সংঘাতকবলিত দেশগুলোর সুরক্ষার দাবিতে ইয়েমেনের জাতীয় পতাকার আদলে প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভে এক নারী। যুক্তরাজ্যের লন্ডনে, ৫ জুলাই ২০২০
সংঘাতকবলিত দেশগুলোর সুরক্ষার দাবিতে ইয়েমেনের জাতীয় পতাকার আদলে প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভে এক নারী। যুক্তরাজ্যের লন্ডনে, ৫ জুলাই ২০২০

এক দেশ, বহু শক্তির লড়াই: ইয়েমেন কীভাবে বারবার যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে

বিস্তীর্ণ আরব উপত্যকার একেবারে দক্ষিণ–পশ্চিম কোণের দেশ ইয়েমেন। আয়তনে বাংলাদেশের তুলনায় কয়েক গুণ বড়। পাহাড় আর মরুভূমি ঘেরা। দেশটিতে চার কোটির কিছু বেশি মানুষের বসবাস। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির রাজধানী সানা।

ইয়েমেনের ভৌগোলিক অবস্থান আলাদা করে ব্যাখ্যার দাবি রাখে। দেশটির দুদিকে স্থলভাগ, দুদিকে সাগর। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, উত্তরে সৌদি আরবের সঙ্গে দেশটির বিশাল সীমানা। পূর্বে ওমান। পশ্চিমে লোহিত সাগর। দক্ষিণে এডেন উপসাগর ও আরব সাগর হয়ে ভারত মহাসাগরের সুনীল জলরাশি।

লোহিত সাগর আর এডেন উপসাগর হয়ে আরব সাগরে চলাচলের জন্য ইয়েমেন ঘেঁষে সরু একটি করিডর রয়েছে। এ জলপথকে বাব আল–মানদেব প্রণালি নামে ডাকা হয়। প্রণালির এক পাশে ইয়েমেন, অন্য পাশে আফ্রিকার জিবুতি। এই সরু জলপথ দিয়ে লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ খালের দিকে জাহাজ চলাচল করে।

লোহিত সাগর থেকে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন করা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য বাব আল–মানদেব প্রণালির গুরুত্ব অপরিসীম। আর এমন বাণিজ্যিক গুরুত্ব ইয়েমেনের ভূরাজনৈতিক আবেদন বহু গুণ বাড়িয়ে তুলেছে। ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে আফ্রিকা ও আরবের (বৃহত্তর এশিয়ার) অন্যতম সংযোগস্থল বলা হয় ইয়েমেনকে।

সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য

ইয়েমেনের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বেশ সমৃদ্ধ, হাজারো বছরের পুরোনো। অর্থনৈতিকভাবে সম্পদশালী ভূখণ্ড ছিল ইয়েমেন। প্রাচীনকালে এ অঞ্চলে সাবা, মাইন ও হিময়ারের মতো রাজ্য গড়ে উঠেছিল। ভারত মহাসাগর, পূর্ব আফ্রিকা ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যকার বাণিজ্যপথে অবস্থানের কারণে ইয়েমেন সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। ধূপ, সুগন্ধি দ্রব্য ও মসলার বাণিজ্য ছিল এ সমৃদ্ধির বড় উৎস।

সপ্তম শতাব্দীতে ইয়েমেন মুসলিম শাসনের অধীনে আসে। পরবর্তী শতাব্দীগুলোয় বিভিন্ন স্থানীয় রাজবংশ ও ধর্মীয় নেতা দেশটির বিভিন্ন অংশ শাসন করেন। নবম শতাব্দীর শেষ দিকে উত্তর ইয়েমেনে ‘জায়দি’ শিয়া ইমামদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমান হুতি আন্দোলনের সামাজিক ও ধর্মীয় ভিত্তি বুঝতে এই জায়দি ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাচীন গ্রিসের খ্যাতিমান ভূগোলবিদ টলেমি একসময় ইয়েমেনকে ‘সুখী আরব’ বলেছিলেন। রোমানরাও ইয়েমেনকে ‘সুখী অঞ্চল’ বলেই চিনত। সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, সম্পদশালী অর্থনীতি, সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্র ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে ইয়েমেনিরা বরাবরই বিশ্ববাসীর মনোযোগ কেড়েছে।

যদিও আধুনিক ইয়েমেন অনেকটা আলাদা। দেশটির সমৃদ্ধির ইতিহাস ফিকে হয়ে এসেছে। এখন ইয়েমেন বলতে বিশ্বের মানুষ বোঝে, গৃহযুদ্ধে জর্জরিত ও সংঘাতকবলিত এক ভূখণ্ড; যেখানে অর্থের বদলে অস্ত্রের ঝনঝনানি এখন নিত্যদিনের ঘটনা।

ইয়েমেনের হুতি যোদ্ধারা

ঔপনিবেশিকতা থেকে স্বাধীনতা

ইয়েমেনকে ঘিরে বিদেশি শক্তিগুলোর আগ্রহের ইতিহাস কয়েক শ বছরের পুরোনো। ষোড়শ শতকের দিকে তখন অটোমান সাম্রাজ্যের জয়জয়কার। ইয়েমেনের একটি অংশে সাম্রাজ্য বিস্তার করে তুর্কিরা; কিন্তু স্থায়ী হয়নি। মোটামুটি এক শতাব্দীর মধ্যে ইয়েমেন থেকে অটোমানরা বিদায় নিতে বাধ্য হয়।

লোহিত সাগরে এরপর অনেক জল গড়িয়েছে। ইউরোপীয় শক্তিগুলো একে একে আফ্রিকা ও এশিয়ায় ছড়িয়েছে। ইয়েমেনের এডেন (বিখ্যাত বন্দর) ১৮৩৯ সালে ব্রিটিশ শাসনের অধীন আসে। ১৮৬৯ সালে সুয়েজ খাল চালু হয়। তখন এডেন গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকেন্দ্র বা রিফুয়েলিং বন্দর হয়ে ওঠে। এর আগে ১৮৪৯ সালে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চল আবার নিয়ন্ত্রণে নেয় অটোমানরা। আর দক্ষিণাঞ্চল থাকে ব্রিটিশদের হাতে।

নব্বইয়ের দশকে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে ‘জায়দি’ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের অংশ হিসেবে হুতি আন্দোলনের সূচনা। প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুতি। তিনি সালেহ সরকারের বিভিন্ন নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের প্রভাবের সমালোচনা করতেন। তখন থেকেই হুতিদের সমর্থন জোগায় ইরান।

বিংশ শতকের শুরুর দিক। রক্তক্ষয়ী প্রথম বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি তখনো দগদগে। ১৯১৮ সালে ইয়েমেন থেকে অটোমান সাম্রাজ্য বিদায় নেয় (এ সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘটে ১৯২২ সালে)। স্বাধীন হয় উত্তর ইয়েমেন। শাসনভার যায় ইমাম ইয়াহিয়া মুহাম্মদ হামিদ এদ্দিনের হাতে। তাঁকে মুতাওয়াক্কিলি রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। তিন দশক দেশ শাসন করেন তিনি। তখন সামন্ততান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দানা বাঁধে ইয়েমেনে।

১৯৪৮ সালে আততায়ীর হাতে নিহত হন ইমাম ইয়াহিয়া। বিদ্রোহীদের দমন করে উত্তরসূরি হন তাঁর বড় ছেলে আহমদ বিন ইয়াহিয়া। তিনি বেশি দিন ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। ১৯৬২ সালে মারা যান। ক্ষমতায় বসেন তাঁর ছেলে মুহাম্মদ আল-বদর। অভিষেকের পরপর সেনা বিদ্রোহের সম্মুখীন হয়ে তাঁকে ক্ষমতা হারাতে হয়।

অবসান ঘটে ইয়েমেনি রাজতন্ত্রের। সেনা কর্মকর্তাদের হাত ধরে ইয়েমেনে আরব প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। এতে সৌদি আরব রাজতন্ত্রপন্থীদের ও মিসর প্রজাতন্ত্রপন্থীদের প্রকাশ্যে সমর্থন দেয়।

ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বন্দরনগরী মোখায় হুতিদের হামলার পর ক্ষয়ক্ষতির চিত্র

দুই দেশের এক হওয়া

গত শতকের ষাটের দশকে পুরো ইয়েমেন অঞ্চল ছিল বেশ উত্তাল। সশস্ত্র আন্দোলনের মুখে ১৯৬৭ সালে ব্রিটিশরা দক্ষিণ ইয়েমেন ছেড়ে চলে যায়। ব্রিটিশশাসিত অঞ্চলগুলো এক ছাতার নিচে এনে নতুন নাম রাখা হয় ‘পিপলস রিপাবলিক অব ইয়েমেন’। সেটাও বেশি দিন টেকেনি। দুই বছরের মাথায় (১৯৬৯ সালে) সফল কমিউনিস্ট বিদ্রোহ হলে এটির নতুন নাম রাখা হয় ‘পিপলস ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব ইয়েমেন’।

নতুন এ দেশ স্পষ্টতই সোভিয়েত প্রভাব বলয়ে ছিল, যা ওই সময় আরব বিশ্বের একমাত্র সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ছিল পরিচিত। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলে তখনো রক্ষণশীল প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা। দুই অংশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও আলাদা। চলছিল সীমান্তবিরোধ। এর মধ্যেই দুই অংশকে এক করার একটি প্রচেষ্টা চালু ছিল।

১৯৭৮ সাল। উত্তর ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট হন আলী আবদুল্লাহ সালেহ। পরের বছরই উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন সংঘর্ষে জড়ায়। আশির দশকের মাঝামাঝি দক্ষিণ ইয়েমেনে ক্ষমতার লড়াইয়ে হাজারো মানুষ নিহত হন। ফলে দেশটির প্রথম প্রজন্মের নেতাদের বড় অংশ ক্ষমতা থেকে সরে যেতে বাধ্য হন।

এমন উত্তাল পরিস্থিতিতে দুই ইয়েমেনকে এক করার প্রচেষ্টা জোরেশোরে শুরু হয়। সেটা আরও জোরালো হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সময়ে। সফলতা আসে ১৯৯০ সালে। ওই বছরের ২২ মে দুই ইয়েমেন এক হয়। নতুন রাষ্ট্রের নাম রাখা হয় ‘রিপাবলিক অব ইয়েমেন’। প্রেসিডেন্ট হন আলী আবদুল্লাহ সালেহ।

একীভূত হলেও দুই অংশের মধ্যে বিরোধ আর উত্তেজনা রয়ে যায়। ১৯৯৪ সালের মাঝামাঝি প্রেসিডেন্ট সালেহ জরুরি অবস্থা জারি করেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট আলী সালেম আল-বেইদসহ দক্ষিণের কয়েকজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেন তিনি। জবাবে তাঁরা দক্ষিণে নতুন রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা দেন। তবে সালেহর বাহিনী তাঁদের পরাস্ত করে। দেশটি আবার ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পায়।

সৌদি আরব হুতিদের উত্থানকে নিজেদের দক্ষিণ সীমান্তের জন্য হুমকি ও ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব বিস্তার হিসেবে দেখে থাকে। ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলা ও স্থলযুদ্ধের মধ্যেও হুতিরা সানা আর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। সৌদি আরবের ভেতরেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় হুতিরা।

সালেহর দীর্ঘ শাসন ও হুতিদের উত্থান

প্রেসিডেন্ট সালেহ দক্ষিণ ইয়েমেনের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু অনেক মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক বঞ্চনা, জমি ও সম্পদ হারানো এবং সরকারি চাকরি থেকে ছাঁটাইয়ের ক্ষোভ রয়ে যায়। এসবই পরে অঞ্চলটিতে বিচ্ছিন্নতাবাদ ছড়ানোর পেছনে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।

আলী আবদুল্লাহ সালেহ প্রথমে উত্তর ইয়েমেনের শাসক, পরে দুই ইয়েমেন এক হলে প্রেসিডেন্ট হন। সব মিলিয়ে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিন দশকের বেশি ক্ষমতায় ছিলেন। তাঁর শাসনব্যবস্থা দাঁড়িয়েছিল সেনাবাহিনী, উপজাতীয় নেতা, রাজনৈতিক মিত্র ও পৃষ্ঠপোষকতার জটিল সম্পর্কের ওপর।

সালেহ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গোষ্ঠীকে মিত্র বানিয়েছেন। আবার প্রয়োজন ফুরালে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এ কৌশল তাঁকে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় রাখে। কিন্তু দেশটিতে কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। দুর্নীতি, বেকারত্ব, দারিদ্র্য, পানি ও সম্পদের সংকট এবং আঞ্চলিক বৈষম্য বাড়তে থাকে। সঙ্গে বাড়তে থাকে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের প্রভাব।

নব্বইয়ের দশকে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে ‘জায়দি’ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের অংশ হিসেবে হুতি আন্দোলনের সূচনা হয়। প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুতি। তিনি সালেহ সরকারের বিভিন্ন নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের প্রভাবের সমালোচনা করতেন। তখন থেকেই হুতিদের সমর্থন জোগায় ইরান।

নতুন শতকে ইয়েমেন

একবিংশ শতকের শুরুতে ইয়েমেনে ব্যাপক রক্তপাত দেখা দেয়। ২০০০ সালে এডেন বন্দরে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজে প্রাণঘাতী হামলা চালায় আল–কায়েদা। পরের বছর নির্বাচন ঘিরে দেশটিতে বড় ধরনের সহিংসতা হয়। ২০০২ সালে আল–কায়েদার বিরুদ্ধে বেশ বড়সড় অভিযানে নামে ইয়েমেন সরকার। আল–কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে দেশটি থেকে কয়েক শ ইসলামিক স্কলারকে বহিষ্কার করা হয়।

উত্তরাঞ্চলে ২০০৪ সালের জুন–আগস্টে হুতিদের নেতৃত্বাধীন শিয়া বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষে শত শত মানুষ নিহত হন। নিহত হন হুসেইন আল-হুতিও। ২০০৫ সালের শুরুর দিকে হুসেইন আল-হুতির সমর্থকদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন।

২০০৭ সালের জানুয়ারি–মার্চ মাসে ইয়েমেনের উত্তরে নিরাপত্তা বাহিনী ও হুতিদের সংঘর্ষে বহু মানুষ হতাহত হন। গ্রীষ্মে বিদ্রোহী নেতা আবদুল মালিক আল-হুতি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হন। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে সানায় মার্কিন দূতাবাসে আল-কায়েদার হামলায় হামলাকারীসহ ১৬ জন নিহত হন।

২০০৯–১০ সালজুড়েও ইয়েমেনে পাল্টাপাল্টি হামলা দেখা যায়। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে মার্কিন বাহিনীর হামলায় দেশটিতে আল–কায়েদার নেতা আনোয়ার আল–আওলাকি নিহত হন। এত কিছুর পরও ইয়েমেনে আল–কায়েদা ও হুতি, কারও প্রভাব কমেনি।

রাজধানী সানায় হুতি কর্তৃপক্ষের অনুগত যোদ্ধা নিয়োগ কার্যক্রম চলছে। ইয়েমেন, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আরব বসন্তের ছোঁয়া

আরব বিশ্ব ২০১১ সালে এক অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী হয়। তিউনিসিয়া থেকে শুরু হওয়া আরব বসন্ত একে একে আরব দেশগুলোয় ছড়িয়ে পড়ে। বাদ যায়নি ইয়েমেনও। ওই বছর দেশটিতে ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীরা সালেহর পদত্যাগ, দুর্নীতির অবসান ও রাজনৈতিক সংস্কারের দাবি জানান।

দীর্ঘ আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার পর সালেহ ক্ষমতা ছাড়তে রাজি হন। ২০১২ সালে আবেদরাব্বো মানসুর হাদি ইয়েমেনের অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হন। তাঁর নেতৃত্বে একটি জাতীয় সংলাপ শুরু হয়। লক্ষ্য ছিল, নতুন সংবিধান তৈরি, রাষ্ট্রের কাঠামো সংস্কার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক পক্ষকে ক্ষমতায় যুক্ত করা।

রূপান্তরের এ প্রক্রিয়া প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। সরকার অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি, নিরাপত্তাহীনতা ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিরোধ সামাল দিতে ব্যর্থ হয়। নতুন রাষ্ট্রকাঠামো ও ক্ষমতা বণ্টনের প্রস্তাবেও ঐকমত্য হয়নি। এতে হুতিরা অভিযোগ করে, প্রস্তাবিত ব্যবস্থা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করবে।

এ পরিস্থিতিতে হুতিরা উত্তরাঞ্চল থেকে অগ্রসর হতে থাকে। একসময় পুরোনো শত্রু সালেহ ও তাঁর অনুগত সেনাসদস্যদের সঙ্গে হুতিদের সমঝোতা হয়। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে রাজধানী সানা দখল করে নেয় হুতিরা। ২০১৫ সালের শুরুতে প্রেসিডেন্ট হাদি সানা ছেড়ে এডেনে চলে যান। এডেনকে অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করা হয়। পরে প্রেসিডেন্ট হাদি সৌদি আরবে আশ্রয় নেন।

গৃহযুদ্ধ থেকে আঞ্চলিক সংঘাত

আরব বসন্তের পর থেকে ইয়েমেন টালমাটাল ছিল। এর মধ্যেই প্রেসিডেন্ট হাদি সৌদি আরবে পালিয়ে যান। হুতিরাও একের পর এক এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে শুরু করে। এ অবস্থায় ২০১৫ সালে নতুন করে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে ইয়েমেনে।

হুতিরা এডেনের দিকে অগ্রসর হলে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট ইয়েমেনে অভিযান শুরু করে। জোটের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল, হাদি সরকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং হুতিদের অগ্রযাত্রা থামানো। যুক্তরাষ্ট্র জোটকে গোয়েন্দা ও কারিগরি সহায়তা দেয়।

সৌদিরা হুতিদের উত্থানকে নিজেদের দক্ষিণ সীমান্তের জন্য হুমকি এবং ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব বিস্তার হিসেবে দেখে থাকে। সৌদি জোটের বিমান হামলা ও স্থলযুদ্ধের মধ্যেও হুতিরা সানা আর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। সৌদি আরবের ভেতরেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় হুতিরা। পরে যুদ্ধ ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে।

২০১৭ সালে হুতি আর সালেহপন্থীদের জোট ভেঙে যায়। সালেহ হুতিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পর সংঘর্ষে নিহত হন। এরপরও তাঁর অনুগত বিভিন্ন সামরিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী ইয়েমেনের সংঘাতে সক্রিয় থাকে।

টানা সংঘাতে ইয়েমেনের রাজধানী সানার বড় অংশ এখন কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে

শান্তি এখনো আসেনি

ইয়েমেনে সংঘাত শুধু হুতি ও সরকারপন্থী বাহিনীর মধ্যে ঘটছে, তা নয়। দক্ষিণাঞ্চলে স্বাধীন রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি) গড়ে উঠেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এসটিসিকে সমর্থন জোগায়। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দেয় সৌদি আরব।

২০১৯ সালে এসটিসি এডেনের নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরে সৌদি আরবের মধ্যস্থতায় সরকার ও এসটিসির মধ্যে একটি চুক্তি হয়। এরপরও বাহিনীগুলো একীভূত করা ও ক্ষমতা ভাগাভাগির অনেক শর্ত কার্যকর হয়নি। চলতে থাকে সংঘাত। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ২০২২ সালে দুই মাসের অস্ত্রবিরতি কার্যকর হয়। পরে এর মেয়াদ কয়েক দফায় বৃদ্ধি করা হয়।

একই বছরের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট হাদি প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের (পিএলসি) কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। হুতিবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা থেকে পিএলসি গঠন করা হয়। কিন্তু কাউন্সিলের সদস্য ও সমর্থক শক্তিগুলোর মধ্যেও মতপার্থক্য দূর হয়নি। ফলে কাঙ্ক্ষিত শান্তিও আসেনি।

হুতিরা বাব আল-মানদেব প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। ইরান যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আগে থেকেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এখন হুতিরা বাব আল-মানদেব পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পুরো বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ফিলিস্তিনের গাজা ও ইরান যুদ্ধ

২০২৩ সালে গাজায় যুদ্ধ শুরু করে ইসরায়েল। হুতিরা অসহায় গাজাবাসীর পক্ষে দাঁড়ায়। ইসরায়েলি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাতে শুরু করে। সেই সঙ্গে ইসরায়েলের ওপর চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবে লোহিত সাগর ও আব আল–মানদেব প্রণালিতে একের পর এক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়।

বসে থাকেনি ইসরায়েল ও এর পশ্চিমা মিত্ররা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নৌপথের সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলে ইয়েমেনে হুতিদের ওপর ব্যাপকভাবে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।

ইতিমধ্যে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় ইরান যুদ্ধ। ওই দিন ইরানে আকস্মিক হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। জবাবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ঘাঁটি ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালায় ইরান। স্বাভাবিকভাবে ইরান–সমর্থিত হুতিরা যুদ্ধের বাইরে থাকতে পারেনি। তেহরানের পক্ষে রণাঙ্গনে নেমেছে তারাও।

গত জুলাই থেকে ইয়েমেনে সামরিক উত্তেজনা আবার বাড়তে শুরু করে। হুতিদের লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং উপকূলীয় এলাকায় অগ্রযাত্রা নতুন সংকট তৈরি করে। লোহিত সাগর ও বাব আল–মানদেব প্রণালি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানবাহী রণতরিগুলোর অবাধ চলাচল ব্যাহত করাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে।

ইরান যুদ্ধের কারণে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে জ্বালানি তেল আনার বিকল্প পথ হয়ে উঠেছিল ইয়েমেনসংলগ্ন বাব আল-মানদেব প্রণালি

হুতিদের হুমকি ও প্রতিক্রিয়া

জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, অত্যাধুনিক ড্রোন ও বিস্ফোরকবোঝাই স্পিডবোটের সাহায্যে বড় আকারের নৌযানের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করার সক্ষমতা হুতিদের রয়েছে। তা ছাড়া সাগরের বুকে মাইন পেতে রেখে বাব আল–মানদেব প্রণালির স্বাভাবিক নৌ চলাচলকে তারা প্রবলভাবে বিঘ্নিত করতে পারে।

হুতিদের এসব সক্ষমতা ইরান যুদ্ধে মোতায়েন মার্কিন যুদ্ধজাহাজ চলাচলের পথকে রীতিমতো কণ্টকাকীর্ণ ও সময়সাপেক্ষ করে তুলতে পারে। মার্কিন রণতরিগুলো চাইলে অবশ্য সৌদি আরবের উপকূল ঘেঁষে লোহিত সাগরের উত্তরাঞ্চল থেকে নিজেদের অভিযান চালাতে পারে।

তবে হুতিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ওই এলাকা পর্যন্ত গিয়েও অনায়াসে আঘাত হানতে সক্ষম। পাশাপাশি সৌদি উপকূল থেকে হরমুজ প্রণালির এক হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরত্ব মার্কিন বাহিনীর জন্য আরেক বড় বাধা। এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার হুতিরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মোখা বন্দর দখল করে নিয়েছে। এত দিন বন্দরটি ইয়েমেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল।

জবাবে সৌদি আরব মোখায় বিমান হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে হুতিরাও বাব আল–মানদেব প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। ইরান যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আগে থেকেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এখন হুতিরা বাব আল–মানদেব পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পুরো বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংকটে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, সংঘাতের বিস্তার ইয়েমেনকে আবার বড় ধরনের যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। সেই সঙ্গে দেশটিকে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর সংঘাতের আরও গভীরে নিয়ে যেতে পারে।

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা, সংঘাত ও গৃহযুদ্ধে ইয়েমেনের অবস্থা শোচনীয়। লাখো মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে দেশে–বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছেন। অর্থনীতির অবস্থা তথৈবচ। নিত্যপণ্যের তীব্র সংকট। ভেঙে পড়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও প্রশাসনব্যবস্থা। খাদ্যসংকটে দেখা দিয়েছে তীব্র মানবিক সংকট।

অপুষ্টি–দুর্ভিক্ষ–মহামারিতে ইয়েমেনে আরও অনেক মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও ত্রাণ সরবরাহে বাধা পাচ্ছে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইয়েমেনে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কার কথা জানিয়ে রেখেছে।

এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি মূল্য চোকাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এখন যদি গৃহযুদ্ধ ও আঞ্চলিক সংঘাত আরও দীর্ঘ সময় ধরে চলে, তবে ইয়েমেন সংকট এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভাগ্য কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেটা ভেবে উদ্বিগ্ন হতেই হয়।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, টাইম, দ্য গার্ডিয়ান, এপি, কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস, আরব সেন্টার ও ব্রিটানিকা