সম্রাট শাহজাহানের শাসনকাল নিয়ে এক মুসলিম সাধকের হিন্দু ভক্ত কী লিখেছিলেন

একটি টেরেসে বা উঁচু খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিকৃতিযুক্ত লকেট হাতে সম্রাট শাহজাহান। মোগল চিত্রশিল্পী চিতারমান ১৬৩০–১৬৫০ সালের মধ্যে এটি এঁকেছেন। এটি মোগল যুগের চিত্র ও প্রতিকৃতির একটি ঐতিহাসিক সংগ্রহ মিন্টো অ্যালবামের অংশ। চিত্রকর্মটি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্টে সংরক্ষিত আছে
ছবি: ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্য সরকারের একটি পিডিএফ থেকে স্ক্রিনশট

মোগল সাম্রাজ্য নিয়ে বর্তমানে জনপরিসরে যেসব আলোচনা হয়, সেখানে প্রায় সময় তৎকালীন নানা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘাতের বিষয়টি মুখ্য হয়ে ওঠে; কিন্তু ভারতের ১৭ শতকের সংরক্ষিত নথিপত্র অধিকাংশ ক্ষেত্রে আরও জটিল এক বাস্তবতার কথা বলছে।

আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত এমনই একটি নথি সপ্তদশ শতকের এমন এক সামাজিক জগতের আভাস দিচ্ছে, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক বাস্তবতা; কিন্তু তা সব সময় কঠোর বিভাজনরেখা হিসেবে কাজ করত না।

নথিটির নাম তাজকিরা-ই পীর হাস্সু তেলি। শাহজাহানের শাসনামলে ১৬৪৪ থেকে ১৬৪৭ সালের মধ্যে এটি লেখা হয়। এতে মুসলিম সাধক পীর হাস্সু তেলি এবং তাঁর উত্তরসূরিদের জীবন ও অলৌকিক ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। এটি লিখেছেন সুরত সিং নামে এক হিন্দু মোগল কর্মকর্তা। তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও ওই সাধকের ভক্ত ছিলেন।

কে ছিলেন সুরত সিং

সুরত সিং পাঞ্জাবের একটি কাম্বো পরিবারের সদস্য ছিলেন। তাঁর পূর্বপুরুষ ব্যবসায়ী ছিলেন। তবে ১৭ শতকের শুরুতে তাঁর পরিবারের সদস্যরা মোগল প্রশাসনের চাকরিতে যোগ দেন। তিনি বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে কাজ করেছেন এবং লাহোর, ভাটিন্ডা, কাবুল ও আগ্রায় দায়িত্ব পালন করেছেন।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সুরত সিং পীর হাস্সু তেলি এবং তাঁর উত্তরসূরি শেখ কামালকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি আধ্যাত্মিক ধারার শিষ্য হয়েছিলেন। তাই তাজকিরা-ই পীর হাস্সু তেলি কেবল একজন সাধারণ লেখকের কাজ নয়; বরং একজন বিশ্বাসীর রচনা।

কোনো বৃহৎ সাম্রাজ্যের চরিত্র শুধু শাসকের ব্যক্তিগত নীতির মাধ্যমে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করা যায় না। শাহজাহানের ব্যক্তিগত ধর্মীয় প্রবণতা যা–ই হোক না কেন, তাঁর শাসনাধীন সমাজ দৈনন্দিন জীবনে গভীরভাবে বহুত্ববাদী ছিল।

সুরত সিংয়ের পরিচয় বহুমাত্রিক ও বিভিন্ন স্তরে বিন্যস্ত ছিল। একদিকে তিনি ছিলেন কাম্বো জাতিতে জন্ম নেওয়া একজন হিন্দু। অন্যদিকে মোগল প্রশাসনের এই কর্মচারী ছিলেন ফারসি ভাষার কবি ও একজন মুসলিম সাধকের শিষ্য। তাঁর কাছে এসব পরস্পরবিরোধী পরিচয় ছিল না, ছিল একটি জীবনের ভিন্ন ভিন্ন দিক।

নবী ও ইমাম আলীকে স্বপ্নে দেখা

নিজের দেখা বিভিন্ন স্বপ্নের যেসব বর্ণনা সুরত সিং দিয়েছেন, সেগুলোই সম্ভবত তাঁর আধ্যাত্মিক উদারতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রমাণ। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ না করলেও তিনি লিখেছেন, এক স্বপ্নে তিনি মক্কায় হজ পালন করেন এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

সুরত সিং লিখেছেন, নবীর কাছাকাছি যাওয়ার পর তিনি দেখেন, তাঁর পাশে ইমাম আলী দাঁড়িয়ে আছেন। অন্য কিছু স্বপ্নে তিনি দাবি করেন, খাজা মইনুদ্দিন চিশতি ও বাবা ফরিদ গঞ্জশকরের মতো বহু সাধকের সঙ্গেও তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছে।

শাহজাহানের হাতে সাম্রাজ্যের মুকুট তুলে দিচ্ছেন তাঁর দাদা ও তৃতীয় মোগল সম্রাট আকবর। ১৬৩১ সালে মোগল চিত্রশিল্পী বিচিত্রের আঁকা চিত্রকর্মটি বর্তমানে আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে অবস্থিত চেস্টার বিটি লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে

এসব বর্ণনা বেশি তাৎপর্যপূর্ণ এ কারণে যে সুরত সিং নিজেকে একজন গর্বিত হিন্দু হিসেবেই দেখেছেন এবং নিজের ধর্মীয় পরিচয় ও এসব গভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার মধ্যে কোনো বিরোধ খুঁজে পাননি। তিনি এগুলোকে নিছক আন্তরিক আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা হিসেবে তুলে ধরেছেন, যার পক্ষে কোনো ব্যাখ্যা বা সাফাই দেওয়ার প্রয়োজন তিনি অনুভব করেননি।

সুফি জীবনীতে গুরু নানক

গুরু নানকের প্রতি সুরত সিংয়ের শ্রদ্ধাবোধও সমানভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তাজকিরা-ই পীর হাস্সু তেলিতে বাবা নানকের একাধিক উল্লেখ রয়েছে এবং প্রতিবারই তাঁর সম্পর্কে গভীর সম্মানের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে।

একপর্যায়ে সুরত সিং এমন একটি স্বপ্নের কথা বর্ণনা করেছেন, যেখানে গুরু নানক ও তাঁর আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক পীর হাস্সু তেলিকে পরস্পরের বিকল্প বলে মনে হয়। আসলে এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, আধ্যাত্মিক সত্য বাহ্যিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে।

নথিটির নাম তাজকিরা-ই পীর হাস্সু তেলি। শাহজাহানের শাসনামলে ১৬৪৪ থেকে ১৬৪৭ সালের মধ্যে এটি লেখা হয়। এতে মুসলিম সাধক পীর হাস্সু তেলি এবং তাঁর উত্তরসূরিদের জীবন ও অলৌকিক ঘটনার বর্ণনা রয়েছে।

পাণ্ডুলিপিতে কার্তারপুরে গুরু নানকের দরগা সফরের কথাও উল্লেখ রয়েছে। সুরত সিং লিখেছেন, মাকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে গিয়ে একটি সমাধিসৌধ ও তার পাশে একটি কবর দেখতে পান। সেখানে তাঁকে গুরু নানকের মৃত্যুর বহুল পরিচিত কাহিনি শোনানো হয়। হিন্দুরা চেয়েছিল তাঁকে দাহ করা হোক; আর মুসলিমরা চেয়েছিল তাঁকে দাফন করা হোক।

অন্যান্য বর্ণনার মতো সুরত সিংও লিখেছেন, তখন গুরু নানকের দুটি দেহ দেখা যায়—একটি দাহ করা হয়, অন্যটি দাফন করা হয়। সুরত সিং গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে এই ঐতিহ্যবাহী কাহিনি লিপিবদ্ধ করেছেন।

পুত্র দারা শিকোহের সঙ্গে সম্রাট শাহজাহান। চিত্রটির পেছনের অংশ আনুমানিক ১৬২০ সাল এবং সামনের অংশ আনুমানিক ১৫৩০–১৫৫০ সালের মধ্যে আঁকা হয়েছে। এঁকেছেন মোগল চিত্রশিল্পী নানহা

যৌথ পাড়ার এক জীবন

এসব আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা বিচ্ছিন্নভাবে ঘটেনি। শাহজাহানের শাসনামলে সুরত সিং লাহোরে বসবাস করতেন। তাঁর মহল্লায় হিন্দু ও মুসলিমরা পাশাপাশি বসবাস করতেন।

সুরত সিং সারা জীবন আবদুল করিম নামের একজন পণ্ডিতের প্রতিবেশী ছিলেন। এই মুসলিম পণ্ডিতের কাছেই তিনি ফারসি ভাষা শিখেছিলেন। তাঁদের পরিবার পাশাপাশি বাস করত। আগ্রা, লাহোর ও বারানসির মতো মোগল শহরগুলোতে হিন্দু–মুসলিমের এমন সহাবস্থান ছিল খুবই সাধারণ ঘটনা।

সুরত সিংয়ের পরিচয় বহুমাত্রিক ও স্তরে বিন্যস্ত ছিল। একদিকে তিনি ছিলেন কাম্বো জাতিতে জন্ম নেওয়া একজন হিন্দু। অন্যদিকে মোগল প্রশাসনের এই কর্মচারী ছিলেন ফারসি ভাষার কবি ও একজন মুসলিম সাধকের শিষ্য। তাঁর কাছে এসব পরস্পরবিরোধী পরিচয় ছিল না, ছিল একটি জীবনের ভিন্ন ভিন্ন দিক।

কবিতার আসর ও সাহিত্যজগৎ

সুরত সিং সেই সাহিত্য–সংস্কৃতির জগতেও সক্রিয় অংশ ছিলেন, যা ধর্মীয় বিভাজনের বদলে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে মিলনের ক্ষেত্র তৈরি করেছিল। তিনি আগ্রায় অনুষ্ঠিত একটি মুশায়েরার কথা উল্লেখ করেছেন, যেখানে তিনি অন্যান্য কবির সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ফারসি ভাষার খ্যাতিমান হিন্দু কবি চন্দর ভান ব্রাহ্মণও।

সুরত সিংয়ের ভাষ্যমতে, এই মুশায়েরা বা কবিতা পাঠের আসরে সমসংখ্যক হিন্দু ও মুসলিম কবি অংশ নিয়েছিলেন। এ ধরনের আসরে একজন হিন্দু কর্মকর্তা মুসলিম কবিদের পাশে বসে নিজের কবিতা আবৃত্তি করতে পারতেন। কেবল সাহিত্যিক যোগ্যতার ভিত্তিতে কবিদের মূল্যায়ন করা হতো।

শাহজাহানের শাসনকাল

শাহজাহানকে সাধারণত তাঁর বিশাল স্থাপত্যকীর্তির জন্য স্মরণ করা হয়। একই সঙ্গে তাঁর শাসনামলে অপেক্ষাকৃত রক্ষণশীল ইসলামি নীতির দিকে ঝোঁকের কথাও বলা হয়; কিন্তু তাজকিরা-ই পীর হাস্সু তেলি সেই পরিচিত ধারণাকে আরও জটিল করে তোলে।

ঘোড়ার পিঠে সম্রাট শাহজাহানের প্রতিকৃতি। ১৭ শতাব্দীর চিত্র

সুরত সিং শাহজাহানের শাসনের মধ্যভাগে এই গ্রন্থ লিখেছেন। তিনি সম্রাটের প্রশাসনের অধীন বিভিন্ন সরকারি পদে কর্মরত ছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি একজন হিন্দু ভক্ত হিসেবে একজন মুসলিম সাধকের জীবনী ফারসি ভাষায় স্বাধীনভাবে লিখেছেন। একই সঙ্গে তিনি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–কে স্বপ্নে দেখার অভিজ্ঞতা লিখেছেন, গুরু নানকের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন এবং মুসলিমদের সঙ্গে পাশাপাশি বসবাস করেছেন।

এসব কিছু থেকে বোঝা যায়, কোনো বৃহৎ সাম্রাজ্যের চরিত্র শুধু শাসকের ব্যক্তিগত নীতির মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। শাহজাহানের ব্যক্তিগত ধর্মীয় প্রবণতা যা–ই হোক না কেন, তাঁর শাসনাধীন সমাজ দৈনন্দিন জীবনে গভীরভাবে বহুত্ববাদী ছিল।

বিস্মৃত এক কণ্ঠস্বর

সুরত সিংয়ের পাণ্ডুলিপির গুরুত্ব হলো এর সাধারণত্ব। সম্রাট বা যুদ্ধের গল্পের পরিবর্তে এতে উঠে এসেছে মধ্যম সারির এক কর্মকর্তার অভিজ্ঞতা, যিনি বিভিন্ন শহরে ঘুরে বেড়িয়েছেন, সাহিত্যিক আসরে অংশ নিয়েছেন, একজন আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শককে অনুসরণ করেছেন এবং জীবনের নানা বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছেন।

বর্তমানে ইতিহাসের বর্ণনা যখন ক্রমেই কঠোর সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ভিত্তিতে নির্মিত হচ্ছে, তখন ১৭ শতকের সুরত সিংয়ের কণ্ঠস্বর আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক বার্তা স্মরণ করিয়ে দেয়। এটি দেখায়—অতীত কখনো কখনো সরলভাবে কল্পিত ইতিহাসের চেয়ে অনেক বেশি বহুমাত্রিক, জটিল এবং হয়তো আরও মানবিক ছিল।

তাজকিরা-ই পীর হাস্সু তেলিকে এমন একটি দলিল হিসেবে স্মরণ করা উচিত, যা মোগল সম্রাট শাহজাহানের আমলে ভারতের নানা প্রান্তে মানুষ আসলে কীভাবে জীবন কাটাত, একে অন্যের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক গড়ে তুলত এবং সমাজে কীভাবে বসবাস করত—সে বিষয়ে আমাদের এক ভিন্ন ধারণা দেয়।

# সৈয়দ আলী নাদিম রেজাভি ভারতের আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যযুগীয় ভারতীয় ইতিহাসের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক। তিনি বর্তমানে ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর এই লেখাটি ভারতের সংবাদমাধ্যম স্ক্রল ডটইন প্রকাশ করেছে।