নরেন্দ্র মোদি ও রাহুল গান্ধী
নরেন্দ্র মোদি ও রাহুল গান্ধী

ভারতের সংসদে নারী আসন সংরক্ষণ বিল পরাস্ত, বড় হার বিজেপির

ভারতের সংসদে বড় একটা ধাক্কা খেল ক্ষমতাসীন বিজেপি। তারা প্রবল উৎসাহে নারী আসন সংরক্ষণ এবং সেই সঙ্গে সংসদের আসন বৃদ্ধিসংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী বিল এনেছিল। কিন্তু বিরোধীদের সম্মিলিত প্রতিরোধে তা খারিজ হয়ে গেল। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শুরু হওয়া এ নিয়ে আলোচনা আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় লোকসভায় ভোটাভুটিতে পরাস্ত হয়। বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের কাছে এটা এক বড় ধাক্কা। বিলগুলো প্রয়োজনীয় দুই–তৃতীয়াংশ সদস্যদের সমর্থন পায়নি।

ভোটাভুটিতে মোট ৫২৮ জন সদস্য অংশ নেন। বিলের পক্ষে পড়ে ২৯৮ ভোট, বিপক্ষে ২৩০। মূল বিলটি খারিজ হওয়ায় এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য দুই বিল প্রত্যাহৃত হয়।

বিরোধীরা শুরু থেকেই বিজেপির এই তৎপরতার বিরোধিতা করে আসছে। দুই দিনের বিতর্কে বিরোধীরা বারবার সরকারকে মনে করিয়ে দেয়, তারা নারীদের জন্য সংসদ ও বিধানসভায় ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের পক্ষে। এ কারণেই ২০২৩ সালে নারী সংরক্ষণ বিল সর্বসম্মতভাবে পাস হয়েছিল। কিন্তু এবার তারা বিরোধিতা করছে, যেহেতু নারী সংরক্ষণের নামে বিজেপি পেছনের দরজা দিয়ে সংসদের বহর বাড়িয়ে ক্ষমতায় থাকার পাকাপাকি বন্দোবস্ত করতে চাইছে। প্রত্যেকেই বলে, বিজেপির এই বাসনা তারা চরিতার্থ হতে দেবে না।

তিন বছর আগে তৈরি আইন। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার রাতে হঠাৎই কার্যকর করার নির্দেশ জারি করা হয়। তাতে বলা হয়েছিল, ২০২৬ সালের জনগণনার ভিত্তিতে সংসদ ও বিধানসভার ক্ষেত্র পুনর্বিন্যাসের পর ওই সংরক্ষণ কার্যকর হবে। সেই হিসেবে নারী সংরক্ষণ ২০৩৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে কার্যকর হওয়া কঠিন ছিল। তিন বছর বসে থাকার পর হঠাৎই কেন্দ্রীয় সরকার সংবিধান সংশোধনের মধ্য দিয়ে ২০২৯ সালের নির্বাচনেই সেই সংরক্ষণ চালু করতে উদ্যোগী হয়। তা করতে গিয়ে নতুন বিলে প্রস্তাব করা হয়, ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে আসন পুনর্বিন্যাস করা হবে এবং প্রতিটি রাজ্যের লোকসভার আসনসংখ্যা বর্তমান হিসাবের নিরিখে ৫০ শতাংশ বাড়ানো হবে। এই হিসাবে লোকসভার মোট সদস্যসংখ্যা ৫৪৩ থেকে বেড়ে হবে ৮৫০। এর এক–তৃতীয়াংশ ২৭২টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত হবে। কোন আসনগুলো, তা ঠিক করবে সীমান্ত পুনর্নির্ধারণ কমিশন।

বিরোধীরা এর বিরোধিতাতেই জোটবদ্ধ হয়। এই প্রথম ‘ইন্ডিয়া’ জোটের মধ্যে এমন জমাট ঐক্য দেখা দিল। শুধু তা–ই নয়, পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর মতো দুই বড় রাজ্যে বিধানসভার ভোটের মধ্যে সংসদের তিন দিনের বিশেষ অধিবেশন ডাকা হলেও প্রচার ছেড়ে সাংসদেরা দিল্লি এসে বিলের বিরোধিতা করেন। ১৫ বছরে সংসদে গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস করার ক্ষেত্রে এই প্রথম বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটকে হারতে হলো।

বিজেপি অবশ্য ভেবেচিন্তেই এই ঝুঁকিটা নিয়েছিল। তারা ভেবেছিল, জিতলে পাকাপাকি ক্ষমতায় থাকার ছাড়পত্র তারা আদায় করে ফেলবে, যেহেতু উত্তরের হিন্দিভাষী রাজ্যগুলোর আসন দক্ষিণ, উত্তর–পূর্ব ও ছোট রাজ্যগুলোর চেয়ে অনেক বেশি বৃদ্ধি পাবে। উত্তরের হিন্দি বলয় দখল করলেই ২০২৯ সালেও দিল্লি দখল নিশ্চিত। তা যদি না হয়, সংবিধান সংশোধন বিল পাস করাতে বিরোধীরা যদি সাহায্যের হাত না বাড়ায়, তা হলে তাদের নারীবিরোধী আখ্যা দিয়ে ভোটে জেতা যাবে। পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর ভোটের প্রচারে তো বটেই, পরেও তা বড় করে তুলে ধরা যাবে।

ভারতের নতুন পার্লামেন্ট ভবন

বিতর্কে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও সেই কথা বলেছেন। গত বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, দেশের কোটি কোটি নারী এই বিলের দিকে তাকিয়ে আছেন। অধিকার থেকে যারা তাদের বঞ্চিত করবে, নারী সমাজ তাদের কোনো দিন ক্ষমা করবে না। একই কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি বলেন, দেশের মা–বোনেরা কোনো দিন কংগ্রেস ও বিরোধীদের এই অপরাধের জন্য ক্ষমা করবেন না।

বিরোধী দলগুলো অবশ্য ওই হুমকিতে ভয় পায়নি। দুই দিনের বিতর্কে প্রতিটি দলের নেতারাই বলেছেন, সরকার চাইলে লোকসভার বর্তমান আসনসংখ্যার এক–তৃতীয়াংশ ২০২৯ সালের মধ্যেই অনায়াসে নারীদের জন্য সংরক্ষণ করা যায়। সংরক্ষণের জন্য আসনসংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজনই নেই। কিন্তু বিজেপি চাইছে আসন বাড়ানোর মধ্য দিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে সংসদ দখল করতে। তা হতে দেওয়া যাবে না।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে কংগ্রেস সদস্য শশী থারুর বলেন, নোট বাতিল নিয়েও এমনই তাড়াহুড়া করেছিলেন। ফল কী হয়েছে তা সবার জানা। এই বিল নিয়েও এমনই তাড়াহুড়া করছেন। এই পদক্ষেপ বিপজ্জনক। বিজেপির ৫০ শতাংশ সূত্র ধরে সংসদের আসন বাড়ানোর প্রস্তাবে দক্ষিণের সব রাজ্যই অরাজি। যদিও এনডিএর শরিক অন্ধ্র প্রদেশের টিডিপি বিলটি সমর্থন করেছে।

আজ বিকেলে বিলের বিরোধিতায় ভাষণ দেন লোকসভার বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী। বিজেপির উদ্দেশে তিনি বলেন, ক্ষমতা কমে আসছে বলে ভোট মানচিত্র বদলে তারা উঠেপড়ে নেমেছে। কিন্তু বিরোধীরা তা সফল হতে দেবে না। সবাই মিলে বিলের পতন ঘটাবে। প্রধানমন্ত্রীর নাম না করে রাহুল তাঁকে ‘জাদুকর’ বলেও উল্লেখ করেন, যিনি একটা সময় সেই ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন ও নিজের জালে ফেঁসে যান। স্পিকার ওম বিড়লাসহ সরকারপক্ষের সবাই রাহুলকে বাধা দেন। তাঁর ভাষণের অনেকটাই সভার কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হয়।