
ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতিরা অত্যাধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। এ অস্ত্র তৈরিতে তারা ব্যবহার করছে চীনের বানানো যন্ত্রাংশ। সফল হয়ে সেই ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের যেকোনো জায়গায় হামলা চালাতে পারবে হুতিরা। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে এ কথা জানিয়েছে।
‘খাইবার শেখান’ নামে ইরানের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আছে। হুতিরা সেটার আদলে অত্যাধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। এটি একদিকে নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে, অন্যদিকে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে মাঝ আকাশে গতিপথ বদলে নিতে পারে।
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য-প্রমাণ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, অন্তত দুই বছর ধরে চীন থেকে কঠিন জ্বালানিচালিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ আমদানি করছে হুতিরা।হেনরি টমসন, ইয়েমেনের ওপর নিষেধাজ্ঞাবিষয়ক জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক পর্ষদের সাবেক বিশেষজ্ঞ।
সংঘাতপূর্ণ এলাকায় অস্ত্রের উৎস ও সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা সংস্থা কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চের (সিএআর) অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সিএআর আরও জানিয়েছে, ইরানি নকশা অনুসরণ করে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা হতে পারে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ মাইলের বেশি। সে ক্ষেত্রে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের পুরো ভূখণ্ড এর আঘাতের আওতায় আসতে পারে।
ইয়েমেনের বড় অংশ এখন হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। সেসব জায়গা পুনরুদ্ধারে লড়াই করছে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সেনাবাহিনী। তাদের সমর্থন করছে সৌদি আরব। এ কারণে সৌদির সঙ্গে হুতিদের পুরোনো বিরোধ নতুন মাত্রা পেয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় সৌদি আরবে হুতিদের হামলাও বেড়েছে।
ইরানে যুদ্ধ চলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নির্বিচার হামলার মুখে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানির জাহাজ চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। এতে খেপেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সমালোচনা করে নিজের ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প বলেছেন, হুতিরা ‘খুবই খারাপ আচরণ’ করছে।
দুটি চালান জব্দ
ইয়েমেনের কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি করেছে সিএআর। গত জুলাইয়ে এসব তথ্য সরবরাহ করেছে ইয়েমেনি কর্তৃপক্ষ। তার আগে গত বছর কর্তৃপক্ষ হুতিদের দুটি চালান জব্দ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুটি চালানে অন্য পণ্যের আড়ালে ক্ষেপণাস্ত্র বানানোর সরঞ্জাম নেওয়া হচ্ছিল।
জব্দ করা সরঞ্জামের মধ্যে ছিল ক্ষেপণাস্ত্রের ইঞ্জিন ও মূল কাঠামো তৈরির জন্য বিশেষভাবে বানানো ধাতব যন্ত্রাংশ। ছিল উড্ডয়নের সময় ক্ষেপণাস্ত্রের ভারসাম্য ধরে রাখার পাখা। তদন্তকারীরা এসব চালানে ইরানের ‘খাইবার শেখান’ ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহার হওয়া কঠিন জ্বালানিতে চলা রকেট ইঞ্জিনের সঙ্গে সম্পর্কিত যন্ত্রাংশ শনাক্ত করেছেন।
এ ছাড়া ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সরঞ্জাম, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল জব্দ করেছে ইয়েমেনের কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে বিশেষ তাপরোধী একধরনের উপাদান ছিল। উড্ডয়নের সময় প্রচণ্ড তাপ থেকে ক্ষেপণাস্ত্রের কিছু অংশকে রক্ষা করতে এ উপাদান ব্যবহার করা হয়।
এখন পর্যন্ত হুতিদের জন্য পাঠানো যেসব পণ্য জব্দ করা হয়েছে, সেসবের সবচেয়ে বড় উৎস চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো। হুতিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এনে ড্রোন তৈরির যন্ত্রাংশ সরবরাহের যেসব প্রতিষ্ঠানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে; সেগুলোর বেশির ভাগই চীন থেকে পরিচালিত হয়।
সিএআরের হাতে আসা চালানের নথিতে চীনের একটি সূক্ষ্ম ধাতব যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল। প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের মহাকাশযানের বিশেষায়িত যন্ত্রাংশের প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় দেয়; যদিও প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির নাম প্রকাশ করা হয়নি।
আমদানি করা কিছু যন্ত্রাংশ বেসামরিক কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। তবে কিছু যন্ত্রাংশ বিশেষভাবে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য নকশা করা হয়েছে। ফলে এসব সরঞ্জাম কীভাবে সংগ্রহ ও সরবরাহ করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দুই বছর ধরে আমদানি
২০২২ সালে ‘খাইবার শেখান’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রথম প্রদর্শন করে তেহরান। এ অস্ত্র তুলনামূলক কম খরচে বানানো যায়। এটি সহজে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়া সম্ভব।
‘খাইবার শেখান’ ক্ষেপণাস্ত্রটি নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। উড্ডয়নের সময় গতিপথ পরিবর্তন করতে পারায় এটিকে মাঝপথে ঠেকানো কঠিন। তাই প্রচলিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় এটি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
ইয়েমেনের ওপর নিষেধাজ্ঞাবিষয়ক জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক পর্ষদের সাবেক বিশেষজ্ঞ হেনরি টমসন বলেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য–প্রমাণ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, অন্তত দুই বছর ধরে চীন থেকে কঠিন জ্বালানিচালিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ আমদানি করছে হুতিরা।
মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সহায়তায় হুতিরা সৌদি আরবের অনেক ভেতরের এলাকাতেও আঘাত হানতে পারবে। এসব ক্ষেপণাস্ত্রে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের তুলনায় বেশি বিস্ফোরক বহন করা যাবে। এর ফলে হুতিরা আরও শক্তিশালী হুমকি হয়ে উঠতে পারবে—বলেন হেনরি টমসন।
চীনের ভূমিকা বাড়ছে
সিএআরের অনুসন্ধানে হুতিদের অস্ত্র কর্মসূচিতে সহায়তাকারী বিদেশি সরবরাহকারীদের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের চিত্র উঠে এসেছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন এবং অস্ত্রবিশেষজ্ঞদের সংগ্রহ করা তথ্যে দেখা গেছে, এখন পর্যন্ত হুতিদের জন্য পাঠানো যেসব পণ্য জব্দ করা হয়েছে, সেসবের সবচেয়ে বড় উৎস চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো। হুতিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এনে ড্রোন তৈরির যন্ত্রাংশ সরবরাহের যেসব প্রতিষ্ঠানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে; সেগুলোর বেশির ভাগই চীন থেকে পরিচালিত হয়।
হুতিদের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে জাতিসংঘ। যুক্তরাষ্ট্রে হুতিরা ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত। এ পরিস্থিতিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চীনসহ বিভিন্ন সরবরাহকারীদের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে হুতিরা।
গত বছর ওয়াশিংটন অভিযোগ করেছিল, চীনের একটি প্রতিষ্ঠান লোহিত সাগরে মার্কিন জাহাজে হামলা চালাতে হুতিদের সহায়তা করেছে।
বেইজিং জানিয়েছে, হুতিদের কাছে অস্ত্র বিক্রির ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞাকে তারা সম্মান করে। তবে এ ক্ষেত্রে বেসামরিক আর সামরিক ব্যবহারের উপযোগী পণ্যের মধ্যে পার্থক্য থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, হুতিদের আমদানি করা কিছু পণ্য বেসামরিক ও সামরিক উভয় কাজেই ব্যবহার করা যায়। আবার কিছু পণ্য বিশেষভাবে অস্ত্র ব্যবস্থায় ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়।
এবারই প্রথম নয়
হুতিদের যে দুটি চালান জব্দের কথা সম্প্রতি আলোচিত হচ্ছে, এটাই প্রথম ঘটনা নয়। এর আগেও হুতিদের বিদেশ থেকে বিশেষায়িত ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ সংগ্রহের চেষ্টা করতে দেখা গেছে।
২০২৪ সালের শেষের দিকে সিএআরের বিশেষজ্ঞরা স্বল্পপাল্লার ‘সদর’ ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একই ধরনের বিশেষভাবে বানানো যন্ত্রাংশ আমদানির তথ্য নথিবদ্ধ করেন। তবে সরবরাহকারী কে ছিল, তা এখনো জানা যায়নি।
নতুন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, হুতিদের অস্ত্র ব্যবস্থার যন্ত্রাংশ সংগ্রহের এমন চেষ্টা এখন আর সেসবে সীমাবদ্ধ নেই। তা আরও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে থাকতে পারে।