গত শনিবার নেপালি বংশোদ্ভুত নির্মল পুরজার মৃত্যুর খবর জানায় তাঁর প্রতিষ্ঠান এলিট এক্সপেডিশনস
গত শনিবার নেপালি বংশোদ্ভুত নির্মল পুরজার মৃত্যুর খবর জানায় তাঁর প্রতিষ্ঠান এলিট এক্সপেডিশনস

কারাকোরামে তুষারধস: নিখোঁজ নির্মল পুরজার মরদেহ উদ্ধার

পাকিস্তানের কারাকোরাম পর্বতমালার ব্রড পিকে তুষারধসে নিখোঁজ বিশ্বখ্যাত পর্বতারোহী নির্মল পুরজার মরদেহ উদ্ধার করেছেন উদ্ধারকর্মীরা।

রোববার দ্য আলপাইন ক্লাব অব পাকিস্তান জানিয়েছে, পর্বতের প্রায় ৫ হাজার ৭০০ মিটার উঁচুতে নির্মল পুরজার মরদেহ পাওয়া গেছে। সেখানে আরও তিনটি মৃতদেহ দেখতে পেয়েছেন উদ্ধারকারীরা। তবে তাঁদের পরিচয় এখনও নিশ্চিত করতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।

গত শনিবার ৪৩ বছর বয়সী এই নেপালি বংশোদ্ভুত ব্রিটিশ পর্বতারোহীর মৃত্যুর খবর জানায় তাঁর প্রতিষ্ঠান এলিট এক্সপেডিশনস। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তুষারধসে নিহত ১০ জনের মধ্যে নির্মল পুরজাও আছেন। তাঁর মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন প্রিন্স অব ওয়েলসসহ আরও অনেকে।

নির্মল পুরজার জন্ম নেপালে। পরে তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কাজ করেন। ২০১৯ সালে মাত্র ছয় মাসের কিছু বেশি সময়ে বিশ্বের সর্বোচ্চ ১৪টি পর্বতশৃঙ্গ জয় করে তিনি ব্যাপক পরিচিতি পান।

গত বুধবার ব্রড পিকের চূড়ায় ওঠার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিল দলটি। এই অভিযাত্রী দলে নির্মল পুরজার নেতৃত্বে ১০ সদস্য ছিলেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে তুষারধসের পর তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বলে জানিয়েছে দেশটির আলপাইন ক্লাব পাকিস্তান (এসিপি)।

আলপাইন ক্লাব জানিয়েছে, একটি মাঠপর্যায়ের দল উদ্ধার করা মরদেহগুলো জাপানি ক্যাম্পে নিয়ে যাবে।

নির্মল পুরজার মৃত্যুর খবর প্রকাশের আগেই পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেনম পুরজার অভিযানের আরও তিন পর্বতারোহীর মৃতদেহ উদ্ধার করেছেন তাঁরা। নিহত এই পর্বতারোহীরা হলেন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যালরি গেইস, ওমানের নাধিরা আহমেদ আবদুল্লাহ আল হারথি এবং নেপালের পুর বাহাদুর গুরুং।

গত শনিবার নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বলেন, ‘পাকিস্তানের কারাকোরাম পর্বতমালায় বিশ্বরেকর্ডধারী নির্মল পুরজাসহ ছয় নেপালি ও চার বিদেশি পর্বতারোহীর মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের স্তব্ধ করে দিয়েছে।’

নেপালের প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘তাঁদের সাহস, একাগ্রতা ও অবদানের ইতিহাস সব সময় অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।’

এক বিবৃতিতে নির্মল পুরজার বড় ভাই কামাল লেখেন, ‘অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে এই মর্মান্তিক খবরটি জানাচ্ছি। আমার প্রিয় ছোট ভাই নির্মল “নিমসদাই” পুরজা এবং অন্য পর্বতারোহীরা আর আমাদের মাঝে নেই।’

তিনি আরও লেখেন, ‘আমাদের হৃদয় ভেঙে গেলেও আমরা তোমাকে নিয়ে ভীষণ গর্বিত। তোমার কীর্তি চিরকাল বেঁচে থাকবে।’

নির্মল পুরজার মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর শুনে গভীরভাবে শোকাহত হয়েছেন প্রিন্স উইলিয়াম। তিনি বলেন, সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পর্বতারোহী হওয়ার আগে পুরজা একজন সেনা হিসেবেও দারুণ সুনামের সঙ্গে কাজ করেছেন।

যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ‘নির্মল (নিমস) পুরজা ও তাঁর সহযাত্রী পর্বতারোহীদের মৃত্যুর খবরটি অত্যন্ত দুঃখজনক।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্মল পুরজা একজন অনুপ্রেরণাদায়ী মানুষ ছিলেন। দীর্ঘ সময় তিনি আমাদের সশস্ত্র বাহিনীতে কাজ করেছেন। তাঁর অবিশ্বাস্য সব পর্বত অভিযানের কথা সারা বিশ্ব জানে।’

নির্মল পুরজা

উদ্ধারকাজে যুক্ত আলপাইন ক্লাব অব পাকিস্তানের মুখপাত্র নায়লা কিয়ানি গত শনিবার বিবিসির নিউজআওয়ার অনুষ্ঠানে বলেন, ওই দলের সব সদস্যই মারা গেছেন বলে তাঁদের সংগঠন আশঙ্কা করছে। তিনি নিজেও এমন অনেক অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন, যেগুলোর নেতৃত্বে ছিলেন নির্মল পুরজা।

পুরজার নেতৃত্বের প্রশংসা করে কিয়ানি তাঁকে একজন ‘অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও নির্ভীক পর্বতারোহী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

কারাকোরাম পর্বতমালার ৮ হাজার ৪৭ মিটার (২৬ হাজার ৪০০ ফুট) উঁচু ব্রড পিকে গত বৃহস্পতিবার তুষারধসের ঘটনা ঘটে। বিশ্বের ১২তম সর্বোচ্চ এই শৃঙ্গে এরপর থেকেই নিখোঁজ পর্বতারোহীদের খুঁজছেন পাকিস্তানের উদ্ধারকারী দলগুলো।
বহুজাতিক এই পর্বতারোহী দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন পুরজা। ২০১৯ সালে আট হাজার মিটারের বেশি উঁচু বিশ্বের ১৪টি পর্বতশৃঙ্গ মাত্র ১৮৯ দিনে জয় করেন তিনি। আগের রেকর্ডটি ৭ বছরেরও বেশি সময়ের ব্যবধানে ভেঙে দিয়ে তিনি বিশ্বজুড়ে খ্যাতি লাভ করেন।

দুই বছর পর তাঁর এই অভিযানের ওপর ভিত্তি করে নেটফ্লিক্সে একটি প্রামাণ্যচিত্র মুক্তি পায়। ‘১৪ পিকস: নাথিং ইজ ইমপসিবল’ নামের ওই প্রামাণ্যচিত্রটি তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়।

সে সময় তিনি বলেছিলেন, ‘এই ছয় মাস ছিল অত্যন্ত ক্লান্তিকর, তবে একই সঙ্গে বিনয়ী করে তোলার মতো এক অভিজ্ঞতা। আমি আশা করি, এই অভিযানের মাধ্যমে আমি প্রমাণ করতে পেরেছি যে, একাগ্রতা, আত্মবিশ্বাস ও ইতিবাচক মনোভাব থাকলে যেকোনো কিছুই সম্ভব।’

ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ১৬ বছর কাজ করেছেন নির্মল পুরজা। এর মধ্যে ১০ বছরই তিনি ছিলেন স্পেশাল ফোর্সে। চরম উচ্চতায় পর্বত আরোহণে অসামান্য কৃতিত্বের জন্য ২০১৮ সালে প্রয়াত রানি তাঁকে সম্মানসূচক ‘এমবিই’ খেতাবে ভূষিত করেন।
দক্ষিণ ইংল্যান্ডের হ্যাম্পশায়ারে স্ত্রী ও তিন বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে থাকতেন নির্মল পুরজা। তিনি জানিয়েছিলেন, ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় এভারেস্ট জয় করা প্রথম গুর্খাও তিনি।

গত সোমবার এক্সে দেওয়া নিজের সর্বশেষ পোস্টে তিনি জানিয়েছিলেন, ব্রড পিকে আরোহণের কোনো পরিকল্পনাই তাঁর ছিল না।

কারাকোরাম পর্বতমালার আরেকটি শৃঙ্গ গাশারব্রুম-২ এর কথা উল্লেখ করে পুরজা লিখেছিলেন, ‘প্রাথমিকভাবে শুধু জি-২ (গাশারব্রুম-২) আরোহণের পরিকল্পনা ছিল।’
তবে পাকিস্তানের উদ্দেশে রওনা হওয়ার ঠিক আগে তিনি একটা বিষয় বুঝতে পারেন। তিনি ভাবেন, এই সুযোগে ব্রড পিক জয় করতে পারলে তাঁর সামনে আর মাত্র একটি পর্বত বাকি থাকবে। সেটি করতে পারলেই তিনি ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ‘বিনা অক্সিজেনে আট হাজারি ১৪টি শৃঙ্গ দুবার জয়ের’ অনন্য রেকর্ড গড়বেন।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮ হাজার মিটারের বেশি উঁচু পর্বতগুলোকে ‘আট হাজারি শৃঙ্গ’ বলা হয়।

পুরজা আরও লিখেছিলেন, ‘কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছিল না। তবে সুযোগ কখনো চিৎকার করে আসে না; বরং যারা নীরবে কাজ করে যায়, সুযোগ তাদের কানে কানে কথা বলে।’

ওই পোস্টে তিনি লেখেন, ‘ব্রড পিক, আমি শুধু নিরাপদে ওপরে ওঠা আর নিচে নেমে আসার পথটুকু চাই। কোনো পর্বতকেই আমি হালকাভাবে নিই না।’

পর্বতারোহীদের কাছে ব্রড পিক অন্যতম কঠিন একটি পর্বত হিসেবে বিবেচিত। ১৯৫৭ সালে অস্ট্রিয়ার একটি অভিযাত্রী দল প্রথমবারের মতো এই চূড়াটি সফলভাবে জয় করে। এরপর থেকে অনেকেই এই পর্বত জয় করেছেন। তবে প্রাণও হারিয়েছেন বহু মানুষ।

ব্রড পিকের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছরগুলোর একটি ছিল ২০১৩ সাল। ওই বছর এই পর্বতে অন্তত ছয়জন প্রাণ হারান।