ভেনেজুয়েলা অনেক দিন ধরেই বলে আসছিল, দেশটির তেলসম্পদ দখল করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র
ভেনেজুয়েলা অনেক দিন ধরেই বলে আসছিল, দেশটির তেলসম্পদ দখল করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র

ভেনেজুয়েলার তেল দখলে নিতে ট্রাম্প কি কারাকাসে ‘পুতুল সরকার’ বসাতে যাচ্ছেন

‘আপনা মাঁসে হরিণা বৈরী’—চর্যাপদের এই উক্তি এখন লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

ভেনেজুয়েলায় অতর্কিত হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে সস্ত্রীক যুক্তরাষ্ট্রের তুলে নেওয়ার ঘটনা এই উক্তি মনে করিয়ে দেয়।

বিষয়টি বুঝতে ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের নগ্ন ‘সম্পদ সাম্রাজ্যবাদের’ দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে ভেনেজুয়েলায়। বৈশ্বিক জ্বালানি খাতের অন্যতম প্রভাবশালী সাময়িকী ‘অয়েল অ্যান্ড গ্যাস জার্নাল’ বলছে, ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী ভেনেজুয়েলার মজুত তেলের পরিমাণ ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল।

মজুতের দিক থেকে সৌদি আরবের অবস্থান দ্বিতীয়। দেশটিতে মজুত তেলের পরিমাণ ২৬৭ বিলিয়ন ব্যারেল। তৃতীয় অবস্থানে ইরান, মজুত ২০৮ বিলিয়ন ব্যারেল।

এরপর যথাক্রমে রয়েছে কানাডা (১৬৩ বিলিয়ন ব্যারেল), ইরাক (১৪৫ বিলিয়ন ব্যারেল), সংযুক্ত আরব আমিরাত (১১৩ বিলিয়ন ব্যারেল), কুয়েত (১০১ বিলিয়ন ব্যারেল), রাশিয়া (৮০ বিলিয়ন ব্যারেল), যুক্তরাষ্ট্র (৫৫ বিলিয়ন ব্যারেল) ও লিবিয়া (৪৮ বিলিয়ন ব্যারেল)।

তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেকের ‍হিসাবে, বিশ্বের মোট মজুত তেলের প্রায় ২০ শতাংশের মালিক ভেনেজুয়েলা।

অর্থাৎ, বিশ্বব্যাপী মোট মজুত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই রয়েছে ভেনেজুয়েলার মাটির নিচে। আর মজুতের দিক থেকে নবম স্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে পাঁচ গুণের বেশি তেল আছে ভেনেজুয়েলার হাতে।

ভেনেজুয়েলার এই সমৃদ্ধ তেলসম্পদই যে এখন দেশটির ‘মহাবিপদের’ কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

ভেনেজুয়েলার নেতা মাদুরো অনেক দিন ধরেই বলে আসছিলেন, তাঁর দেশের তেলসম্পদ দখল করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। আর এ কারণেই ওয়াশিংটন নানা অজুহাত দাঁড় করাচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা, বেআইনি সামরিক তৎপরতাসহ নানা পদক্ষেপের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার ওপর চাপ ক্রমাগত বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দাবি করে আসছিল, ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক ও অস্ত্র পাচার করা হচ্ছে। গ্যাং পাঠানো হচ্ছে। এসবের হোতা স্বয়ং মাদুরো। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছেন। মাদুরো শুধু আন্তর্জাতিক-আঞ্চলিক হুমকিই নন, তিনি নিজ দেশের জনগণের জন্যও একজন বিপজ্জনক ব্যক্তি। মাদুরো একজন অবৈধ প্রেসিডেন্ট। তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী।

নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস

ট্রাম্পের নির্দেশে গত শনিবার শেষরাতে আকস্মিকভাবে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ’ নামের অভিযান চালায় মার্কিন বাহিনী। তারা নাটকীয়ভাবে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে সেফ হোম থেকে তুলে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যায়।

অভিযান শেষে একই দিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার মার-আ-লাগোতে সংবাদ সম্মেলনে আসেন ট্রাম্প। প্রায় এক ঘণ্টা সংবাদ সম্মেলন চলে। এই সংবাদ সম্মেলনেই উচ্ছ্বসিত ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ রদবদল না হওয়া পর্যন্ত দেশটি ‘চালাবে’ যুক্তরাষ্ট্র।

ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র

ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদনের নিয়ন্ত্রণও যুক্তরাষ্ট্র গ্রহণ করবে বলে ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এ প্রসঙ্গে তিনি কোনো রাখঢাক না রেখে বলেন, ‘যেমনটা সবার জানা, ভেনেজুয়েলায় তেল ব্যবসা দীর্ঘ সময় ধরে সম্পূর্ণ ব্যর্থ, একেবারেই ব্যর্থ। আমরা আমাদের বৃহৎ তেল কোম্পানিগুলো, যেগুলো বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বড়—সেগুলো সেখানে (ভেনেজুয়েলা) পাঠাব। তারা শত শত ডলার বিনিয়োগ করে দেশটির ভেঙে পড়া তেল–অবকাঠামো ঠিক করবে, দেশটির জন্য আয় শুরু করবে।’

ট্রাম্পের এই ঘোষণায় স্পষ্ট হয়ে যায়, তিনি কেন, কোন উদ্দেশ্যে ভেনেজুয়েলাকে নিশানা করেছেন।

ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে এত দিন ট্রাম্প মাদকবিরোধী যুদ্ধের কথা ও গ্যাংয়ের কথা বলে এলেও এই সংবাদ সম্মেলনে এসব বিষয় খুব কমই গুরুত্ব পায়। সংবাদ সম্মেলনে ভেনেজুয়েলা নিয়ে ট্রাম্পের ‘আসল পরিকল্পনা’ একদম প্রকাশ্যে চলে আসে। আর তা হলো ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ দখলের নীলনকশা।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে ভেনেজুয়েলায়

ভেনেজুয়েলার তেল কেন যুক্তরাষ্ট্রের দরকার, তার ব্যাখ্যা মেলে স্কাই নিউজের এক এক্সপ্লেইনারে। ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন ভেনেজুয়েলার তেলের প্রতি এত আগ্রহী’ শীর্ষক এই এক্সপ্লেইনারে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদক; কিন্তু দেশটি মূলত হালকা অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করে। তাই ভারী অপরিশোধিত তেলের চাহিদা আমদানির মাধ্যমে মেটায় যুক্তরাষ্ট্র। আর এ ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভেনেজুয়েলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভেনেজুয়েলা হলো ভারী অপরিশোধিত তেলের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র।

যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ পরিশোধনাগার ভেনেজুয়েলার ভারী তেল প্রক্রিয়াকরণের জন্য নির্মিত। এগুলোর জন্য ভেনেজুয়েলার ভারী তেল যুক্তরাষ্ট্রের খুবই দরকার।

তা ছাড়া ভৌগোলিক অবস্থান, তুলনামূলক সস্তা দাম, কম পরিবহন খরচ, দ্রুত সরবরাহসহ নানা দিক বিবেচনায় ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে তেল আনাটা বেশি সুবিধাজনক।

১৯৪৩ সালে ভেনেজুয়েলা আইন করে নির্ধারণ করে, দেশটির তেলশিল্পের লাভের ৫০ শতাংশ রাষ্ট্রের কাছে যাবে। ১৯৭৬ সালে মধ্য-বামপন্থী প্রেসিডেন্ট কার্লোস আন্দ্রেস পেরেস দেশটির তেলশিল্প জাতীয়করণ করেন। গঠন করেন রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ।

ভেনেজুয়েলায় হুগো চাভেজের শাসনামলে (১৯৯৯-২০১৩) এই রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হয়। এই পদক্ষেপে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর বড় বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চাভেজের উত্তরসূরি মাদুরোর শাসনামলেও (২০১৩-২০২৬) একই নীতি অনুসরণ করা হয়। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন বড় তেল কোম্পানিগুলোর মধ্যে একমাত্র শেভরন ভেনেজুয়েলায় থাকতে সক্ষম হয়।

ভেনেজুয়েলায় অভিযান শেষে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার মার-আ-লাগোতে সংবাদ সম্মেলনে আসেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। পরে জো বাইডেন এসে নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করেন। ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসে আবার নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করেন।

অভ্যন্তরীণ রাষ্ট্রীয় নীতি, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাসহ নানা কারণে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন পড়ে যায়। গত শতকের শেষ দিকে ভেনেজুয়েলা প্রতিদিন ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করত। গত বছর দেশটি প্রতিদিন ১ মিলিয়ন ব্যারেলের কম তেল উৎপাদন করে।

একসময় ভেনেজুয়েলার তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ভেনেজুয়েলা প্রতিদিন প্রায় ১ দশমিক ৫ থেকে ২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল যুক্তরাষ্ট্রকে সরবরাহ করত।

ক্ষমতা থেকে মাদুরোকে সরিয়ে দিয়ে ট্রাম্প তাঁর দেশের ভারী অপরিশোধিত তেলের চাহিদা পূরণের সবচেয়ে উপযুক্ত উৎসকে (ভেনেজুয়েলা) নিজের করায়ত্তে নিয়ে এসেছেন। এখন তাঁর বাদবাকি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পালা।

একসময় ভেনেজুয়েলার তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল যুক্তরাষ্ট্র

ট্রাম্প আমেরিকাকে আবার মহান করতে চান। সে জন্য তাঁর ভাবনায় যেসব বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে, তার মধ্যে প্রাকৃতিক সম্পদ দখল অন্যতম। গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেছিলেন, যদি দেশকে আবার মহান করতে হয়, তাহলে দৃঢ় সীমান্ত ও প্রথাগত জ্বালানির উৎস থাকাটা দরকার।

এ প্রসঙ্গে মার্কিন চিন্তক প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের জ্বালানিবিশেষজ্ঞ অ্যালিস হিলের ভাষ্য হলো, ট্রাম্প জীবাশ্ম জ্বালানির আধিপত্যকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় শক্তির অন্যতম চাবিকাঠি হিসেবে দেখেন। আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনসহ অন্য কোনো কিছুকে তিনি পাত্তা দেন না।

যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে ভেনেজুয়েলা চালাবে, কীভাবে দেশটির তেলসম্পদ নিয়ন্ত্রণ করবে, তা নিয়ে নানা বিকল্প অনেকে সামনে আনছেন।

তবে ট্রাম্পের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন কীভাবে হতে পারে, সে বিষয়ে একটি সম্ভাব্য ধারণা পাওয়া যায় তাঁর রিপাবলিকান পার্টির সিনেটর টম কটনের এক বক্তব্যে।

গতকাল রোববার কটন বলেন, ‘যখন প্রেসিডেন্ট (ট্রাম্প) বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা চালাবে, তখন তার অর্থ হলো, ভেনেজুয়েলার নতুন নেতাদের আমাদের (যুক্তরাষ্ট্র) চাহিদাগুলো পূরণ করতে হবে।’

তাহলে কারাকাসে কি একটি ‘পুতুল সরকার’ বসাতে যাচ্ছেন ট্রাম্প?

তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য হিল, স্কাই নিউজ ও সিএনএন।