
ইরানের হরমুজ প্রণালি অবরোধের মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি যুদ্ধ থেকে অর্থনৈতিক যুদ্ধের পথে হেঁটেছেন। এই কৌশল মূলত নতুন করে ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানে হামলা করা ছাড়াই সংঘাত শেষ করার চেষ্টা।
যুক্তরাষ্ট্রের এ অবরোধের মূল যুক্তি হলো, ইরান যদি তেল রপ্তানি ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আমদানি করতে না পারে, তবে দেশটি আর্থিক ও মানবিক সংকটে পড়বে। এতে যুদ্ধ শেষ করতে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নেওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো পথ থাকবে না।
ট্রাম্পের হরমুজ অবরোধের পথে যাওয়ার বিষয়টি একধরনের বাজি। এতে ইরান দ্রুত সংকটের মুখে পড়তে পারে। হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতিকে শ্বাসরোধ করার যে চেষ্টা ইরান করছে, ট্রাম্প এখন তার পাল্টা ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
মার্কিন কর্মকর্তা, সংবাদমাধ্যম এবং বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ প্রক্রিয়ায় ইরানকে নতজানু করার আশা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এগুলো ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা মধ্যপ্রাচ্যে বারবার যুক্তরাষ্ট্রকে পথভ্রষ্ট করেছে।
ধারণা করা হচ্ছে, এই কৌশলকে ওয়াশিংটন যেভাবে যৌক্তিক মনে করে, ইরানও ঠিক সেভাবেই এই চাপের প্রতিক্রিয়া দেখাবে। তবে সাম্প্রতিক ইতিহাস বলছে, ইরাক, আফগানিস্তান, রাশিয়া ও লিবিয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষরা প্রায়ই তাদের নিজেদের জাতীয় স্বার্থের ক্ষেত্রে পশ্চিমা হিসাব-নিকাশ অনুযায়ী কাজ করে না।
যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে, তাদের পরিকল্পনা কাজ করবে। অর্থনৈতিক সংকটে ইরানের ভেতরে রাজনৈতিক অসন্তোষ তৈরি হবে এবং বর্তমান ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণকে পরীক্ষার মুখে ফেলতে পারে। কিন্তু ইরানের নেতারা পরিস্থিতিকে যে সেভাবেই দেখবেন, এমনটা ভাবা অনেক বড় ঝুঁকি হতে পারে।
মানবাধিকার সংস্থা এবং বৈশ্বিক হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় অনেক শীর্ষ নেতার মৃত্যু সত্ত্বেও টিকে থাকার মাধ্যমে এই শাসনব্যবস্থা প্রতিকূলতা সহ্য করার ক্ষমতা প্রমাণ করেছে। হয়তো ইরান যেটিকে নিজেদের অস্তিত্বের লড়াই মনে করছে, সেখানে তাদের সহ্যক্ষমতাকে আবারও ছোট করে দেখছে যুক্তরাষ্ট্র।
চাপে পড়বেন ট্রাম্প
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, ট্রাম্প মনে করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা দ্রুতই যুদ্ধ শেষ করে দেবে। অন্তত ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার মতো পদক্ষেপ নেওয়ার অনেক আগেই যুদ্ধ শেষ হবে। তাই মার্কিন অবরোধের ফলাফল এখন সময়ের ওপর নির্ভর করছে।
ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার ফলে বিশ্বব্যাপী তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহে যে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতির যে ক্ষতি হচ্ছে, মার্কিন অবরোধ সেই ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দেওয়ার আগেই কি ইরানের ওপর চাপ তৈরি করে তাদের আচরণ পরিবর্তন করা যাবে? যদি তা না হয়, তবে ট্রাম্পের এই নতুন কৌশল আরেকটি রাজনৈতিক ফাঁদে পরিণত হতে পারে এবং চলমান এই যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব আরও গভীর করতে পারে, যা এরই মধ্যে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির আশাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
ইরানের অর্থনীতি
ট্রাম্পের যুদ্ধকালীন নেতৃত্বের অন্যান্য সিদ্ধান্তের মতো এই অবরোধের বিষয়টিও তাৎক্ষণিক এবং মার্কিন জনগণের কাছে অস্পষ্ট মনে হতে পারে। তবে সামরিক দিক থেকে এটি একটি বাস্তবসম্মত উদ্যোগ। ওই অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর পর্যাপ্ত সক্ষমতা রয়েছে। এ ছাড়া সাবেক যুগোস্লাভিয়া, হাইতি এবং সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে ভেনেজুয়েলার তেলের ট্যাংকারগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের মাধ্যমে এ ধরনের অবরোধ আরোপের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।
ওয়াশিংটনে গত কয়েক দিনে ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিস’–এর (এফডিডি) একটি বিশ্লেষণ ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, হরমুজ প্রণালির বাইরে মার্কিন জাহাজগুলোর অবস্থান এবং বিমান ও পদাতিক বাহিনীর সহায়তায় এই অবরোধ কার্যকর হতে পারে।
এফডিডির জ্যেষ্ঠ ফেলো মিয়াদ মালেকি যুক্তি দিয়েছেন, এই অবরোধ দ্রুত ইরানের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে; যা দেশটির অধিকাংশ বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়া ও তেল রপ্তানি থামিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি কয়েক দিনের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করবে।
বিশ্লেষণের তথ্য অনুযায়ী, ইরান এই পরিকল্পনার মুখে বিশেষভাবে নাজুক। কারণ, দেশটির বার্ষিক ১০ হাজার ৯৭০ কোটি ডলারের বাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি সম্পন্ন হয় এই প্রণালি দিয়ে। এ ছাড়া সমুদ্রপথে তেল পাঠাতে না পারলে তা মজুত করার জায়গাও থাকবে না দেশটির। ফলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরান তেল উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে। তাই আকাশপথে সামরিক হামলা যা পারেনি, এই অবরোধের মাধ্যমে ইরানের বিকল্পগুলো সেভাবে সংকুচিত করার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এই অবরোধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। এই অভিযানের একটি পরোক্ষ উদ্দেশ্য হলো চীন ও ভারতের মতো দেশগুলো—যারা ইরান থেকে তেল কেনে, তাদের ওপর চাপ তৈরি করা, যাতে তারা তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরতে বাধ্য করে। কিন্তু মার্কিন বাহিনী যদি ইরান থেকে আসা কোনো চীনা জাহাজ আটক করে, তবে তা একটি বড় কূটনৈতিক সংকটের জন্ম দিতে পারে।
চুক্তির বিষয়ে আশাবাদী যুক্তরাষ্ট্র
গত সপ্তাহে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর হোয়াইট হাউস এখন বেশ আত্মবিশ্বাসী, এই নতুন অবরোধ ইরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনবে। একটি সফল শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য উভয় পক্ষকেই এমন একটি সাধারণ ক্ষেত্র তৈরিতে কাজ করতে হবে, যেখানে প্রত্যেকের স্বার্থ ও লক্ষ্য পূরণ হবে এবং নিজ নিজ দেশের জনগণের কাছে সেটিকে জয় হিসেবে তুলে ধরা যাবে।
এটি করতে সম্ভবত বহু মাস লাগবে, যার মধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিজ্ঞান ও নিউক্লিয়ার ফিজিকসের মতো জটিল বিষয়গুলো নিয়ে নিবিড় আলোচনার প্রয়োজন হবে। এর জন্য বর্তমান প্রশাসনকে এমন গভীরতা, সূক্ষ্মতা ও ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে, যা তাদের কূটনীতিতে এযাবৎকাল অনুপস্থিত ছিল। ট্রাম্পের এই নতুন ইরান অবরোধ নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হয়তো এটি নয়, এটি ব্যর্থ হলে কী হবে; বরং প্রশ্নটি হলো, যদি এটি কাজ করে, তবে এরপর কী ঘটবে?