যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার দরজা খোলা রাখতে এবং একটি শান্তিচুক্তির দিকে অগ্রসর হতে পর্দার আড়ালে দুই দেশের মধ্যে প্রস্তাব আদান-প্রদান করছে পাকিস্তান। পাকিস্তান সরকারের কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা এমনটাই বলছেন।
পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বলছেন, তাঁরা এই বাস্তবতার বিষয়ে সচেতন যে বর্তমানে কেবল আঞ্চলিক শান্তিই ঝুঁকির মুখে নেই, বরং বৈশ্বিক স্বাভাবিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং পাকিস্তানসহ বিশ্বের কোটি কোটি দরিদ্র মানুষের জীবন–জীবিকাও সংকটে পড়েছে। যুদ্ধের ফলে পাকিস্তানের মাসিক জ্বালানি আমদানি ব্যয় প্রায় তিন গুণ বেড়েছে।
তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতি অব্যাহত থাকাকে একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে ইসলামাবাদ। তেহরান ও ওয়াশিংটন উভয়েই জানিয়েছে, পাকিস্তান আলোচনার প্রাথমিক মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ গত বুধবার জানান, ইরানের কাছ থেকে একটি সংশোধিত প্রস্তাব পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন তিনি।
সরাসরি আলোচনার গতি থমকে যাওয়ার পর সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পাকিস্তানের দৃশ্যমান ভূমিকা পরিবর্তিত হয়ে একটি গোপনীয় কিন্তু জরুরি মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ায় রূপ নিয়েছে। ইসলামাবাদ বিশ্বাস করে, মুখোমুখি বৈঠক ছাড়াও শান্তি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে এক জটিল ভূমিকা পালন করছে। ইরান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় এগোচ্ছে; কিন্তু আমেরিকা দ্রুত ফলাফল চায়।— মাসুদ খান, যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত
গত এপ্রিলে ইসলামাবাদে রাতব্যাপী আলোচনার মাধ্যমে দুই পক্ষকে একই টেবিলে বসানোর বড় ধরনের অগ্রগতির পর বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় দেশই নিজ নিজ অবস্থানে অনড় রয়েছে। ইরানে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর এটিই ছিল দুই পক্ষের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ।
তেহরানের দাবি অনুযায়ী, ওই আলোচনা একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিল, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র আকস্মিকভাবে বৈঠক থেকে বেরিয়ে যায়। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের দাবি, ইরান যথেষ্ট ছাড় দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল না। গত সপ্তাহে ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফার আলোচনার একটি উদ্যোগ ভেস্তে যায়। কারণ, ইরানি পক্ষ মার্কিন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বসতে অস্বীকৃতি জানায়। যদিও মার্কিন দলটি সেখানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল।
মার্কিন কর্মকর্তারা এই সপ্তাহে ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন আবারও যুদ্ধে ফেরার কথা বিবেচনা করছে। ইরানের কিছু পক্ষ হতাশা প্রকাশ করে বলেছে, আলোচনায় দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রকে বাধ্য করতে পারেনি পাকিস্তান।
ইসলামাবাদ বিশ্বাস করে, একটি সমঝোতা এখনো সম্ভব। তবে তারা এমন এক পরিস্থিতির সম্মুখীন, যেখানে ইরান তার অবস্থানের অতিরিক্ত সুযোগ নেওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে আর অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসন কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার চেয়ে একতরফা বিজয় অর্জনে বেশি আগ্রহী।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুদ খান বলেন, পাকিস্তান কেবল দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানই করছে না। ইসলামাবাদের হস্তক্ষেপের ফলেই শুরুতে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল এবং পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বৈঠকটি সম্ভব হয়েছিল। তিনি আরও জানান, ইসলামাবাদ ট্রাম্পকে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে রাজি করিয়েছে, যার বর্তমানে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই।
মাসুদ খান জানান, পাকিস্তানের পরবর্তী লক্ষ্য ছিল উভয় পক্ষকে হরমুজ প্রণালিতে দেওয়া নিজ নিজ অবরোধ একযোগে তুলে নিতে রাজি করানো। তবে চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প বলেছেন, বোমাবর্ষণের চেয়ে অবরোধ বেশি কার্যকর। অন্যদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি হরমুজ প্রণালির এই অবস্থাকে একটি ‘নতুন অধ্যায়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এতে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, কোনো পক্ষই পিছু হটতে রাজি নয়।
মাসুদ খান বলেন, ‘পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে এক জটিল ভূমিকা পালন করছে। ইরান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় এগোচ্ছে, কিন্তু আমেরিকা দ্রুত ফলাফল চায়।’
গত এপ্রিলে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির তেহরানে তিন দিন অবস্থান করে ইরানের বিভিন্ন ক্ষমতা কেন্দ্রের (পক্ষের) সঙ্গে বৈঠক করেন। একই সময়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আঞ্চলিক সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্ক সফর করেছেন। কূটনৈতিক এই প্রচেষ্টায় সংহতি জানাতে ইসলামাবাদ জাপানের মতো দূরবর্তী দেশগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে। এ ছাড়া চলতি সপ্তাহে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপারের সঙ্গেও কথা বলেছেন।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আনদ্রাবি বলেন, ‘কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখনো থেমে যায়নি।’ সরাসরি বৈঠক সম্ভব না হলে দুই পক্ষ অন্তত ফোনে কথা বললেও তা সহায়ক হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুরোনো, নতুন—সব ধরনের প্রস্তাবই এখন আলোচনার টেবিলে রয়েছে।
ইরানের পক্ষ থেকে দেওয়া সর্বশেষ প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার কথা বলা হলেও দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার বিষয়টি স্থগিত রাখা হয়েছে। এই প্রস্তাবটি পাকিস্তানের মাধ্যমেই আদান-প্রদান করা হয়। তবে ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানকে অবশ্যই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন না করার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।
ইসলামাবাদ বিশ্বাস করে, একটি সমঝোতা এখনো সম্ভব। তবে তারা এমন এক পরিস্থিতির সম্মুখীন যেখানে ইরান তার অবস্থানের অতিরিক্ত সুযোগ নেওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে আর অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসন কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার চেয়ে একতরফা বিজয় অর্জনে বেশি আগ্রহী।
পারমাণবিক ইস্যুতে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত করা এবং উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের বিষয়ে এখনো কোনো সমাধান আসেনি।
আলোচনা সম্পর্কে অবগত আঞ্চলিক কূটনীতিকেরা জানিয়েছেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ১০ বছরের জন্য স্থগিত (মোরাটোরিয়াম) রাখার বিষয়ে একটি ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে। এটি মূলত দুই পক্ষের দর-কষাকষির মধ্যবর্তী একটি অবস্থান। উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করার যে দাবি যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তার পরিবর্তে সেগুলো ইরানের মিত্রদেশ রাশিয়ায় পাঠানো যেতে পারে। চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে এ সম্ভাবনা নিয়ে কথা হয়েছে।
তবে তেহরান এখন পর্যন্ত তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছেড়ে দিতে বা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার ত্যাগ করতে রাজি হয়নি।
ইসলামাবাদভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট অব রিজিওনাল স্টাডিজ’-এর প্রেসিডেন্ট ও পাকিস্তানের সাবেক শীর্ষ কূটনীতিক জওহর সেলিম বলেন, আরও ভালো চুক্তির আশায় আলোচনা দীর্ঘায়িত করার যে কৌশল ইরান নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে, তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে ওয়াশিংটনকেও এটি স্বীকার করতে হবে যে বছরে পর বছর ইরানের ওপর তাদের চাপ প্রয়োগের রাজনীতি খুব একটা কাজে আসেনি।
অভিজ্ঞ এই কূটনীতিক আরও বলেন, ‘ইরান সব দাবি মেনে নেবে—এমনটা ভাবা বাস্তবসম্মত নয়। একটি চুক্তিকে অবশ্যই উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক হতে হবে।’