ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ (মাঝে), দেশটির ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট জর্জ রদ্রিগুয়েজ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলো (ডানে)
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ (মাঝে), দেশটির ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট জর্জ রদ্রিগুয়েজ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলো (ডানে)

ভেনেজুয়েলায় মোড় ঘোরানোর ক্ষমতা রাখেন কাবেলো, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর কী সম্পর্ক

দিওসদাদো কাবেলো ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের কর্মকর্তারা কাবেলোর সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রেখেছিলেন। রাজধানী কারাকাস থেকে সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে আনার কয়েক মাস আগে এই যোগাযোগ ও আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ ওই অভিযানের পরও যোগাযোগ চালু আছে। বিষয়টির সঙ্গে জানাশোনা আছে এমন কয়েকজন ব্যক্তি এসব তথ্য জানান।

৬২ বছর বয়সী কাবেলোর হাতে রয়েছে ভেনেজুয়েলার গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনী। মাদুরোকে তুলে আনার পরও সেই নিরাপত্তাকাঠামো এখনো কার্যত অক্ষত আছে। সংশ্লিষ্ট চারটি সূত্র জানিয়েছে, মার্কিন কর্মকর্তারা কাবেলোকে নিরাপত্তা বাহিনী বা ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের দিয়ে বিরোধীপক্ষের ওপর দমনপীড়ন না চালানোর বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছিলেন।

মাদুরোর বিরুদ্ধে যেমন মার্কিন প্রশাসনের মাদক পাচারের অভিযোগ রয়েছে, একই অভিযোগ রয়েছে কাবেলোর বিরুদ্ধেও। অথচ একই অভিযোগে আটক হয়ে মাদুরো এখন নিউইয়র্কের আটককেন্দ্রে। সামরিক অভিযানে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করা হলেও, কাবেলো মুক্ত রয়েছেন।

এ ঘটনা জানে এমন দুটি সূত্র বলেছে, কাবেলোর ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও অভিযোগ নিয়ে তাঁর সঙ্গে মার্কিন কর্মকর্তারা আলোচনা করেছেন। ট্রাম্পের বর্তমান প্রশাসনের শুরুর দিনগুলোয় আলোচনার সূত্রপাত। মাদুরোকে কারাকাস থেকে তুলে আনার আগের সপ্তাহগুলোয়ও আলোচনা অব্যাহত ছিল। আর চারজন সূত্র বলেছেন, মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরও কাবেলোর সঙ্গে মার্কিন প্রশাসন যোগাযোগ রেখে চলেছে।

মাদুরোর বিরুদ্ধে যেমন মার্কিন প্রশাসনের মাদক পাচারের অভিযোগ রয়েছে, একই অভিযোগ রয়েছে কাবেলোর বিরুদ্ধেও। অথচ একই অভিযোগে আটক হয়ে মাদুরো এখন নিউইয়র্কের আটককেন্দ্রে। সামরিক অভিযানে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করা হলেও, কাবেলো মুক্ত রয়েছেন।

পুরোপুরি গোপন রাখা এই যোগাযোগকে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের প্রচেষ্টার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হচ্ছে। কেননা, কাবেলো যদি তাঁর হাতে থাকা শক্তিগুলোর লাগাম ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে দেশটিতে ট্রাম্প যে ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়ানোর চেষ্টা করছেন, তা অর্জন করা কঠিন হতে পারে। সেই সঙ্গে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। মার্কিন উদ্বেগ সম্পর্কে অবগত আছেন—এমন সূত্রগুলো এ কথা জানিয়েছে।

ভেনেজুয়েলার শাসনব্যবস্থা আগামী দিনগুলোয় কেমন হবে, সেটা নিয়ে কাবেলোর সঙ্গে মার্কিনিদের আলোচনা হয়েছে কিনা, সেটা স্পষ্ট করা হয়নি। ভেনেজুয়েলার এই রাজনীতিক মার্কিন সতর্কবার্তা মানছেন কি না, সেটাও নিশ্চিত নয়। এ পর্যন্ত তিনি দেলসি রদ্রিগেজের প্রতি আনুগত্যের প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলেছেন। ট্রাম্পও তাঁর প্রশংসা করেছেন।

দেলসি রদ্রিগেজ তাঁর নতুন পাওয়া ক্ষমতা সুসংহত করার চেষ্টা করছেন। জ্বালানি তেল উৎপাদন বাড়ানোর জন্য মার্কিন দাবি পূরণের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ হুমকি থেকে নিজেকে রক্ষায় তিনি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে অনুগতদের বসিয়েছেন।

মাদুরো–পরবর্তী ভেনেজুয়েলায় কৌশল বাস্তবায়নে দেলসি রদ্রিগেজের ওপর ভরসা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে পরিস্থিতির মোড় ঘোরানোর ক্ষমতা কাবেলোর হাতে রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

সরাসরি ও মধ্যস্থতাকারী—দুই মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কাবেলো যোগাযোগ রেখে চলেছেন বলে জানান সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র। তবে সংবেদনশীল বিষয় হওয়ায় সব সূত্র নাম ও পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।

এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস ও ভেনেজুয়েলা সরকার তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।

চাভেজের ঘনিষ্ঠ, ক্ষমতাধর ব্যক্তি

দীর্ঘদিন ধরে ভেনেজুয়েলার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত কাবেলো। দেশটির প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত তিনি। চাভেজকে বলা হয় মাদুরোর গুরু, পথপ্রদর্শক। শুধু চাভেজ নন, মাদুরোর প্রতিও দীর্ঘদিন অনুগত থেকেছেন কাবেলো।

তবে দেলসি রদ্রিগেজ আর কাবেলো দুজনই বছরের পর বছর ধরে সরকার, আইনসভা ও ক্ষমতাসীন সমাজতান্ত্রিক দলের একেবারে কেন্দ্রে থেকে কাজ করেছেন। কিন্তু কখনোই একে অপরের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে বিবেচিত হননি।

কাবেলো একসময় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন। দেশের সামরিক–বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ওপর তাঁর প্রভাব প্রবল। এসব সংস্থা দেশের ভেতরে ব্যাপক পরিসরে গুপ্তচরবৃত্তিতে জড়িত। একই সঙ্গে সরকারপন্থী হিসেবে পরিচিত মিলিশিয়াদের সঙ্গেও কাবেলোর ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। বিশেষ করে ‘কালেকতিভোর’ সঙ্গে। মোটরসাইকেল আরোহী সশস্ত্র এ গোষ্ঠীকে বিক্ষোভকারীদের দমনপীড়নের কাজে মোতায়েন করা হয়েছিল।

মাদুরোর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিতি মুষ্টিমেয় ব্যক্তিদের একজন হলেন কাবেলো, যাঁদের ওপর অন্তর্বর্তী শাসনকালে ওয়াশিংটন ভরসা রাখছে। বিশেষ করে অনির্দিষ্ট মেয়াদের এবং অনিশ্চিত এই সময়টায় দেশটিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার কাজে এই ভরসা রাখা হচ্ছে। এটা এমন একটা সময়, যখন ভেনেজুয়েলার জ্বালানি তেলের মজুতে প্রবেশাধিকার নেওয়ায় চেষ্টা করছে ওপেক।

কাবেলোকে নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্বেগ রয়েছে। এ উদ্বেগ তাঁর দমনপীড়নের অতীত রেকর্ড ও দেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে। কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, কাবেলো তাঁর ভূমিকা বদলে ফেলতে পারেন। প্রশাসনের চিন্তাভাবনা সম্পর্কে অবগত, এমন সূত্র এটা জানিয়েছে।

ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলো

দেলসি রদ্রিগেজ তাঁর নতুন পাওয়া ক্ষমতা সুসংহত করার চেষ্টা করছেন। জ্বালানি তেল উৎপাদন বাড়ানোর জন্য মার্কিন দাবি পূরণের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ হুমকি থেকে নিজেকে রক্ষায় তিনি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে অনুগতদের বসিয়েছেন। রয়টার্সের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সংশ্লিষ্ট সূত্রের কথোপকথনে এমনটাই উঠে এসেছে।

এ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ভেনেজুয়েলায় তাঁর বিশেষ দূত ইলিয়ট আব্রামস বলেন, ভেনেজুয়েলার অনেক মানুষ আশা করছেন, দেশের গণতান্ত্রিক পরিবর্তন এগিয়ে যাওয়ার পথে কোনো এক সময় কাবেলোকে পদ থেকে অপসারণ করা হবে।

বর্তমানে চিন্তক প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সে কর্মরত ইলিয়ট আব্রামস বলেন, ‘যদি এবং যখন তিনি (কাবেলো) সরে যাবেন, ভেনেজুয়েলার জনগণ জানতে পারবে, শাসনব্যবস্থা সত্যিই পরিবর্তন হতে শুরু করেছে।’

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও অভিযোগ

মাদক পাচারের অভিযোগে কাবেলো দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন।

২০২০ সালে মার্কিন প্রশাসন কাবেলোর জন্য ১ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করে। তাঁকে ‘কার্টেল দে লস সোলস’–এর একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। এই গোষ্ঠীকে ভেনেজুয়েলার সরকারের ভেতরের ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত মাদক পাচারকারী নেটওয়ার্ক হিসেবে বিবেচনা করে ওয়াশিংটন।

এর পর থেকে মার্কিন প্রশাসন পুরস্কারের অর্থ বাড়িয়ে ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার করেছে। তবে কাবেলো মাদক পাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রকাশ্যে অস্বীকার করেছেন।

সস্ত্রীক মাদুরোকে তুলে আনার পর ওয়াশিংটনের অনেক বিশ্লেষক ও রাজনীতিক প্রশ্ন তুলেছিলেন, কাবেলোকে কেন ধরা হলো না? কেননা, মার্কিন বিচার বিভাগের করা তালিকায় মাদুরোর পর তাঁর নাম দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।

নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আদালতে হাজির করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। এর আগে আটককেন্দ্র থেকে হেলিকপ্টারে করে নিউইয়র্কের আদালতের কাছে একটি হেলিপোর্টে নেওয়া হয় তাঁদের। যুক্তরাষ্ট্র, ৫ জানুয়ারি

১১ জানুয়ারি সিবিএস চ্যানেলের ‘ফেস দ্য নেশন’ অনুষ্ঠানে একটি সাক্ষাৎকার দেন যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভার নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান সদস্য মারিয়া এলভিরা সালাজার। ওই সাক্ষাৎকারে মারিয়া বলেন, ‘আমি জানি, সম্ভবত মাদুরো আর রদ্রিগেজ—দুজনের চেয়ে খুবই মারাত্মক হলেন কাবেলো।’

পরবর্তী সময়ে নিজ দেশে দেওয়া এক ভাষণে কাবেলো মার্কিন হস্তক্ষেপের নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, ‘ভেনেজুয়েলা আত্মসমর্পণ করবে না।’

তবে চেকপয়েন্টগুলোয় বাসিন্দাদের তল্লাশির খবরগুলো এখন কম পাওয়া যাচ্ছে। আবার নিরাপত্তা বাহিনীর ইউনিফর্মধারী সদস্যদের এবং কখনো কখনো সাদা পোশাকের ব্যক্তিদের মাধ্যমে তল্লাশির খবরগুলো খুব কমই পাওয়া যাচ্ছে সাম্প্রতিক দিনগুলোয়।

ট্রাম্প ও ভেনেজুয়েলার সরকার—উভয়ই বলেছে, কারাবন্দী অনেককেই মুক্তি দেওয়া হবে। বিরোধী দল ও অধিকার সংগঠনগুলো তাদের রাজনৈতিক বন্দী বলে মনে করছে।

ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকার জানিয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে কাবেলো এই প্রচেষ্টার তত্ত্বাবধান করছেন। অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, কারামুক্তির প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর গতিতে চলছে। শত শত মানুষকে এখনো অন্যায্যভাবে আটকে রাখা হয়েছে।