
চলমান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলা চালাতে ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছে রাশিয়া। গোয়েন্দা কার্যক্রমের বিষয়ে জানাশোনা আছে এমন তিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট এ দাবি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ এই যুদ্ধে পরোক্ষভাবে হলেও অংশ নিচ্ছে কি না, এই প্রথম তার ইঙ্গিত পাওয়া গেল।
এর আগে এ ধরনের সহযোগিতার বিষয়টি কখনো সামনে আসেনি। ফলে এই সহযোগিতা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, দ্রুত বিস্তার লাভ করা এই সংঘাতের সঙ্গে এখন আমেরিকার অন্যতম প্রধান পারমাণবিক শক্তিধর ও উন্নত গোয়েন্দা সক্ষমতাসম্পন্ন এক প্রতিদ্বন্দ্বী জড়িয়ে পড়েছে।
সংবেদনশীল বিষয় হওয়ার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই তিন কর্মকর্তা জানান, গত শনিবার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমানসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপনার অবস্থান ইরানকে জানিয়ে দিচ্ছে রাশিয়া।
সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি বলেন, ‘এটি বেশ বড় আকারের একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা বলেই মনে হচ্ছে।’
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য অনুরোধ করা হলেও ওয়াশিংটনে অবস্থিত রাশিয়ার দূতাবাস কোনো সাড়া দেয়নি। অবশ্য মস্কো এই যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে একে ‘বিনা উসকানিতে সশস্ত্র আগ্রাসন’ বলে অভিহিত করেছে।
ইরানকে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে রাশিয়ার সহায়তার ব্যাপ্তি ঠিক কতটা, তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহ পার হওয়ার আগেই মার্কিন বাহিনীর অবস্থান শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ইরানি সামরিক বাহিনীর নিজস্ব সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে।
ইরান আগাম সতর্কবার্তা প্রদানকারী রাডার বা ‘ওভার-দ্য-হরাইজন’ রাডারগুলোতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আঘাত হানছে। খুবই সুনির্দিষ্টভাবে তারা এ কাজটি করছে। তারা পরিকল্পিতভাবে কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল ব্যবস্থাকে নিশানা বানাচ্ছে।—দারা ম্যাসিকট, রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস
গত রোববার কুয়েতে ইরানের ড্রোন হামলায় ছয় মার্কিন সেনা নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। ইরান এ পর্যন্ত মার্কিন সামরিক অবস্থান, দূতাবাস ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে কয়েক হাজার আত্মঘাতী ড্রোন এবং কয়েক শ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। অন্যদিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা, যুদ্ধজাহাজ এবং দেশটির নেতৃত্বসহ ইরানের দুই হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে যৌথ হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
ইরানকে রাশিয়ার সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি বলেন, ‘ইরান সরকার পুরোপুরি বিধ্বস্ত অবস্থায় রয়েছে। তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা প্রতিদিন কমছে, নৌবাহিনী নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে এবং (অস্ত্র) উৎপাদন সক্ষমতা ধ্বংস করা হচ্ছে। এমনকি তাদের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোও সেভাবে লড়াই করতে পারছে না।’
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
ইরানের অন্যতম শক্তিশালী সমর্থক রাশিয়া ও চীনকে কোনো বার্তা দিতে চান কি না—চলতি সপ্তাহে এমন প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, তাঁর দেওয়ার মতো কোনো বার্তা নেই এবং ‘তারা আসলে এখানে কোনো বড় প্রভাবক নয়।’
নিজেদের অন্যতম ঘনিষ্ঠ অংশীদার ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কিছু সম্ভাব্য সুবিধা দেখছে ক্রেমলিন। এর মধ্যে রয়েছে তেল বিক্রি করে বাড়তি আয় এবং এমন একটি তীব্র সংকট তৈরি হওয়া, যা ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে আমেরিকা ও ইউরোপের মনোযোগ সরিয়ে নেবে।
রুশ সহায়তা সম্পর্কে অবগত দুজন কর্মকর্তা জানান, চীনের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও বেইজিং ইরানকে প্রতিরক্ষা কাজে সহায়তা করছে বলে মনে হচ্ছে না।
ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনের দূতাবাস এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। তবে বেইজিংও এই সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল অবকাঠামো, রাডার এবং কুয়েতের অস্থায়ী সেনাছাউনির মতো জায়গায় (যেখানে ছয় মার্কিন সেনা নিহত হন) ইরানের সাম্প্রতিক হামলার ধরন গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের ইঙ্গিত দেয়। এমনকি গত কয়েক দিনের মধ্যে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের সিআইএ স্টেশনটিও হামলার শিকার হয়েছে।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর বিষয়ে বিশেষজ্ঞ দারা ম্যাসিকট বলেন, ইরান আগাম সতর্কবার্তা প্রদানকারী রাডার বা ‘ওভার-দ্য-হরাইজন’ রাডারগুলোতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আঘাত হানছে। খুবই সুনির্দিষ্টভাবে তারা এ কাজটি করছে। তারা পরিকল্পিতভাবে কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল ব্যবস্থাকে নিশানা বানাচ্ছে।
ম্যাসিকট আরও বলেন, ইরানের হাতে অল্প কিছু সামরিক স্যাটেলাইট রয়েছে এবং নিজস্ব কোনো সমন্বিত স্যাটেলাইট ব্যবস্থা (কনস্টেলেশন) নেই। এ অবস্থায় রাশিয়ার উন্নত মহাকাশ গবেষণা সক্ষমতা থেকে পাওয়া চিত্র ইরানের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ক্রেমলিন এখন নিজেও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে অনেক বেশি দক্ষ।
হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের বেলফার সেন্টারের গবেষক নিকোল গ্রাজিউস্কি ইরান-রাশিয়া সহযোগিতা নিয়ে কাজ করেন। তিনি বলেন, ইরানের পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার সক্ষমতার মধ্যে একধরনের ‘প্রযুক্তিগত উন্নতি’ দেখা যাচ্ছে।
নিকোল আরও বলেন, ‘তারা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করতে পারছে।’ গত গ্রীষ্মে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের তুলনায় ইরানের হামলার মান অনেক উন্নত হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ওয়াশিংটন পোস্টকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, পেন্টাগনের হাতে থাকা নিখুঁত অস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর (ক্ষেপণাস্ত্রবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র) দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন এই অভিযান অনুমোদনের বিষয়ে ভাবছিলেন, তখন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন একই উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলেন। তবে প্রশাসন কেইনের সেই মূল্যায়নকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে চাইছে না।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর থেকে বিভিন্ন দেশ যেভাবে ছায়াযুদ্ধে (প্রক্সি ওয়ার) জড়িয়েছে, রাশিয়ার এই সাম্প্রতিক সহায়তা সেই সমীকরণ বদলে দিচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধে ইরান, চীন ও উত্তর কোরিয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো রাশিয়াকে সরাসরি সামরিক সহায়তা অথবা দেশটির বিশাল প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করে আসছে। অন্যদিকে ইউক্রেনকে শত শত কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম দেওয়ার পাশাপাশি রুশ অবস্থান শনাক্ত করতে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে কিয়েভকে সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
গত বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানি ড্রোন থেকে সুরক্ষা পেতে ইউক্রেনের সহায়তা চেয়েছে এবং কিয়েভ এতে সাড়া দিয়ে ‘বিশেষজ্ঞ’ পাঠাবে।
ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার অন্যতম প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে ইরান। তারা স্বল্পমূল্যের আত্মঘাতী ড্রোন তৈরির প্রযুক্তি রাশিয়াকে দিয়েছে। এসব ড্রোনকে কিয়েভের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ব্যতিব্যস্ত রাখতে এবং ইউক্রেনের শহরগুলো রক্ষায় পশ্চিমাদের দেওয়া ইন্টারসেপ্টরের মজুত ফুরিয়ে ফেলতে বারবার ব্যবহার করা হয়েছে।
মস্কো-তেহরান সহযোগিতা সম্পর্কে অবগত এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা ইউক্রেনীয়দের যে সহায়তা দিচ্ছি, সে সম্পর্কে রাশিয়া পুরোপুরি সচেতন। আমার মনে হয়, তারা এর প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ পেয়ে বেশ খুশি।’ তিনি আরও বলেন, রাশিয়ার গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের মান আমেরিকার সমপর্যায়ের না হলেও তা বিশ্বের অন্যতম সেরাদের একটি।
ওয়াশিংটন পোস্ট এর আগে এক প্রতিবেদনে বলেছিল, নিজেদের অন্যতম ঘনিষ্ঠ অংশীদার ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কিছু সম্ভাব্য সুবিধা দেখছে ক্রেমলিন। এর মধ্যে রয়েছে তেল বিক্রি করে বাড়তি আয় এবং এমন একটি তীব্র সংকট তৈরি হওয়া, যা ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে আমেরিকা ও ইউরোপের মনোযোগ সরিয়ে নেবে।
এই সংঘাতের শুরুর দিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হয়েছেন। ২০২৪ সালের শেষের দিকে সিরিয়ার বিদ্রোহীদের অভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের শাসক বাশার আল-আসাদের পতন এবং গত জানুয়ারিতে মার্কিন সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে আনার পর ইরান হতে পারে রাশিয়ার বন্ধুপ্রতিম সরকার হারানো সর্বশেষ দেশ।
তবে বিশ্লেষক ম্যাসিকট মনে করেন, সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে রাশিয়ার অনীহা আসলে অন্যদিকে মনোযোগ দেওয়ার গুরুত্বেরই লক্ষণ। তিনি বলেন, ক্রেমলিন এটাকে তাদের নিজস্ব সমস্যা বা যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করছে না। কৌশলগত হিসাব-নিকাশে রাশিয়ার কাছে ইউক্রেন এখনো সবকিছুর ঊর্ধ্বে।