ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের মহড়া চালানো হচ্ছে
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের মহড়া চালানো হচ্ছে

আল জাজিরার এক্সপ্লেইনার

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র–সক্ষমতা ধ্বংসের দাবি করছে যুক্তরাষ্ট্র, তাহলে তারা এখনো কীভাবে হামলা চালাচ্ছে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসনে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ার সক্ষমতা অনেকটা কমে গেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে তাঁরা বলছেন, তেহরানের এখনো এমন কিছু সামরিক সক্ষমতা আছে, যেগুলো দিয়ে তারা উল্লেখযোগ্য ক্ষতিসাধন করতে পারে।

হোয়াইট হাউস গত শনিবার বলেছে, ‘ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র–সক্ষমতা কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। তাদের নৌবাহিনী যুদ্ধ চালানোর অবস্থায় নেই। আকাশপথে ইরানের ওপর আমাদের সম্পূর্ণ আধিপত্য রয়েছে।’

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ আগ্রাসন শুরু করে। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে যুক্তরাষ্ট্র এই আগ্রাসন শুরু করে। শনিবার হোয়াইট হাউস আরও বলেছে, ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামের সামরিক অভিযান বড় ধরনের ফল দিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার খুঁজে বের করা। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার সময় বড় বিস্ফোরণসহ কোনো না কোনো সংকেত তৈরি হয়। স্যাটেলাইট ও রাডার ব্যবস্থা দিয়ে সে সংকেত শনাক্ত করা যায়।

গত রোববার ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইরানের ড্রোন তৈরির সক্ষমতাও প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছে।

এর মধ্যে গতকাল সোমবার বিকেলে কাতার ঘোষণা দিয়েছে, তারা ইরান থেকে ছোড়া আরও একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন ক্ষেপণাস্ত্র হামলাজনিত সতর্কতা জারি করেছে। আবুধাবিতে একটি গাড়ির ওপর ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়লে একজন নিহত হন।

তাহলে আদৌ কি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র–সক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমে গেছে? যদি কমে গিয়েই থাকে, তাহলে তারা প্রতিবেশী দেশ ও ইসরায়েলের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র কীভাবে ছুড়ছে?

ইরানের স্বল্প পাল্লার একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র

ইরান কি এখন কম ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে

হ্যাঁ। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় দেশগুলো, ইসরায়েল ও অঞ্চলের অন্যান্য দেশের দিকে ইরান প্রতিশোধমূলকভাবে যেসব হামলা চালাচ্ছে, সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সংঘাত শুরুর প্রথম ২৪ ঘণ্টায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে ১৬৭টি ক্ষেপণাস্ত্র (ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ) ছুড়েছিল ইরান। একই সময়ে আরব আমিরাতের দিকে ৫৪১টি ড্রোন পাঠিয়েছিল তারা।

তবে যুদ্ধের ১৫তম দিনে সে সংখ্যা অনেক কমে গেছে। আল–জাজিরার হিসাব অনুযায়ী, সেদিন ইরান মাত্র চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে এবং ছয়টি ড্রোন উড়িয়েছে। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি থেকে এই তথ্য নেওয়া হয়েছে।

ইসরায়েলের দিকেও হামলার মাত্রা কমেছে। যুদ্ধের প্রথম দুই দিনে সেখানে প্রায় ১০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল। গত কয়েক দিনে সেই সংখ্যা এক অঙ্কে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ।

স্থলসেনা পাঠানো ছাড়া ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার সক্ষমতাকে সম্পূর্ণভাবে শেষ করা কঠিন হবে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দেশটির আকাশপথে প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পেলেও তা সম্ভব হবে না। সে কারণে ইরান কিছুটা হলেও তার বিদ্যমান ব্যবস্থা ব্যবহার করে যাচ্ছে।
ডেভিড ডেস রোচেস, ওয়াশিংটন ডিসির ন্যাশনাল ডিফেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক

গত সপ্তাহে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন বলেছে, যুদ্ধের প্রথম দিনের তুলনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ৯০ শতাংশ কমেছে এবং ড্রোন হামলা ৮৬ শতাংশ কমেছে।

২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালকের কার্যালয় থেকে করা এক পর্যালোচনায় বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে ইরানে সবচেয়ে বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মজুত আছে। তবে ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ঠিক কত, তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

ইসরায়েলের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের কাছে প্রায় তিন হাজার ক্ষেপণাস্ত্র আছে বলে তারা ধারণা করছে। গত বছরের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে হওয়া ১২ দিনের যুদ্ধে সে সংখ্যা কমে ২ হাজার ৫০০টিতে নেমে গিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার খুঁজে বের করা। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার সময় বড় বিস্ফোরণসহ কোনো না কোনো সংকেত তৈরি হয়। স্যাটেলাইট ও রাডার ব্যবস্থা দিয়ে সে সংকেত শনাক্ত করা যায়।

এক ঊর্ধ্বতন ইসরায়েলি সেনা কর্মকর্তার বরাতে ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব দ্য ওয়ার বলেছে, প্রায় ৪১০-৪৪০টি লঞ্চারের মধ্যে ২৯০টি লঞ্চার অচল করা হয়েছে।

তবে ইরান একটি বিশাল দেশ। ওয়াশিংটন ডিসির ন্যাশনাল ডিফেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ডেভিড ডেস রোচেস আল–জাজিরাকে বলেন, স্থলসেনা পাঠানো ছাড়া ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার সক্ষমতাকে সম্পূর্ণভাবে শেষ করা কঠিন হবে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দেশটির আকাশপথে প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পেলেও তা সম্ভব হবে না। সে কারণে ইরান কিছুটা হলেও তার বিদ্যমান ব্যবস্থা ব্যবহার করে যাচ্ছে।

ডেভিড ডেস রোচেসের মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার গতি ধীর হওয়ার মূল কারণ হলো, তাদের একসঙ্গে বহু ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ক্ষমতা কমে যাওয়া। এর ফলে ইরান এখন একসঙ্গে বড় ধরনের হামলা না চালিয়ে এক বা দুটি ড্রোন একই সময়ে ছুড়ছে। বড় আকারের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে একসঙ্গে হামলা করার পরিবর্তে তারা উপসাগরীয় দেশগুলোর বেসামরিক ও বাণিজ্যিক অবকাঠামোর দিকে হামলা চালাচ্ছে।

ডেস রোচেস বলেন, ‘সামরিকভাবে বিবেচনা করলে এটা (ইরানের কার্যক্রম) তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। এটাকে হয়রানিমূলক হামলা বলা হয়। অর্থাৎ প্রতিবেশী দেশগুলোর সতর্কতা ব্যবস্থা বারবার চালু করানোর মধ্য দিয়ে সেটিকে অব্যবহারযোগ্য করে তোলা এবং মানুষকে ভয় দেখানো।’

২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালকের কার্যালয়ের এক পর্যালোচনায় বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে ইরানে সবচেয়ে বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মজুত আছে

ইরানের কৌশল কী

জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের ভিজিটিং ফেলো হামিদরেজা আজিজি বলেন, তেহরানের মূল হিসাবটা হচ্ছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ফুরিয়ে যাওয়ার আগে উপসাগরীয় দেশগুলো ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা–সক্ষমতা ফুরিয়ে যাবে।

আজিজি বলেন, ‘ইরান হয়তো এই যুদ্ধে ধৈর্যের যুদ্ধ চালানোর দিকে আগ্রহী’,—এ কথা বোঝাতে তিনি ইরান থেকে প্রতিদিন ছোড়া কম হলেও ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্রের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।

আজিজি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের কিছু লঞ্চার ও বড় ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ধ্বংস করতে সফল হলেও তেহরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাপনাকে বিকেন্দ্রীভূত করেছে। তারা এখন মোবাইল লঞ্চারের ওপর বেশি নির্ভর করছে। এটিকে শনাক্ত ও লক্ষ্যবস্তু করা অনেক কঠিন।

আজিজি বলেন, ‘এটি সময়কে পাল্লা দেওয়ার বিষয়।’

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ইরান বিশ্বাস করে, তাদের হাতে এখনো সুযোগ আছে।

দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের ক্রিটিক্যাল সিকিউরিটি স্টাডিজের সহকারী অধ্যাপক মুহানাদ সেলুম আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আপনি কতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছেন বা ড্রোন ওড়াচ্ছেন, তা ততক্ষণ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতক্ষণ না তা বিশ্বাসযোগ্য হুমকি তৈরি করছে। শুধু একটি সফল ড্রোনই নিরাপত্তার ধারণা ভেঙে দিতে পারে।’

ইরান দীর্ঘদিন ধরে সস্তা, কিন্তু কার্যকর ড্রোন তৈরির অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। শাহেদ ১৩৬ ড্রোন সাধারণ কারখানায় দ্রুত সময়ের মধ্যে অনেকগুলো তৈরি করে ফেলা যায়। তা ছাড়া এ ধরনের ড্রোন একসঙ্গে অনেকগুলো ছোড়া যায় এবং এর মধ্য দিয়ে প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করা যায়।

শাহেদ ১৩৬ ড্রোনের জন্য জটিল উৎক্ষেপণ ব্যবস্থার প্রয়োজন হয় না। এ ড্রোনের গতি ঘণ্টায় মাত্র ১৮৫ কিলোমিটার হওয়ায় হেলিকপ্টার দিয়ে এটিকে ধ্বংস করা সম্ভব। এরপরও অনেক ড্রোন ইসরায়েল, মার্কিন অবকাঠামো ও উপসাগরীয় দেশের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পার হতে পেরেছে।

গতকালই সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে একটি ড্রোন হামলায় আগুন লেগে ফ্লাইট সাময়িকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। আরেকটি ড্রোন হামলায় ফুজাইরাহ শিল্প এলাকায় আগুন লেগেছে। এটিও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে। এ ছাড়া ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় অংশে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পূর্বাভাস দিয়ে সাইরেন বাজানো হয়েছে।

বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালিতে শত শত জাহাজ হামলার আশঙ্কায় স্থবির হয়ে আছে, যদিও জাহাজের ওপর হামলা খুব কম হয়েছে। যুদ্ধের শুরু থেকে একটি মেরিটাইম ট্র্যাকার ২০টি জাহাজসংক্রান্ত ঘটনা নথিভুক্ত করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ইরানের অসামঞ্জস্যপূর্ণ যুদ্ধের কৌশলের একটি অংশ। যেহেতু ইরান সামরিকভাবে দুর্বল, তাই তারা অপ্রচলিত পদ্ধতিতে শত্রুর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে অর্থনৈতিক ক্ষতি করার চেষ্টা করছে।

তেহরান ইতিমধ্যে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। বিশ্ববাজারে আতঙ্ক তৈরি করেছে তারা। কাতার তার গ্যাস উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। বাহরাইনের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি চালান পাঠানো বন্ধ করেছে এবং ইরাকের দক্ষিণের বড় তেলক্ষেত্রে উৎপাদন ৭০ শতাংশ কমেছে।

জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভালি নাসর মনে করেন, ইরান যদি তেলের মূল্য আরও বৃদ্ধি করাতে পারে, তাহলে এটি ইরানে মার্কিন বোমা হামলায় হওয়া ক্ষয়ক্ষতির সমান বা তার চেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির শিকার হবে যুক্তরাষ্ট্র।