হরমুজ প্রণালির কাছে একটি কার্গো জাহাজ
হরমুজ প্রণালির কাছে একটি কার্গো জাহাজ

ইরানের বন্দরে ট্রাম্পের নৌ অবরোধ কি আদৌ কাজে দিচ্ছে

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে গত শনিবার শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঠুনকো যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ এখন আটকে আছে হরমুজ প্রণালিতে।

পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরকে সংযুক্তকারী এই ১০০ মাইল দীর্ঘ জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন করা হয়। গত সোমবার এই প্রণালির পূর্ব উপকূল এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, যেকোনো দেশের পতাকাবাহী জাহাজ এই অবরোধ উপেক্ষা করলে সেটিকে আটকানো, ফেরত পাঠানো বা জব্দ করা হতে পারে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা জানান, এ অভিযান পরিচালনায় ১৫টির বেশি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেছেন, ভেনেজুয়েলার উপকূলে মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে যেভাবে জাহাজে হামলা চালানো হয়েছিল, ইরানের বন্দর থেকে যাওয়া জাহাজগুলোর বেলায়ও একই পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ট্রাম্পের এই হুমকির পরই বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বেড়ে যায়। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী বলেছে, খাদ্যসহ মানবিক সহায়তার পণ্য বহনকারী জাহাজ এই অবরোধের আওতায় পড়বে না।

এরই মধ্যে ট্রাম্পের হুমকি ও অবরোধকে পাত্তা না দিয়ে চীনের মালিকানাধীন ‘রিচ স্টারি’ নামে একটি তেলবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হয়ে গেছে।

অবরোধ আসলে কীভাবে কাজ করছে

এই অবরোধের কার্যকারিতা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। মূলত ইরানের বন্দর ও উপকূল থেকে আসা-যাওয়া করা জাহাজগুলোই এর লক্ষ্য। ওয়াশিংটন বলেছে, ইরানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই, এমন জাহাজকে ঘাঁটানো হবে না।

তবে ট্রাম্পের আরেকটি নির্দেশনায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়েছে। তিনি নৌবাহিনীকে এমন জাহাজও চিহ্নিত করতে বলেছেন, যেগুলো ইরানকে ট্রানজিট ফি বা টোল দেয়। এর ফলে চীনের তেলবাহী ট্যাংকার এবং ভারতের কিছু বাণিজ্যিক জাহাজও নজরদারির মুখে পড়তে পারে, যদিও তারা এই যুদ্ধের সরাসরি পক্ষ নয়।

অবরোধ কার্যকর হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অন্তত পাঁচটি তেলবাহী জাহাজ চলাচল করেছে। শুধু ১৩ থেকে ১৪ এপ্রিলের মধ্যেই সব ধরনের মিলিয়ে আটটি জাহাজ এই প্রণালি পার হয়েছে বলে জাহাজ চলাচল বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার জানিয়েছে।

নিউইয়র্ক ল স্কুলের আন্তর্জাতিক আইন বিভাগের সহপরিচালক অধ্যাপক ব্যারি অ্যাপলটন বলেন, জলপথটি অত্যন্ত সরু, মাইনের ঝুঁকি আছে এবং সক্রিয় সংঘর্ষ চলছে। এখন এখানে প্রতিটি জাহাজের চলাচলের ওপর নজর রাখার দায়িত্ব পড়েছে মার্কিন নৌবাহিনীর ওপর। এটা স্বাভাবিক কোনো অবরোধ নয়, এটা যুদ্ধক্ষেত্রে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের কৌশল।

ওমানের মুসান্দাম প্রদেশের উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালিতে অবস্থানরত একটি জাহাজ। ১২ এপ্রিল ২০২৬

অবরোধ কি কাজে দিচ্ছে

অবরোধ কার্যকর হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অন্তত পাঁচটি তেলবাহী জাহাজ চলাচল করেছে। শুধু ১৩ থেকে ১৪ এপ্রিলের মধ্যেই সব ধরনের মিলিয়ে ৮টি জাহাজ এই প্রণালি পার হয়েছে বলে জাহাজ চলাচল বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার জানিয়েছে।

কেপলারের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক জোহানেস রাউবাল বলেন, এই অবরোধের মূল উদ্দেশ্য ইরানের তেল রপ্তানি কমিয়ে দিয়ে দেশটির উৎপাদনব্যবস্থায় ধস নামানো।

ইরান বহুদিন ধরেই নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ‘ছায়া বহর’ বা পরিচয় লুকানো জাহাজ ব্যবহার করে আসছে। এসব জাহাজ মাঝসমুদ্রে গোপনে তেল আদান-প্রদান করে, যা মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ।

তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, অবরোধ শুরুর আগেই ইরান বিশাল পরিমাণ তেল মজুত করে রেখেছিল। এই সপ্তাহে সমুদ্রে ভাসমান ইরানি তেলের মজুত বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ ব্যারেলে, যা ১২ এপ্রিল ছিল ৩ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল।

কোনো জাহাজ তেল নিয়ে সাত দিন বা তার বেশি সময় এক জায়গায় স্থির থাকলে বা ধীরগতিতে চললে তাকে ভাসমান মজুত বলে। সাধারণত মূল্যবৃদ্ধির অপেক্ষায় বা পাইপলাইনে জায়গা না হলে এভাবে তেল মাঝসমুদ্রে রাখা হয়।

চাহিদার তুলনায় ইরানের তেল সরবরাহ বেশি থাকায় অনেক জাহাজ তেল খালাস করতে বা নতুন ক্রেতা খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে।

রাউবাল বলেন, এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে চীনের ওপর। কারণ, ইরানের বেশির ভাগ তেলের ক্রেতাই তারা। তবে চীনের কাছে এখন অন্তত ১২০ দিনের তেলের মজুত রয়েছে। পীত সাগর, দক্ষিণ চীন সাগরসহ ইরানি তেলের মোট ভাসমান মজুত এখন প্রায় ১৯ কোটি ব্যারেল। ফলে স্বল্প মেয়াদে বড় কোনো সংকটের আশঙ্কা কম।

ওমানের মুসানদাম প্রদেশের উপকূলে হরমুজ প্রণালিতে অবস্থানরত একটি জাহাজ
ইরান যদি এই অবরোধকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে, তবে নতুন সামরিক সংঘর্ষ বাধতে পারে। সে ক্ষেত্রে শুধু হরমুজ প্রণালি নয়, পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল অবকাঠামো, বিশেষ করে সৌদি আরব ও লোহিত সাগরের ইয়ানবুর রপ্তানি স্থাপনাগুলো আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। আর তাতে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম আরও বড় লাফ দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এর মধ্যে আরেকটি বড় সমস্যা হলো, ইরান বহুদিন ধরেই নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ‘ছায়া বহর’ বা পরিচয় লুকানো জাহাজ ব্যবহার করে আসছে। এসব জাহাজ মাঝসমুদ্রে গোপনে তেল আদান-প্রদান করে, যা মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ।

লয়েডস লিস্ট জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত এমনই একটি জাহাজ ভুয়া পতাকা ব্যবহার করে ধরা না পড়েই হরমুজ পার হয়ে গেছে।

চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষক নিল কুইলিয়াম বলেন, অবরোধ কতটা কাজে দিচ্ছে, তা এখনই বলার সময় আসেনি। তবে এটা ঠিক, ইরানের জাহাজগুলোর জন্য হরমুজ পার হওয়া এখন অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে কিছু জাহাজ ঝুঁকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করছে। তিনি এটিকে স্নায়ুযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ‘দুই পক্ষই দেখছে কে আগে সরে যায়।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাফি গৌরীর মতে, পানির নিচে চলা মানববিহীন যান, যেগুলো টানা ৯৬ ঘণ্টা পর্যন্ত ডুবে থাকতে পারে, সেগুলো মার্কিন নৌবহরের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের রাজনৈতিক অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক অশোক কুমার অবশ্য বলছেন, প্রায় পাঁচ দশকের নিষেধাজ্ঞায় অভ্যস্ত ইরানের ওপর নতুন করে চাপ দিলে অন্য অনেক দেশের মতো ফল আসবে না।

অশোক কুমারের কথায়, এই অবরোধ শক্তির প্রদর্শন নয়; বরং হতাশার প্রকাশ। ইরান আগেভাগেই বিপুল পরিমাণ তেল সমুদ্রে সরিয়ে রেখেছে, ফলে তাদের সরবরাহের বড় অংশই এখন নৌ অবরোধের ধরাছোঁয়ার বাইরে।

অবরোধ কি নতুন সংঘাত ডেকে আনবে

অধ্যাপক কুমারের আশঙ্কা, এ পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে। ইরান ইতিমধ্যে সতর্ক করেছে, সমুদ্রে যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘জলদস্যুতা’ চলতে থাকলে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের ওপর হামলা চালাবে।

বিশ্লেষক কুইলিয়াম বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলে এই অবরোধ ইরানের তেল রপ্তানি কমাবে এবং বিশ্বে তেলের দাম বাড়াবে। যুক্তরাষ্ট্র মূলত অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে চাইছে। কিন্তু দুই দশকের বেশি সময় ধরে নিষেধাজ্ঞা মাথায় নিয়ে চলা ইরান আগেও আলোচনায় আসতে বাধ্য হয়নি।

তবে সবচেয়ে বড় শঙ্কা হলো, ইরান যদি এই অবরোধকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে, তবে নতুন করে সামরিক সংঘর্ষ বাধতে পারে। সে ক্ষেত্রে শুধু হরমুজ প্রণালি নয়, পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল অবকাঠামো, বিশেষ করে সৌদি আরব ও লোহিত সাগরের ইয়ানবুর রপ্তানি স্থাপনাগুলো আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তাতে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম আরও বড় লাফ দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।