
ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা গত শনিবার মুসলিম সম্প্রদায় এবং বাংলাদেশিদের প্রতি তাঁর ধারাবাহিক ঘৃণাপূর্ণ ও বিদ্বেষমূলক বার্তায় নতুন এক মাত্রা যোগ করলেন।
একটি ভিডিওর স্থিরচিত্রে দেখা গেছে, আসামের উগ্রবাদী মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা টুপি পরা দুই ব্যক্তির দিকে রাইফেল তাক করে রয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই টুপি পরা ব্যক্তিদের মুসলিম বলেই ধরে নিতে হবে।
যে ভিডিও থেকে এই ছবি নেওয়া হয়েছে, সেই ভিডিও শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে আসাম রাজ্য বিজেপি। ভিডিওর ক্যাপশন ছিল ‘পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক শট’, অর্থাৎ একেবারে কাছ থেকে করা গুলির ছবি।
ভিডিওতে দেখা যায়, হিমন্ত টুপি পরা দুই ব্যক্তির ছবির দিকে গুলি ছুড়ছেন এবং ভিডিওর শেষে তাঁকে বন্দুক হাতে দেখা যায়। সেখানে ‘বাংলাদেশিদের জন্য কোনো ক্ষমা নেই’ এবং ‘বিদেশিমুক্ত আসাম’—এ ধরনের বাক্য ভেসে ওঠে।
ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা জানিয়েছে, যাদের দিকে রাইফেল তাক করা হয়েছে, তাদের একজনকে কংগ্রেস দলীয় সংসদ সদস্য গৌরব গগৈর মতো দেখতে। এই ভিডিওটিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে বিজেপি তাদের ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেল থেকে পোস্টটি মুছে ফেলেছে।
বিরোধী দলগুলোর মধ্যে কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস এবং কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া-মার্ক্সবাদী (সিপিআই-এম) ভিডিওকে ‘গণহত্যার প্রস্তুতি’ বলে চিহ্নিত করেছে।
গত রোববার পোস্টটি মুছে ফেলা হয়। ভারতের সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে আসাম রাজ্য বিজেপির নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
দলটির রাজ্যের মুখপাত্র রঞ্জীবকুমার শর্মা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, ‘কোনো মন্তব্য নেই। এটি মুছে ফেলা হয়েছে, বলার কিছু নেই।’
গণহত্যার প্রস্তুতি, বলছে বিরোধীরা
আসামের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস এক বিবৃতিতে বলেছে, ভিডিওটি একটি নির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিচ্ছে। ‘সংখ্যালঘুদের সরাসরি (পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক) হত্যা করাকে এখন বড় করে প্রচার করা হচ্ছে।
কংগ্রেসের বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘এটি অত্যন্ত ঘৃণ্য এবং উদ্বেগজনক বিষয়। একে স্রেফ সাধারণ কোনো “ট্রোল কনটেন্ট” হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই ভিডিওর মাধ্যমে কার্যত গণহিংসা এবং গণহত্যার ডাক দেওয়া হয়েছে। এটি ফ্যাসিবাদী শাসনের আসল চেহারার প্রতিফলন। এরা দশকের পর দশক ধরে এই ঘৃণা লালন করেছে। গত ১১ বছরে এই বিদ্বেষকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছে।’
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে সমাজে বৈষম্য ও বিষ ছড়ানোর এই কাজের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এটা পরিষ্কার, প্রধানমন্ত্রী এই কাজের নিন্দা করবেন—এমন আশা নেই। তবে বিচার বিভাগকে দৃঢ়ভাবে হস্তক্ষেপ করতে হবে।
তৃণমূল কংগ্রেস ভিডিওটিকে ‘গণহত্যা ও গণহত্যার সবুজ সংকেত’ বলে চিহ্নিত করে বলেছে, বিজেপি একাই ভারতের রাজনৈতিক আলোচনাকে নর্দমায় টেনে নামিয়েছে...তারা আমাদের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ, বহুত্ববাদী আদর্শকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘হিমন্ত বিশ্বশর্মাকে এমন একজন মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যিনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষকে গুলি করতে পারেন। তাঁকে একজন বন্দুকধারী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। এটি যদি গণহত্যা ও গণহত্যার সবুজ সংকেত না হয়, তবে আর কী?’
বিবৃতিতে বলা হয়, এর আগে এই একই মুখ্যমন্ত্রী মানুষকে মুসলিমদের কম মজুরি দেওয়ার মতো দৈনন্দিন কাজের মাধ্যমে হেনস্তা করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু এটি সব সীমা অতিক্রম করেছে। এটি প্রকাশ্য উসকানি। প্রতিটি সুযোগে বিজেপি সমাজকে মেরুকরণ করতে, এক সম্প্রদায়কে অন্য সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিতে এবং জনজীবনে রক্তপিপাসাকে স্বাভাবিক করতে সাম্প্রদায়িক তাস খেলে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, হিমন্তের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। নির্বাচন কমিশন নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারে না। একটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা-অপরাধের এই প্রকাশ্য বিজ্ঞাপনের বিষয়টি তাদের আমলে নিতে হবে।
সিপিআই-এমও হিমন্তের এই আচরণকে ‘জাতিগত নির্মূল এবং গণহত্যার প্রকাশ্য ডাক’ বলে বর্ণনা করেছে। বামপন্থী দলটি জানায়, ‘মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এবং আসামে বিজেপি সাম্প্রদায়িক ও উসকানিমূলক বক্তব্য দিতে এবং মুসলিমদের নিশানা করে সহিংসতার ডাক দিয়ে অনুপ্রবেশকারী বলে ভয় দেখাচ্ছে। বিজেপির আনুষ্ঠানিক অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা সাম্প্রতিক এই ভিডিওটি জাতিগত নির্মূল ও গণহত্যার প্রকাশ্য ডাকের সমান।
সিপিআই–এম আরও বলেছে, ‘আসমে কোনো বড় বিপর্যয় ঘটার আগেই মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তকে গ্রেপ্তার করা উচিত। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট, সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি এবং জনসমক্ষে সহিংসতার ডাক দেওয়ার জন্য সুপ্রিম কোর্টের উচিত অবিলম্বে তাঁর এবং তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে।’
ধারাবাহিক আক্রমণের মুখে মুসলিম সম্প্রদায়
তবে এই ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো কীভাবে সুরক্ষিত হবে, সে সম্পর্কে কোনো দলই নির্দিষ্টভাবে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বা এখনো কর্মসূচির ঘোষণা করেনি। অন্যান্য কয়েকটি রাজ্যের সঙ্গে আসামেও আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই রাজ্য স্তরের নির্বাচন হতে চলেছে। তার আগে প্রতিবারের মতোই বিশ্বশর্মা মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে এবং বিশেষত বাঙালি মুসলিমদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্যের মাত্রা বাড়িয়েছেন।
হিমন্ত ধারাবাহিকভাবে মুসলিম সমাজ ও বাঙালি মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণাপূর্ণ ভাষণ দিয়ে চলেছেন। কিন্তু ভারতের আইনব্যবস্থার পরিচালকেরা তাঁর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপই নেয়নি।
যেমন গত জানুয়ারি মাসেই বিশ্বশর্মা বলেছিলেন, ভোটার তালিকা থেকে চার থেকে পাঁচ লাখ ‘মিয়া’ অর্থাৎ বাঙালি মুসলিম ভোটারকে বাদ দিতে হবে। একজন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আমার কাজ হচ্ছে মিয়া সমাজের মানুষকে আরও কষ্টের মধ্যে ঠেলে দেওয়া।’
একই সঙ্গে আসামের মুখ্যমন্ত্রী এ–ও বলেছিলেন, ‘মিয়া ভোটারদের উচিত, ভারতে নয় বাংলাদেশে গিয়ে ভোট দেওয়া।’
বাঙালি মুসলিম ভোটারদের কাছে যে ভারতের নাগরিকত্বের যথাযথ প্রমাণ রয়েছে, সে বিষয়টির দিকে আলোকপাত না করে সরাসরি হিমন্ত একটি নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষকে আক্রমণ করছেন।
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছিলেন, আসামের মুসলিম সমাজ ক্রমশ বিত্তবান হয়ে উঠছে, যা ‘আসামের সাধারণ মানুষের আত্মসমর্পণের পরিচয়ক’। অর্থনৈতিকভাবে মুসলিম সমাজের স্বাবলম্বী হওয়াকে তিনি রাজ্যের জন্য একটি হুমকি বলেও চিহ্নিত করেছিলেন।
এর আগেও হিমন্ত নির্দিষ্ট সমাজ ও সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে একাধিক মন্তব্য করেছেন। এরপরও বিরোধীরা তাঁর বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে পারেননি। ভারতের বিচারব্যবস্থাও সেভাবে হিমন্ত বিশ্বশর্মার বিরুদ্ধে সক্রিয় কোনো ভূমিকা নেয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট’-এর কার্যনির্বাহী পরিচালক রাকিব নায়েক সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, ভারতে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক ও ঘৃণাপূর্ণ ভাষণ উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে। এমনকি ২০২৫ সাল নির্বাচনের বছর না হওয়া সত্ত্বেও এ ধরনের ভাষণ কমেনি। এ ধরনের ভাষণ নিয়ন্ত্রণে কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপে এখন পর্যন্ত তেমনভাবে চোখে পড়েনি।