারা গুন্ডামি করবে, বিজেপি তাদের উল্টো ঝুলিয়ে সোজা করবে। বিজেপি সরকার গড়লে সেই দাওয়াইয়ের হাত থেকে প্রতিপক্ষের কেউই কি রক্ষা পাবে?

ভোটের দুই দিন আগেও মহা সাসপেন্সের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ ছেয়ে রেখেছে অগুনতি ‘যদি’ ও ‘কিন্তু’।