
ভারতের সঙ্গে গত সোমবার একটি বাণিজ্যচুক্তির ঘোষণা দেওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই চুক্তির অংশ হিসেবে নয়াদিল্লি রাশিয়ার জ্বালানি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে।
ট্রাম্পের দাবি, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এর পরিবর্তে ভারত যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলা থেকে অপরিশোধিত তেল কিনবে।
উল্লেখ্য, গত জানুয়ারির শুরুতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে মার্কিন বিশেষ বাহিনী অভিযান চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তুলে নিয়ে যায়। এর পর থেকে দেশটির বিশাল তেলশিল্পের নিয়ন্ত্রণ কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের হাতে।
নয়াদিল্লির সঙ্গে চুক্তির বিনিময়ে ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর বিদ্যমান বাণিজ্য শুল্ক ৫০ থেকে কমিয়ে মাত্র ১৮ শতাংশে নামিয়ে এনেছেন। গত বছর ভারত রাশিয়ার তেল কেনার শাস্তি হিসেবে এই ৫০ শতাংশ শুল্কের অর্ধেক আরোপ করা হয়েছিল। হোয়াইট হাউসের মতে, রাশিয়ার তেল কেনার মাধ্যমে মূলত ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে অর্থায়ন করছে ভারত।
(রাশিয়া থেকে) তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হলে বিশ্বকে মারাত্মক পরিণতির মুখে পড়তে হবে। রাশিয়াকে তেলের বাজার থেকে বাইরে রাখার সামর্থ্য বিশ্বের নেইহরদীপ সিং, ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসবিষয়ক মন্ত্রী
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, গত সোমবারের পর থেকে ভারত এ পর্যন্ত রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ বা ভেনেজুয়েলার তেল গ্রহণ করার বিষয়ে জনসমক্ষে কোনো প্রতিশ্রুতির কথা নিশ্চিত করেনি। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, রাশিয়াও ভারতের কাছ থেকে এমন কোনো ইঙ্গিত পায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার তেলের বদলে ভেনেজুয়েলার তেল গ্রহণ করা মোটেও সহজ হবে না। জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, খরচ, ভৌগোলিক অবস্থান এবং তেলের ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের মতো বিষয়গুলো তেলের উৎস পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে জটিল করে তুলবে।
এখন প্রশ্ন হলো, ভারত কি সত্যিই রাশিয়ার তেল ছাড়তে পারবে? আর ভেনেজুয়েলার তেলে কি আদৌ সেই অভাব পূরণ করতে সক্ষম হবে?
ট্রাম্পের পরিকল্পনা কী
রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করতে ভারতকে কয়েক মাস ধরেই চাপ দিয়ে আসছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রুশ তেলের ওপর একটি নির্দিষ্ট মূল্যসীমা নির্ধারণ করে দেয়। মূলত যুদ্ধের জন্য রাশিয়ার অর্থ জোগাড়ের সক্ষমতা কমাতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
ফলে ভারতসহ অন্য দেশগুলো বিপুল পরিমাণে সস্তায় রাশিয়ার তেল কিনতে শুরু করে। যুদ্ধের আগে ভারত তাদের মোট তেলের মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ রাশিয়া থেকে সংগ্রহ করত। তবে যুদ্ধ শুরুর পর চীনের পর ভারতই রাশিয়ার তেলের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রাহক হয়ে ওঠে। বর্তমানে দেশটির মোট তেলের প্রায় ৩০ শতাংশই আসে রাশিয়া থেকে।
রাশিয়া থেকে তেল কেনার শাস্তিস্বরূপ গত বছর ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর বাণিজ্য শুল্ক ২৫ থেকে বাড়িয়ে দ্বিগুণ, অর্থাৎ ৫০ শতাংশ করেন। বছরের শেষ দিকে তিনি রাশিয়ার সবচেয়ে বড় দুটি তেল কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন এবং যারা এগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য করবে, তাদের ওপরও পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেন।
গত জানুয়ারির শুরুতে মার্কিন বিশেষ বাহিনী অভিযান চালিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে ট্রাম্প কার্যত দেশটির তেল খাতের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন। তেল বিক্রির মাধ্যমে আসা অর্থের প্রবাহও নিয়ন্ত্রণ করছেন তিনি।
ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেলের মজুত রয়েছে। এর পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার ৩০০ কোটি ব্যারেল। এটি বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের মজুতের চেয়েও পাঁচ গুণ।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভারতকে ভেনেজুয়েলার তেল কিনতে রাজি করানোটা মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গিতে অর্থবহ মনে হলেও এটি কার্যকর করা বেশ জটিল হতে পারে।
রাশিয়া থেকে কত ব্যারেল তেল আমদানি করে ভারত
বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্যমতে, ভারত বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১১ লাখ ব্যারেল রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল আমদানি করছে। ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে এ আমদানির পরিমাণ কমেছে। কারণ, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দৈনিক আমদানির গড় ছিল ১২ লাখ ১০ হাজার ব্যারেল এবং মাঝামাঝি সময়ে ছিল ২০ লাখ ব্যারেলের বেশি।
এক ব্যারেল অপরিশোধিত তেল সমান ১৫৯ লিটার (৪২ গ্যালন)। এই তেল পরিশোধনের পর সাধারণত তা থেকে প্রায় ৭৩ লিটার (১৯ গ্যালন) পেট্রল পাওয়া যায়। এ ছাড়া অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে বিমানের জ্বালানি থেকে শুরু করে প্লাস্টিক ও প্রসাধনীর মতো নানা ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য তৈরি করা হয়।
নয়াদিল্লির সঙ্গে চুক্তির বিনিময়ে ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর বিদ্যমান বাণিজ্য শুল্ক ৫০ থেকে কমিয়ে মাত্র ১৮ শতাংশে নামিয়ে এনেছেন। গত বছর ভারত রাশিয়ার তেল কেনার শাস্তি হিসেবে এই ৫০ শতাংশ শুল্কের অর্ধেক আরোপ করা হয়েছিল।
ভারত কি রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করেছে
গত এক বছরে ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনার পরিমাণ কমিয়ে আনলেও তা পুরোপুরি বন্ধ করেনি।
ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে গত আগস্টে ভারতীয় কর্মকর্তারা এক বিবৃতিতে রাশিয়ার তেলের বিষয়ে নয়াদিল্লিকে চাপ দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ভণ্ডামি’র কথা তুলে ধরেন।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল তখন বলেছিলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত শুরু হওয়ার পর প্রথাগত তেলের সরবরাহগুলো ইউরোপের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার কারণেই ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি শুরু করেছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভারতীয় গ্রাহকদের জন্য জ্বালানির সাশ্রয়ী ও স্থিতিশীল দাম নিশ্চিত করতেই রাশিয়ার তেল আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
তবে এমন অবস্থানের মধ্যেও খবর পাওয়া গেছে যে চীনের পর রাশিয়ার তেলের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা হিসেবে পরিচিত ভারতীয় শোধনাগারগুলো বর্তমানে নির্ধারিত ক্রয়াদেশ শেষ করার পর নতুন করে আর তেল কিনছে না।
রাশিয়ার তেল উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর ওপর গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম করপোরেশন লিমিটেড (এইচপিসিএল), ম্যাঙ্গালোর রিফাইনারি অ্যান্ড পেট্রোকেমিক্যালস লিমিটেড (এমআরপিএল) ও এইচপিসিএল-মিত্তাল এনার্জি লিমিটেডের (এইচএমইএল) মতো বড় শোধনাগারগুলো রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করে দিয়েছে।
ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন (আইওসি), ভারত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ও রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের মতো অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও শিগগিরই তেল কেনা বন্ধ করবে বলে জানা গেছে।
হঠাৎ রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করলে কী হবে
ভারত যদি রাশিয়া থেকে তেল আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করতেও চায়, তবে তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসবিষয়ক মন্ত্রী হরদীপ সিং সাংবাদিকদের বলেছিলেন, সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে তা জ্বালানির দাম ও মূল্যস্ফীতি তীব্রভাবে বাড়িয়ে দেবে। তিনি বলেন, ‘তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হলে বিশ্বকে মারাত্মক পরিণতির মুখে পড়তে হবে। রাশিয়াকে তেলের বাজার থেকে বাইরে রাখার সামর্থ্য বিশ্বের নেই।’
ভারত যদি রাশিয়া থেকে তেল কেনা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, তবে তা বাজারে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনবে। হুট করে সরবরাহ বন্ধ হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম একলাফে বাড়বে, যা ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবেজর্জ ভোলোশিন, প্যারিসভিত্তিক জ্বালানি বিশ্লেষক
বিশ্লেষকেরাও এ মতের সঙ্গে একমত। প্যারিসভিত্তিক জ্বালানি বিশ্লেষক জর্জ ভোলোশিন আল-জাজিরাকে বলেন, ‘ভারত যদি রাশিয়া থেকে তেল কেনা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, তবে তা বাজারে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনবে। হুট করে সরবরাহ বন্ধ হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম একলাফে বাড়বে, যা ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।’
ভোলোশিন আরও বলেন, ভারত মুখ ফিরিয়ে নিলে রাশিয়ার তেল সম্ভবত আরও বেশি করে চীনের দিকে চলে যাবে। পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞাভুক্ত তেল গোপনে সরবরাহকারী তথাকথিত ‘ছায়া’ ট্যাংকার বহরের ব্যবহারও বাড়তে পারে, যেসব জাহাজ ভুয়া পতাকা ব্যবহার করে এবং অবস্থান শনাক্তকারী যন্ত্র বন্ধ রেখে তেল পরিবহন করে।
এই বিশ্লেষক বলেন, এর ফলে মূলধারার ট্যাংকারগুলোর চাহিদা আটলান্টিক বেসিনের দিকে সরে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে জাহাজভাড়া বা ফ্রেইট চার্জ বেড়ে যেতে পারে।
কোটাক সিকিউরিটিজের ভাইস প্রেসিডেন্ট সুমিত পোখরানা জানান, গত দুই বছরে ভারতের তেল শোধনাগারগুলো ভালো মুনাফা করেছে। মূলত ছাড়ে পাওয়া রুশ তেলের কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে।
সুমিত আল-জাজিরাকে বলেন, ‘এখন যদি তারা (ভারত) যুক্তরাষ্ট্র বা ভেনেজুয়েলার মতো উচ্চ মূল্যের তেলের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে কাঁচামালের খরচ বেড়ে যাবে। এতে শোধনাগারগুলোর মুনাফা কমে আসবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে বাড়তি খরচের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ গ্রাহকদের ওপরই চাপাতে হতে পারে।’
ভারত কি রুশ তেল কেনা পুরোপুরি বন্ধ করতে পারবে
ভারতের পক্ষে রুশ তেল পুরোপুরি ত্যাগ করা সম্ভব না–ও হতে পারে। কারণ, ভারতের অন্যতম বেসরকারি শোধনাগার ‘নায়ারা এনার্জি’র মালিকানার সিংহভাগই রাশিয়ার এবং এটি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কবলে রয়েছে। এই কোম্পানিতে ৪৯ দশমিক ১৩ শতাংশ মালিকানা রাশিয়ার জ্বালানি প্রতিষ্ঠান ‘রসনেফট’-এর।
নায়ারা এনার্জি ভারতের গুজরাটে (প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নিজ রাজ্য) দৈনিক ৪ লাখ ব্যারেল সক্ষমতার একটি শোধনাগার পরিচালনা করে। রাশিয়া থেকে তেল আমদানিতে নায়ারা দ্বিতীয় অবস্থানে। গত জানুয়ারিতে দৈনিক প্রায় ৪ লাখ ৭১ হাজার ব্যারেল রুশ তেল কিনেছে তারা, যা ভারতে মোট রুশ তেল সরবরাহের প্রায় ৪০ শতাংশ। গত বছরের জুলাইয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার পর থেকে এ শোধনাগার পুরোপুরি রুশ তেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
ভারত যদি রাশিয়া থেকে তেল আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করতেও চায়, তবে তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য আগামী ১০ এপ্রিল থেকে এক মাসের বেশি সময় শোধনাগারটি বন্ধ থাকবে। তাই এপ্রিলে তারা কোনো রুশ তেল নেবে না। সুমিত পোখরানা মনে করেন, নায়ারার ভবিষ্যৎ এখন দোদুল্যমান। কারণ, রাশিয়ার সমর্থনপুষ্ট কোম্পানিটিকে তেল আমদানির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো বিশেষ ছাড় দেবে বলে মনে হয় না।
ভারত কি ভেনেজুয়েলার তেলে ফিরতে পারবে
অতীতে ভারত ভেনেজুয়েলার তেলের বড় ক্রেতা ছিল। ২০১৯ সালে ভারত প্রায় ৭২০ কোটি ডলারের তেল আমদানি করেছিল। এটি ছিল দেশটির মোট আমদানির প্রায় ৭ শতাংশ। ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর তা বন্ধ হয়ে যায়। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠান অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস করপোরেশনের (ওএনজিসি) কিছু কর্মকর্তা এখনো লাতিন আমেরিকার ওই দেশটিতে অবস্থান করছেন।
এখন ভারতের বড় শোধনাগারগুলো বলছে, বিকল্প হিসেবে সুবিধাজনক হলে তারা ভেনেজুয়েলার তেল আবার গ্রহণে আগ্রহী। তবে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। প্রথমত, ভেনেজুয়েলা থেকে ভারতের দূরত্ব রাশিয়ার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ এবং মধ্যপ্রাচ্যের তুলনায় ৫ গুণ। ফলে জাহাজভাড়া অনেক বেশি পড়বে।
দ্বিতীয়ত, ভেনেজুয়েলার তেলের দাম বেশি। জর্জ ভোলোশিন আল-জাজিরাকে বলেন, ‘রুশ ইউরাল তেলের ক্ষেত্রে ব্রেন্ট ক্রুডের চেয়ে ব্যারেলপ্রতি ১০ থেকে ২০ ডলার ছাড় পাওয়া যায়। কিন্তু ভেনেজুয়েলার তেলে এ ছাড় মাত্র ৫ থেকে ৮ ডলার।’
পোখরানা মনে করেন, রুশ তেলের ছাড় ছেড়ে ভেনেজুয়েলা থেকে তেল আমদানি করা ভারতের জন্য ব্যয়বহুল হবে। পরিবহন খরচ ও ছাড়ের হিসাব মেলালে ভারতকে ব্যারেলপ্রতি অতিরিক্ত ৬ থেকে ৮ ডলার গুনতে হতে পারে, যা আমদানি ব্যয়ের ক্ষেত্রে বিশাল বোঝা।
কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়া থেকে পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নিলে ভারতের বার্ষিক আমদানি ব্যয় ৯০০ কোটি থেকে ১ হাজার ১০০ কোটি ডলার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এ অর্থের পরিমাণ ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বাজেটের প্রায় সমান।
ভোলোশিন যুক্তি দেন যে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে ভেনেজুয়েলার তেলকে ব্যারেলপ্রতি অন্তত ১০ থেকে ১২ ডলার ছাড়ে বিক্রি করতে হবে। আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার দীর্ঘ পথ, উচ্চ বিমা খরচ এবং ভারী তেল পরিশোধনের বাড়তি ব্যয় মেটাতে এই বড় ছাড় প্রয়োজন।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো, ভারতের অনেক শোধনাগারের ভেনেজুয়েলার ভারী তেল পরিশোধনের সক্ষমতা নেই। ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল অত্যন্ত ভারী এবং এতে সালফারের মাত্রা বেশি থাকে। এটি আঠালো গুড়ের মতো ঘন, যা পরিশোধনের জন্য বিশেষায়িত ও জটিল শোধনাগার প্রয়োজন। ভারতের হাতে গোনা কয়েকটি শোধনাগারে শুধু এ সুবিধা রয়েছে।
জর্জ ভোলোশিন, প্যারিসভিত্তিক জ্বালানি বিশ্লেষক ব্লার্ব ৩: কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়া থেকে পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নিলে ভারতের বার্ষিক আমদানি ব্যয় ৯০০ কোটি থেকে ১ হাজার ১০০ কোটি ডলার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এ অর্থের পরিমাণ ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বাজেটের প্রায় সমান।
সুমিত পোখরানা আল-জাজিরাকে বলেন, ‘(ভেনেজুয়েলার তেলের ভারী প্রকৃতির কারণে) এটি শুধু জটিল ও আধুনিক শোধনাগারগুলোর জন্যই উপযোগী। ফলে পুরোনো ও ছোট শোধনাগারগুলো এ তেল ব্যবহার করতে পারবে না। এমন পরিবর্তন কার্যপ্রণালিগতভাবেও কঠিন এবং এর জন্য ভেনেজুয়েলার তেলের সঙ্গে আরও দামি হালকা তেল মেশানোর প্রয়োজন পড়বে।’
এরপর রয়েছে সরবরাহের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন। বর্তমানে ভেনেজুয়েলা তাদের সর্বোচ্চ সক্ষমতা দিয়ে চেষ্টা করলেও প্রতিদিন মাত্র ১০ লাখ ব্যারেলের মতো তেল উৎপাদন করতে পারে। দেশটির উৎপাদিত সব তেল যদি ভারতের কাছে পাঠানোও হয়, তারপরও তা রাশিয়া থেকে আমদানিকৃত মোট তেলের সমান হবে না।
ভারত আর কোথা থেকে তেল কিনতে পারে
ভারতের মন্ত্রী হরদীপ সিং জানিয়েছেন, জ্বালানি সংগ্রহের উৎস বৃদ্ধি করতে নয়াদিল্লি বর্তমানে প্রায় ৪০টি দেশের দিকে নজর দিচ্ছে।
রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমিয়ে আনার পাশাপাশি ভারত মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ও তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেক থেকে আমদানি বাড়িয়েছে। বর্তমানে ভারতের মোট তেল আমদানির প্রায় ২৭ শতাংশ আসছে রাশিয়া থেকে। অন্যদিকে ইরাক ও সৌদি আরবের নেতৃত্বে ওপেকভুক্ত দেশগুলো সরবরাহ করছে প্রায় ৫৩ শতাংশ তেল।
ট্রাম্পের শুরু করা বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাবে ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকেও তেল কেনা বাড়িয়েছে। ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ভারত যেখানে ৭১ লাখ টন মার্কিন অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছিল, ২০২৫ সালের একই সময়ে তা ৯২ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে।
তবে মার্কিন তেলের জন্যও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে হবে ভারতকে। কারণ, ২০২৮ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি ও পারমাণবিক পণ্য খাতে ৭৫০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছে ইউরোপ।